Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৪ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

সংস্কৃতি নিয়ে কথা

প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মুহম্মদ মতিউর রহমান
জীবনের সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। জীবনযাপন পদ্ধতির মধ্যেই সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ। জীবনচর্যার পরিশীলিত, পরিমার্জিত, পরিশ্রুত দিকটাকেই সংস্কৃতি বলা যায়। সব মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি এক রকম নয়। স্থান-কাল-পরিবেশের কারণে সংস্কৃতির মধ্যে নানা বৈচিত্র্য ঘটে।
সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সাধনে ক্ষেত্রবিশেষে যেসব প্রাকৃতিক উপাদান ক্রিয়াশীল, সেগুলোকে স্থান, কাল, আবহাওয়া, ভাষা, বর্ণ, খাদ্য ইত্যাদি রূপে চিহ্নিত করা যায়। অঞ্চলভেদে বিশাল পৃথিবীতে গ্রীষ্মম-ল, শীতপ্রধান অঞ্চল নাতিশীতোষ্ণ ম-ল সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও সবুজ অরণ্যানী, কোথাও ধূ ধূ মরুভূমি, কোথাও শস্যশ্যামল উর্বরা ফসলের মাঠ, কোথাও সাগর-জলাশয়, কোথাও সুউচ্চ পাহাড়। শীত-গ্রীষ্ম-নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য তারতম্য ঘটে। আবহাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে যেমন বৈচিত্র্য ঘটে, জীবজন্তু-প্রাণীর জীবনযাত্রা প্রণালীতেও তেমনি বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। আবহাওয়ার কারণে জীবনযাত্রা প্রণালী বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এক এক অঞ্চলের খাদ্য, বেশ-ভূষা, জীবনায়ন প্রভৃতি সবকিছুতেই দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এ পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে।
বিশাল বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা ও বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে। ভাষা ও বর্ণের কারণেও সংস্কৃতির মধ্যে রূপ-বৈচিত্র্য ঘটে। ফলে নানা আঞ্চলিক, উপ-আঞ্চলিক, জাতীয়, উপজাতীয়, নৃতাত্ত্বিক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর যেমন আলাদা পরিচয় গড়ে উঠেছে, তেমনি শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ-বাদামী ইত্যাদি বর্ণগত বিভেদের কারণেও ভিন্নতর সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে। অনুরূপভাবে ভাষাগতভাবে বাঙালি-পাঞ্জাবি-ফরাসি-ইংরেজি-আরবি-তুর্কি-চীনা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচয় পৃথিবীতে বিদ্যমান। ভাষাগত কারণে সংস্কৃতির মধ্যে যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়, নানা কারণে তা অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মানব-সভ্যতা-সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।
মানুষের মনের ভাব প্রকাশের জন্য মহান স্রষ্টা মানুষকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। এ ভাষার কারণে মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি ইত্যাদি সবকিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। এ ভাষার কারণে মানুষ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ইত্যাদি সৃষ্টি করেছে। এ ভাষার কারণেই সভ্যতার জন্ম, বিকাশ ও ক্রমাগ্রতি সাধিত হয়েছে। মূলত ভাষার কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা বা আশরাফুল-মখলুকাতের মর্যাদা লাভ করেছে। ভাষার কারণে যে মানুষ শুধু আশরাফুল মখলুকাত হয়েছে তাই নয়, এ ভাষার কারণে মানুষ পৃথিবীতে শিক্ষা-সভ্যতা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটিয়েছে। ভাষা ব্যতীত মানুষ শিক্ষালাভ করতে পারত না, সাহিত্য সৃষ্টি হতো না, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও অন্যান্য মানবাকৃতির গবেষণা-চর্চা ও বিকাশ কোনোটাই সম্ভব হতো না। তাই এ ভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
মানুষ ব্যতীত অন্য কোনো প্রাণীর সংস্কৃতি নেই, সভ্যতাও নেই। বস্তুত ভাষা মানুষের সংস্কৃতি ও সভ্যতার মূলভিত্তি। জীবনধারণ, আত্মরক্ষা ও আত্মবিকাশের প্রয়োজনে মানুষ সংঘবদ্ধ বা সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এ সমাজবদ্ধ জীবনযাপন সম্ভব ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভাষার কারণে। মানুষের পারস্পরিক কথাবার্তা, ভাবের আদান-প্রদান, লেনদেন ইত্যাদি সবকিছুর মাধ্যম ভাষা। তাই ভাষা মানুষের জীবনকে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, মর্যাদাশীল ও মহিমান্বিত করেছে, তেমনি সংস্কৃতি-শিল্প-সাহিত্য-সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশেও ভাষার অপরিহার্য একক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কাল-পরিক্রমে ভাষার মধ্যে পরিবর্তন ও ভিন্নতা ঘটে। কাল-স্রোতে প্রকৃতির মধ্যে যেমন পরিবর্তন ঘটে, মানুষের জীবনে, জীবনবোধে ও জীবনযাত্রা প্রণালীতেও তেমনি পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ পরিবর্তন-বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের রুচিবোধ বদলায়, দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়, চিন্তা-চেতনার প্রসারতা ঘটে এবং এর ফলে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্যেও রূপান্তর ঘটে। এ রূপান্তর বহিরঙ্গ ক্ষেত্রে যেমন অন্তর্গত ক্ষেত্রেও তেমনি যুগপৎ ঘটে থাকে। তবে তা অনেকটাই সকলের অগোচরে নীরবে সংগোপনে সংঘটিত হয়। তাই এটা সহজে উপলব্ধি করা না গেলেও একসময় বড় আকারে এ পরিবর্তনটি সকলের নিকট ধরা পড়ে।  
মানুষ সামাজিক জীব। একজনের সাথে আরেকজনের নানা কারণে সংযোগ সংস্পর্শ সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন সন্তানাদি, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী পরস্পর সম্পর্কযুক্ত সামাজিক বন্ধনে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ। প্রতিনিয়ত পরস্পরের কথাবার্তা, লেনদেন, ভাবের আদান-প্রদান, প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, স্নেহ-মায়া-মমতার অচ্ছেদ্য বন্ধনে সকলে সম্পৃক্ত। এ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত মানব সমাজে একজনের মনের ভাব, চিন্তা-চেতনা অতি সহজেই অন্যের কাছে পৌঁছে যায়, আবার সমষ্টির চিন্তা-চেতনাও ব্যক্তিজীবনে প্রভাব বিস্তার করে। এভাবে ব্যক্তি ক্রমান্বয়ে সমষ্টিতে পরিণত হয়, সমষ্টি ব্যক্তির মধ্যে নিজেকে সংগোপনে সপ্রকাশ করে। ফলে ব্যক্তির পরিশীলিত, পরিশ্রুত ও পরিমার্জিত জীবনযাপন বহুলাংশে ব্যষ্টিক জীবনায়ন প্রক্রিয়ারই প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে অথবা বলা যায়, ব্যষ্টিক জীবনযাত্রা প্রণালী ব্যক্তি-সত্তাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে।
এভাবে সংস্কৃতির যেমন একটি ব্যক্তিক রূপ আছে, তেমনি এর একটি ব্যষ্টিক বা সামষ্টিক রূপ বিদ্যমান। এ সামষ্টিক রূপের নির্মিতি ঘটে প্রধানত পরিবারকে কেন্দ্র করে, তারপর সেটা ক্রমান্বয়ে একটি বিশেষ সমাজ, দেশ, জাতি, আঞ্চলিক জনগোষ্ঠী, রাষ্ট্র ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের রূপ ও চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এভাবে ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্য ক্রমান্বয়ে সামষ্টিক বৈশিষ্ট্যে রূপান্তরিত হয়, আবার সামষ্টিক বৈশিষ্ট্যও অনেকটা ব্যক্তির গোচরে অথবা অগোচরে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় অনেক সময় ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ছায়া বিস্তার করে। এভাবে সামষ্টিক সংস্কৃতি বা পড়ৎঢ়ড়ৎধঃব পঁষঃঁৎব গড়ে ওঠে। শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আদান-প্রদানের ব্যবস্থা সহজতর ও ঘনিষ্ঠতর হওয়ার সাথে পড়ৎঢ়ড়ৎধঃব পঁষঃঁৎব এর বিস্তৃতি ঘটেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত নানা গবেষণা ও উদ্ভাবনার ফলেও মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ সংস্কৃতির মূল উপাদান ব্যক্তি, কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা ব্যাপ্তি লাভ করে সামষ্টিক বা বিশ্বজনীন রূপ লাভ করে। এভাবে সংস্কৃতির যেমন ব্যক্তিক পরিচয় আছে, তেমনি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, আঞ্চলিক তথা বিশ্বজনীন চিরন্তন রূপও ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠছে। তাই আধুনিককালে সংস্কৃতির রূপ-সংজ্ঞা ও পরিধি অনেক বেশি বিস্তৃত ও মানবিক তাৎপর্যে অভিষিক্ত হয়ে উঠেছে।
সংস্কৃতি বিনির্মাণ ও বিকাশে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তা-দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, সভ্যতার ক্রমাগ্রগতি ইত্যাদির যেমন প্রভাব রয়েছে তেমনি ধর্মের প্রভাবও ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল। ধর্ম মানুষের জীবনযাপন প্রণালীকে প্রভাবিত করার সাথে সাথে মানুষের কর্ম ও চিন্তাকেও প্রভাবিত করে। প্রাচীনকালে ধর্মের একক প্রভাব ছিল মানুষের জীবনে। আধুনিককালে অনেক ক্ষেত্রে ধর্মহীনতা বা ধর্মবিযুক্ত জীবন-ব্যবস্থা ক্রমাগত প্রসার লাভ করায় ধর্মের প্রভাব জীবনে ও সংস্কৃতিতে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। এমনকি, বর্তমানে অনেকে ধর্মের প্রভাবকে সম্পূর্ণ অস্বীকারও করতে চাইছে।
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ফলে মানুষ প্রাচীন ভাবধারা ও মূল্যবোধ থেকে ক্রমান্বয়ে সরে আসার ফলে ধর্মভিত্তিক জীবন-যাপনের গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ধর্মীয় বিধিবিধান, আচার-পদ্ধতি মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালীকে এখন আর অতটা প্রভাবিত করে না। এ কারণে যুক্তিনির্ভর সংস্কারমুক্ত জীবনাচারণ এখন ক্রমান্বয়ে সংস্কৃতি বিনির্মাণের অন্যতম উপাদান হয়ে উঠছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদের সমাপ্তিলগ্নে এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযৌক্তিক উদ্ভাবনার ফলে বিশেষত সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের প্রচারণায় নিরীশ্বরবাদী বা ধর্মবিযুক্ত সাংস্কৃতিক চিন্তাধারার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এর মূল ভিত্তি কার্ল মার্কস-লেনিনের সমাজতন্ত্র, মূল উদ্দেশ্য বস্তুবাদী নিরীশ্বরবাদী শ্রেণিহীন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা। পাশ্চাত্য বিশ্ব এটাকে ধহঃরপঁষঃঁৎধষরংস বলে আখ্যায়িত করেছে। মানুষের মানবিক স্বভাব, মানব জাতির চিরায়ত ঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হওয়ায় এ বস্তুতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিশ্বসভ্যতায় কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি করলেও তা টিকে থাকার উপযুক্ত নয়। কারণ কোনো কিছুর টিকে থাকার জন্য যে প্রাণশক্তির প্রয়োজন, নিরীশ্বরবাদী বস্তুতান্ত্রিক মতবাদের মধ্যে তা অনুপস্থিত। মানুষের জীবনে বস্তুগত চাহিদা-প্রয়োজন ও প্রাপ্তির দিকটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অবস্তুগত আধ্যাত্মিক চাহিদা-প্রয়োজন ও প্রাপ্তির গুরুত্বও কম নয়। উভয়ের সমন্বয়ে যে জীবন, সে জীবনের চাহিদা পূরণের কোনো ব্যবস্থা সমাজতন্ত্রের মধ্যে নেই।  
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি সত্ত্বেও ধর্মের প্রভাব কি সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে গেছে? এর সংক্ষিপ্ত জবাব হলো ‘না’। পৃথিবীর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে এখনো ধর্মের ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান। সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা যদিও কঠিন, তবে আন্দাজ করে বলা যায়, এ সংখ্যা শতকরা ৯৫ ভাগের কম নয়। অতএব, ধর্মের প্রভাব আধুনিক যুগের মানুষের জীবনে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়নি। ফলে সংস্কৃতি বিনির্মাণে ধর্মের প্রভাব এখনো ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ডক্টর এবনে গোলাম সামাদের মতে :
“... নৃতত্ত্বে সংস্কৃতি বলতে বোঝায়, মানুষ যা জন্মসূত্রে লাভ করে না, যা তাকে শিখে নিতে হয়, এমন সব কিছুকে। পাখিরা বাসা বানায়। বাসা বানানো তারা লাভ করে জন্মসূত্রে। কিন্তু মানুষকে শিখতে হয় ঘরবাড়ি নির্মাণ। স্থাপত্য মানুষের সংস্কৃতির পরিচায়ক। আলোচনার সুবিধার জন্য নৃতত্ত্বেও সংস্কৃতিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগকে বলা হয় বস্তুগত, আরেক ভাগকে বলা হয় মানগত। বাড়িঘর বস্তুগত সংস্কৃতির নিদর্শন। ধর্ম, বিবাহব্যবস্থা, সামাজিক বিধিবিধানকে বলতে হয় অধরা সংস্কৃতি। ধর্ম অবশ্য মানুষের বস্তুগত সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে তুলনা করলে ধর্মের স্বরূপ বোঝা সহজ হয়।” (দ্রষ্টব্য : ডক্টর এবনে গোলাম সামাদ : আমাদের সংস্কৃতির শিকড় সন্ধানে, দৈনিক নয়াদিগন্ত)
একটি বিষয় সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তির উদ্ভাবনার ফলে মানুষ ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে পূর্বের তুলনায় এখন কিছুটা সরে এসেছে। তার অর্থ কি এই যে, ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো বিরোধ রয়েছে? এর সরাসরি উত্তর হলোÑ না। বরং ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এ সবকিছুর স্রষ্টা এক ও অভিন্ন। বিশ্বভূম-লে যা কিছু আছে, সে সবকিছুর স্রষ্টা এক ও অভিন্ন। সমগ্র বিশ্বভূম-লে যা কিছু আছে সে সবকিছুকে দুই ভাগে ভাগ করা চলেÑ এক স্রষ্টা, বাকি সবকিছু সৃষ্টি। স্রষ্টা অনাদি অনন্ত সর্বশক্তিমান। তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি, তাঁর কোনো শরিক বা সাহায্যকারী নেই, কোনো ব্যাপারেই তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি সর্বশক্তিমান, সবকিছুর পালনকর্তা, নিয়ন্ত্রণকারী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। বিশ্বভূম-লে অন্য সবকিছুই তাঁর সৃষ্টি। তাঁর কোনো শরিক বা সাহায্যকারী নেই এবং তিনি এককভাবে সবকিছুর স্রষ্টা-পালনকর্তা-রক্ষাকর্তা ও নিয়ন্ত্রক বলেই সৃষ্টি জগতের মধ্যে পরস্পর দ্বন্দ্ব-সংঘাত নেই। সবকিছুর মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বা ভারসাম্য (ঈড়যবৎবহপব ড়ৎ ইধষধহপব) রয়েছে। স্রষ্টা এক ও অদ্বিতীয় না হলে সবকিছুর ওপর তাঁর একক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সমগ্র সৃষ্টি জগৎ পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হতো এবং অনিবার্যভাবে বিলুপ্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হতো, সৃষ্টি জগতের মধ্যে কোনো ভারসাম্য বা স্থিতিস্থাপকতা পরিলক্ষিত হতো না।  
ধর্ম হলো নৈতিক বিধিবিধান, মানুষের চিন্তা ও কর্মের সমন্বয়ে এক ধরনের নীতিমালা। অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হলো বস্তুগত বিষয়। এ দুয়ের মধ্যে অন্বয় ও সমন্বয় কীভাবে সম্ভব? মূলত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বস্তুগত হলেও এরও একটি ধর্ম আছে। যেমন সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়, পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। চন্দ্র সূর্যের চারদিক একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও গতিপথে সূর্যের চারদিক পরিভ্রমণ করে, আবার সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে ঊর্ধ্বাকাশে তার নিজস্ব গতিপথ ধরে নিরন্তর পরিভ্রমণ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় ঘধঃঁৎধষ খধি বা প্রাকৃতিক নিয়ম। বস্তুজগৎ থেকে এরূপ আরো অসংখ্য নজির পেশ করা যায়। যেমন পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। আগুন সবকিছু দগ্ধ করে, রৌদ্রতাপে পানি বাষ্পীভূত হয়। শৈত্য প্রকোপে পানি জমাট বেঁধে বরফে পরিণত হয় আবার তাপদাহে বরফ গলে পানি হয়। অসংখ্য প্রাকৃতিক নিয়ম সবই স্ব স্ব সৃষ্টির ধর্ম। এ ধর্ম কার সৃষ্টি? এককথায় মহান স্রষ্টার। প্রতিটি বস্তুনিচয় সৃষ্টির পর স্রষ্টা তার জন্য একটা নিয়ম বা বিধান তৈরি করে দিয়েছেন, যেটাকে বলা হয় প্রাকৃতিক নিয়ম বা খধি ড়ভ হধঃঁৎব। সৃষ্টির সময় থেকে এভাবে স্বয়ং স্রষ্টা সকল সৃষ্টির মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাকৃতিক বিধান তৈরি করে দিয়েছেন যা প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য অলংঘনীয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সকল সৃষ্টি তা মেনে চলছে। তা না হলে সৃষ্টিজগতে অনিবার্যভাবে বিপর্যয় ঘটত। বস্তু জগতের জন্য এটা খধি ড়ভ হধঃঁৎব বা প্রাকৃতিক বিধান।
মানুষ সৃষ্টির পর মহান স্রষ্টা মানুষের জন্যও অনুরূপ বিধান তৈরি করে দিয়েছেন, যেটাকে আমরা বলি ‘দ্বীন’ বা মানুষের ধর্ম (ৎবষরমরড়হ ড়ভ সধহ)। তবে বস্তু জগতের অন্য সবকিছুকে তাদের স্ব স্ব ধর্ম পালনে (খধি ড়ভ হধঃঁৎব) যেমন বাধ্য করা হয়েছে, মানুষকে সেভাবে বাধ্য করা হয়নি। মানুষ ইচ্ছা করলে এটা পালন করে পৃথিবীতে শান্তিপূর্ণ কল্যাণময় মানব সমাজ গড়ে তুলতে পারে আবার ইচ্ছা করলে এ ধর্ম না মেনে নিজের ইচ্ছামতো মনগড়া আইনকানুন অনুযায়ী জীবন-সমাজ-রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিচালনা করে অনিবার্য বিবাদ-বিসম্বাদ, ধ্বংস ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। পরস্পর-বিরোধী দুটি পথই তার জন্য খোলা আছে। একটি ধ্বংস ও বিপর্যয়ের পথ, অন্যটি শান্তি ও কল্যাণের পথ।
মানুষকে এভাবে স্বাধীনতা দেয়া হলো কেন? তার একমাত্র কারণ মানুষ অন্য কোনো বস্তু বা প্রাণীর মতো নয়, সে নৈতিক জীব (ৎধঃরড়হধষ নবরহম)। সঠিক পথ বেছে নেয়ার জন্য মহান স্রষ্টা মানুষকে জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি দান করেছেন, যা অন্য কোনো সৃষ্টিকে প্রদান করা হয়নি। নৈতিক জীব হওয়ার কারণেই তাকে জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি প্রদান করা হয়েছে, ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধির চর্চা করে সে আদিম পৃথিবীতে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের দ্বারা উন্নত মানবিক সভ্যতার পত্তন ঘটিয়েছে এবং ক্রমাগত তার বিকাশ সাধনে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তাই আধুনিক মানব সভ্যতা সমগ্র মানব জাতির সামগ্রিক অর্জন। ধর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন, সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করে মানুষ বিশ্বকে উন্নত প্রজ্ঞাবান-সংস্কৃতিবান মানুষের বাসপোযোগী করে তুলেছে। এ সবকিছুকে ধারণ করে আছে সভ্যতা। আর সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য অঙ্গ সংস্কৃতি।
আরবি ‘দ্বীন’ শব্দের অর্থ ধর্ম বা জীবনবিধান। উপরে যে ‘দ্বীন’-এর উল্লেখ করা হয়েছে, মূলত তা তিন প্রকার। প্রথমত আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত দ্বীন, দ্বিতীয়ত আদিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত কিন্তু পরবর্তীতে মানুষের দ্বারা বিভিন্নভাবে বিকৃত দ্বীন এবং তৃতীয়ত মানবরচিত দ্বীন।
আদি মানব আদম (আ.) থেকে প্রচলিত আল্লাহ-প্রদত্ত দ্বীন একটাইÑ যার নাম ইসলাম। যুগে যুগে বিভিন্ন নবী ও রাসূলের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পরিশুদ্ধ ও যুগোপযোগী করেছেন। সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ ও কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছেন। এ জন্য আল-কোরআনে এটাকে ‘আদ্বীন’ (ঞযব ৎবষরমরড়হ) বা একমাত্র দ্বীন বা জীবন-ব্যবস্থা বলা হয়েছে। পূর্ববর্তী বিভিন্ন নবী-রাসূলদের সময় প্রদত্ত দ্বীন কালক্রমে বিকৃত হয়ে ভিন্ন নামে প্রচলিত রয়েছে। যেমন ঈসা (আ.)-এর দ্বীন বিকৃত হয়ে ‘খ্রিস্টান ধর্ম’, মুসা (আ.)-এর দ্বীন বিকৃত হয়ে ‘ইহুদি ধর্ম’ ইত্যাদি নামে প্রচলিত হয়েছে। অনুরূপভাবে, ইব্রাহীম (আ.) ও অন্যান্য নবী-রাসূলদের প্রচারিত দ্বীনও এমনভাবে বিকৃত হয়েছে যে, তা এখন আর আসলরূপে চিহ্নিত করার উপায় নেই। তবে এগুলো আদিতে ইসলাম এবং এর মূল প্রচারক ছিলেন আল্লাহর কোনো নবী বা রাসূল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে কারণে প্রত্যেক ধর্মগ্রন্থেই কিছু কিছু শ্বাশত সত্য বাণী রয়েছে, তা থেকে মনে হয়, এগুলো মহান স্রষ্টার বাণী।
তৃতীয়ত, মানবরচিত দ্বীন বিভিন্ন যুগে তৈরি হয়েছে। যুগ-বিবর্তনে তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটেছে। বিভিন্ন উপজাতি ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মকে এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা চলে। এগুলোকে সাধারণত উপজাতীয় বা নৃতাত্ত্বিক ধর্ম বা প্রাকৃতিক ধর্মও বলা হয়। সভ্যতার আলো ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে এসব ধর্মের আচার-আচরণ-পদ্ধতির মধ্যেও নানা পরিবর্তন ঘটেছে। তবে সর্বাবস্থায় এগুলো আচার-আচরণ, রীতি-পদ্ধতি, সংস্কার ও সাধারণ ধারণা-বিশ্বাস থেকে এ জাতীয় ধর্মের উদ্ভব ঘটেছে। এর মূলে কোনো ঐশী বিশ্বাস বা আসমানি কিতাবের অস্তিত্ব নেই। তাই এসব ধর্মের ভিত্তিতে উদ্ভূত বিভিন্ন ধরনের সংস্কতি সম্পূর্ণ আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি ও প্রথাসর্বস্ব।
বিকৃত ধর্মের ভিত্তিতে যেসব সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে, সেগুলোর মধ্যেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও রীতি-নীতির প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হিন্দুধর্মের মূল শিক্ষা (ধর্মগ্রন্থ বেদ অনুযায়ী) ‘একমেবাদ্বিতীয়াম’ অর্থাৎ ঈশ্বর এক ব্যতীত দ্বিতীয় নেই। অথবা বেদ অনুযায়ী ঈশ্বরের কোনো প্রতিমা বা মূর্তি নেই। কিন্তু প্রচলিত হিন্দু ধর্মে ৩৩ কোটি অথবা অসংখ্য দেব-দেবীর অস্তিত্ব বিদ্যমান এবং তাদের ধর্মীয় পূজা-পার্বণ, আচার-অনুষ্ঠানে দেব-দেবীর মূর্তি বা প্রতিমা ব্যতীত কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কথা কল্পনাই করা যায় না। এটা তাদের ধর্মীয় মূলনীতির বিপরীত। কিন্তু প্রচলিত হিন্দুধর্মে এটাই চলে আসছে এবং এর বিরোধিতাকে হিন্দুধর্মের বিরোধিতা মনে করা হয়। ফলে তাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে হিন্দুধর্মের আচরিত বিধিবিধান-অনুষ্ঠানকে ভিত্তি করে। প্রচলিত ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের ভিত্তিতে উদ্ভূত সংস্কৃতির মধ্যেও তাদের স্ব স্ব ধর্মে আচরিত বিধিবিধান, রীতিনীতি-প্রথার প্রতিফলন ঘটেছে। তাই বিকৃত ধর্ম ও মানবরচিত ধর্মের ভিত্তিতে উদ্ভূত সংস্কৃতি মূলত মানুষের তৈরি বিধিবিধান, রীতিনীতি-প্রথা ও আচার-আচরণের প্রতিফলন।   
কিন্তু স্রষ্টা-প্রদত্ত অপরিবর্তিত দ্বীনের ভিত্তিতে পরিগঠিত সংস্কৃতির মূলে একত্ববাদের একক প্রভাব বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ দ্বীন ইসলামের কথা বলা যায়। ইসলামের মূলভিত্তি পাঁচটিÑ কলেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাত। কলেমা অর্থ এক অদ্বিতীয় সর্বশক্তিমান মহান স্রষ্টার প্রতি দৃঢ় ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন। কলেমা বিশ্বাসগত, বাকি সবই আচরিক। অর্থাৎ ঈমান হলো একটি বিশ্বাস, যা মুখে উচ্চারণ করতে হয়, অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতে হয় এবং জীবনের অন্যান্য সকল কাজকর্ম, আচার-আচরণ, ধ্যান-জ্ঞান-চিন্তা-চেতনায় তার সম্যক প্রতিফলন ঘটাতে হয়। ঈমান ব্যতীত নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত কোনো কিছুই কবুল হয় না। অর্থাৎ ইসলামের মূল ভিত্তি ঈমান এবং জীবনের সকল কর্ম ও আচরিক বিষয় এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে পরিচালনা করা আবশ্যক।
শাব্দিক অর্থে ঈমান হলোÑ “লাইলাহা-ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যায়, আল্লাহ একমাত্র স্রষ্টা, তাঁকে কেউ সৃষ্টি করেনি, তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, পালন, ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর কোনো সাহায্যকারী নেই, অংশীদার নেই এবং তিনি এককভাবে সকল কিছুর ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী সবর্ময় ক্ষমতার অধিকারী সার্বভৌম সত্তা। তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় তিনি নিজেই দিয়েছেন এভাবেÑ “বল, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” (সূরা এখলাছ, আয়াত : ১-৪)
কলেমার শেষ অংশ “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। রাসূল অর্থ বার্তাবাহক। যুগে যুগে যেসব মনোনীত ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন জমিনে প্রচার করেছেন, তারা সকলেই আল্লাহর নবী ও রাসূল। আখেরি জমানায় সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-কে পাঠানো হয়েছে। তিনি আল্লাহর দ্বীন নিজে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করেছেন ও মানুষের মধ্যে প্রচার করেছেন। তার মাধ্যমেই মানবজাতি ইসলামের পরিপূর্ণ রূপ প্রত্যক্ষ করেছে। সেজন্য তাঁকে মানবতার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ, উজ্জ্বলতম আলোকবর্তিকা ও একমাত্র অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের মূল ভিত্তি দুটিÑ আল্লাহ-প্রদত্ত আসমানি কিতাব বা ‘আল-কোরআন’ ও রাসূলুল্লাহর জীবনাদর্শ বা ‘সুন্নাহ’। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিগঠিত জীবন, সমাজ, রাষ্ট্রই প্রকৃত ইসলামী জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত। কোরআন-সুন্নাহর মধ্যে সকল কিছুর মূলনীতি ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। আমাদের আচরিত জীবন, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছু কোরআন-সুন্নাহর নীতি-আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হলে, তখন সেটাকে প্রকৃত অর্থে ইসলামানুগ বলে চিহ্নিত করা চলে। তবে  কোরআন-সুন্নাহর নীতি-আদর্শ পরিপূর্ণরূপে অনুসৃত না হলে সেটাকে পুরাপুরি ইসলামী বলা যায় না। বড় জোর, সেটাকে আংশিকভাবে মুসলমানি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, পরিপূর্ণ ইসলামী নীতি-আদর্শের প্রতিফলন বর্তমানে কোনো দেশ বা সমাজে আছে কিনা। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে যে কোনো দেশ ও সমাজে ইসলামী নীতি-আদর্শ কতটুকু প্রচলিত আছে, তা থেকে এর জবাব খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কোরআন ও সুন্নাহর নীতি-আদর্শ চিরন্তন, শ্বাশত ও সর্বকালীন সকল মানুষের জন্য। যে কেউ তা পরিপূর্ণরূপে অথবা আংশিকরূপে গ্রহণ করতে পারে বা অস্বীকারও করতে পারে। তবে তা গ্রহণ করে যতটুকু সাফল্য অর্জন সম্ভব, গ্রহণ না করলে বা আংশিকভাবে গ্রহণ করলে অনুরূপ সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। বরং অস্বীকারকারীদের জন্য যে মন্দ পরিণতি অপেক্ষা করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সর্বশেষে যে কথাটি বলতে চাই, তা হলোÑ একজন প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি যখন কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবনযাপন করে, তখন তার জীবন দুনিয়ার অন্য সব মানুষ থেকে আলাদা রূপ পরিগ্রহ করে। একজন ঈমানদার দুনিয়ার সব কাজকর্মের মধ্যে নিয়োজিত থেকে সর্বক্ষণ আখিরাতের চিন্তায় মশগুল থাকে। যে ব্যক্তি জীবনে সর্বক্ষণ আখিরাতের চিন্তায় মগ্ন থেকে আখিরাতের সুখ-শান্তি-কল্যাণ প্রত্যাশা করে, সে দুনিয়ায় কখনো কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত হতে পারে না, কোনো খারাপ আচরণ করতে পারে না এবং খারাপ চিন্তায়ও মগ্ন হতে পারে না। তার জীবন হয় সুন্দর, নিষ্কলুষ, পবিত্র ও পরিশুদ্ধ। এরূপ সুন্দর নিষ্কলুষ পরিশুদ্ধ মানুষের লেনদেন, আচার-আচরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি তথা সামগ্রিক জীবনচর্যার মধ্যেও কোনো অরুচিকর, অশ্লীল, অন্যায়, অবৈধ, গর্হিত কোনো বিষয় স্থান পেতে পারে না। একজন মুসলিমের কথা-কাজে-চিন্তায় যেমন কোনো অন্যায়-অবৈধ-গর্হিত-অশালীন বিষয় স্থান পায় না, তেমনি তার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ভাবনায়ও কখনো অনুরূপ কোনো বিষয় স্থান লাভ করতে পারে না। তাই একজন মুসলিম নামধারী কবি-সাহিত্যিকের লেখায় যখন কোনো অশ্লীল শব্দ, অশালীন ভাবনা ও কদর্য চিন্তা-অনুভূতির প্রকাশ ঘটে, তখন সেটাকে কোনোভাবেই ইসলামী সাহিত্য বা মুসলমানের সাহিত্য রূপে আখ্যায়িত করা চলে না। অনুরূপভাবে একজন মুসলিম নামধারী সংস্কৃতি-ব্যক্তিত্বের সাংস্কৃতিক কর্মকা--অনুষ্ঠান ও পরিবেশনা যখন অরুচিকর, অশালীন ও মানুষকে বিকৃত, গর্হিত চিন্তা-ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করে, তখন সে সংস্কৃতিকে কোনোভাবেই ইসলামী বা মুসলিম সংস্কৃতি বলে আখ্যায়িত করা যায় না। সাহিত্য-সংস্কৃতি সত্য-সুন্দর-কল্যাণের বার্তাবাহক। মানুষের মধ্যে পরিশীলিত, পরিমার্জিত, পরিশুদ্ধ জীবনবোধ, কল্যাণকামী চিন্তা-চেতনা ও মানবিকরসে জারিত সুস্থ, শালীন অনুভূতি সৃষ্টি করাই প্রকৃত মহৎ সাহিত্য-সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য। বর্তমানে সাহিত্য-সংস্কৃতির নামে যা চলছে, সৃষ্টিশীল মহত্তম মানবকৃতি হিসেবে যা অজস্র ধারায় সমাজকে প্রভাবিত করে চলেছে, তা কতটুকু শ্রেয়, কল্যাণকর ও শুভ ফলদায়ক তা চিন্তাশীল প্রত্যেক ব্যক্তিকেই গভীরভাবে চিন্তা করে দেখতে হবে।
যাই হোক, আমার মূল বক্তব্য এই যে, ধর্ম যুগে যুগে মানুষের জীবন-ভাবনাকে যেমন প্রভাবিত করেছে, তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ধর্মের অনিবার্য প্রভাব রয়েছে। ধর্মের নামে যুগে যুগে যেসব রীতিনীতি-প্রথা চালু হয়েছে, কালক্রমে সেগুলোও সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পের অঙ্গীভূত হয়েছে। ইসলাম এক স্রষ্টা-প্রদত্ত অবিকৃত ধর্ম হিসেবে এর অনুসারীদের জীবনকে যুগে যুগে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, সেভাবে মুসলমানদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বা জীবনের অন্যান্য সকল কৃতীকেও প্রভাবিত করেছে। ফলে ইসলামী সংস্কৃতির মূল উপাদান, রূপরেখা ও অন্তপ্রেরণা অন্য সব সংস্কৃতি থেকে বহুলাংশে ভিন্ন। আখিরাতের জবাবদিহিতামূলক জীবনানুভূতি থেকে নির্গত মুসলমানদের জীবন-সমাজ ও সংস্কৃতি তাই সর্বদা এক সুন্দর-সুস্থ-শ্বাশত মানবকল্যাণমুখী জীবন ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ।   
উপসংহারে এ বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে চাই যে, বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার শুরু হয়। দ্বাদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে (১১৯৯-১২০৪) ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বঙ্গবিজয় করে গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসলামের প্রচার-প্রসার ব্যাপকতা লাভ করে এবং একসময় এদেশে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মুসলমানদের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে এদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্য সবকিছুর মধ্যে ইসলামী আদর্শের প্রাধান্য ঘটে। ইংরেজ আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭) মুসলিম আধিপত্য সর্বক্ষেত্রে খর্ব করা হলেও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামগ্রিকভাবে জীবন-বিশ্বাস ও জীবনাচারের ক্ষেত্রে ইসলামের প্রভাবকে ক্ষুণœ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাঙালি হয়েও যুগ যুগ ধরে বাঙালি মুসলিম বাঙালি হিন্দু থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে। বাঙালি মুসলিম স্বীয় অস্তিত্ব বজায় ও সম্যক বিকাশের প্রয়োজনে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা গড়ে তুলেছে এবং নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে। ফলে ভারত বিভক্ত হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকা নিয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের কারণে এবং স্বতন্ত্র জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক চেতনার উৎসারণেই মূলত বাঙালি মুসলমানদের স্বাধীন স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ঐতিহাসিক বাস্তবতা অস্বীকার করার অবকাশ নেই।
স্বাধীনতা এক দুর্লভ ও পরম কাক্সিক্ষত বিষয়। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা সুরক্ষিত করার দায়িত্ব প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের অপরিহার্য কর্তব্য। স্বকীয় জাতিসত্তা ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির লালন ও বিকাশের দ্বারাই স্বাধীনতার ভিতকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করা সম্ভব।
লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক



 

Show all comments
  • Abul Kalam Azad ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭, ১২:১৮ এএম says : 0
    ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হয়েছিল ধ‌র্মের ভিওিতে আর ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভিওিতে।মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগুলি নিন্মরুপ: ১.বাঙালি জাতিয়তাবাদ ২.ধ‌র্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট ৩. সমাজতন্ত্র ও ৪.গনতন্ত্র কখনও বাঙালি মুসলমানদের স্বাধীন স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত হয় নাই,আর স্বাধীন বাংলাদেশ বাঙালি মুসলমানদের রাষ্ট নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সকল ধ‌র্ম, ব‌র্ন নি‌র্বিশেষে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রগতিশীল রাষ্ট ।কখনই ইসলামের কিংবা শুধুই মুসলমানদের রাষ্ট নয়।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।