Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

সুন্দরবনে বেড়েই চলেছে অপতৎপরতা নিষিদ্ধ রেঞ্জে চলছে

মৎস্য নিধন

মনিরুল ইসলাম দুলু : | প্রকাশের সময় : ৪ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারে দুষ্কৃতকারী চক্রের অবাধ তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। ম্যানগ্রোভ বনের বিভিন্ন নদ-নদী ও খালে বিষ প্রয়োগে মৎস্য শিকারের প্রবণতায় হুমকির মুখে পড়েছে বনাঞ্চলে মৎস্য সম্পদের প্রজনন ও উৎপাদন। অসাধু বনরক্ষীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নির্বিচারে চলছে মৎস্য নিধন। জেলে নামধারী এক শ্রেণির দুষ্কৃতকারীদের অতি অল্প সময়ে বেশি মাছ আহরণ ও লাভ হলেও সুন্দরবনের প্রকৃত জেলেরা নিঃস্ব হচ্ছে। আর এ কারণে বনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রজনন আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে।

বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করায় শুধু মৎস্য সম্পদই নয়, হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জলজ প্রাণিও। বিষ দিয়ে মাছ শিকার দন্ডণীয় অপরাধ। কিন্তু অবৈধ এই কারবার ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্টরা। সুন্দরবনের ছোট খাল থেকে বিষ দিয়ে ধরা হয় চিংড়ি। খালের মাথায় বিষ ঢেলে চলছে মাছ ধরার এই বিষাক্ত প্রক্রিয়া। খালের বড় মাছগুলো ধরার জন্য দেয়া হয় অন্য ধরনের বিষ। পাতানো জালে আটকা পড়ে সাদা মাছ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনসহ এখানকার অসংখ্য খালে আছে তিন শতাধিক প্রজাতির মাছ। এরমধ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ মিলিয়ে পুরো সুন্দরবনের অভ্যন্তরে থাকা মোট চারটি রেঞ্জের আওতাধীন ১৮টি খালে সব ধরনের জেলে প্রবেশ ও মাছ ধরার জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়। নিষিদ্ধ ১৮টি খালে ডিমওয়ালা মা মাছ ডিম ছাড়ার জন্য নিরাপদে অবস্থান নেয়। মাছের প্রজননের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কেউ তা শিকার করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এ সব এলাকায় মাছ শিকার চলছে দেদারছে। বন কর্মকর্তাদের টাকা দিলেই দেওয়া হয় মাছ ধরার অনুমতি। তিনটি স্তরে দিতে হয় এই টাকা ।

সুন্দরবনের বন্য পাণী পাচার ও শিকার এবং বন্দর কেন্দ্রিক চোরাকারবারিদের হোতা কথিত আদায়কারি দেলোয়ার মংলা, বানিশান্তা ও মোড়েলগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দাদনে টাকা দিয়ে লোক সংগ্রহ করে থাকে। তাদেরকে নিয়ে আসা হয় সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদাপাই রেঞ্জে। সেখান থেকে দেওয়া হয় বনে প্রবেশ করার অলিখিত পারমিট। তাদের কাছ থেকে এই সকল লোক মাথা পিছু ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে বনে প্রবেশ করে চলে যায় নিষিদ্ধ খাল এলাকায়।

এই রেঞ্জ এলাকায় মাছ ধরা ও বন্য প্রাণী শিকারের নিরাপদ এলাকা হিসেবে বেছে নেয় এই সকল পাচারকারীরা। মংলা থেকে কখনও কখনও অন্য রেঞ্জ এলাকাতেও লোক পাঠানো হয়। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদাপাই এক কর্মকর্তা যোগদানের পর এই এলাকায় শিকার ও পাচারের ঘটনা ওপেন সিক্রেট বলে জানান পাচারকারীরা ।

কয়েকজন জেলে জানান, সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নীল কমল, কেওড়াসুটি, কাকা খাল,চান্দাবুনিয়া, বুন্দা খাল ও সিদ্দিক পয়েন্টে দিয়ে তাদের পাঠানো হচ্ছে। কাকড়া ধরা লোকজন কেওড়াসুটি খালে এবং চরঘেরা ও কাঠিজাল দিয়ে মাছ ধরা লোকজন চান্দাবুনিয়া এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকে। সেখানে প্রতি গোনে (৭দিন) কাকড়া ধরার জন্য ৪হ াজার টাকা, চরঘেরা ও কাঠিজাল জেলেদের ৬ হাজার টাকা করে দিতে হয় বন বিভাগকে।

মাছ শিকারকারীরা বলেন, চিংড়ি মাছসহ পাতারি ও টেংরাসহ সবই মারা পড়ছে বিষে। এখানে ডেনটন নামের এক মেডিসিন দেয়া হয়। এটি বোতলে থাকে। এর দাম ১০০ গ্রাম ১২০ টাকা। একটি খালে ৭-৮টি ডেনটন দিলেই হয়। জেলেরা জানায়, মেডিসিন পানিতে ঠেলে হাত দিয়ে গুলিয়ে দেয়ার পর যখন পানি আগের মতো হয়ে যায় তখন সব মাছ ভেসে ওঠে। তারা জানায়, বিষ ছাড়া মাছ পাওয়া যায় না।বন কর্মকর্তদের টাকার বিনিময় ম্যানেজ করে তারা মাছ শিকার করেন ।

যা বিষয় বেশি অভিযোগ সেই সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ চাঁদপাই রেঞ্জের চাঁদপাই স্টেশন কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান জানান, জেংড়া থেকে আন্ধারমনিক পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা নিষিদ্ধ রয়েছে। তিনি কাউকেই টাকার বিনিময় সুন্দরবনে পাঠানো অভিযোগ অস্বীকার করেন। খুলনা বন সংরক্ষক আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, বিষ দিয়ে মাছ শিকারকারীদের তালিকা করেছে বন বিভাগ। তাদের সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিভাগিয় বন কর্মকর্তা (সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ) মোঃ মাহমুদুল হাসান জানান, গত ২০১৭ সাল ১জুলাই থেকে চলতি বছরের ২৫ জুন পর্যন্ত তার অধিন চাঁদপাই ও শরনখোলা রেঞ্জে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের দায়ে ১৪টি মামলা হয়েছে ।

মংলাস্থ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের সদর দপ্তরেরঅপারেশন কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট ইমতিযাজ আলম জানান, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরায় শুধু এক প্রকারের মাছের ক্ষতি হচ্ছে না, অন্য সব প্রজাতির মাছই ধ্বংস হচ্ছে, পাশাপাশি এর সঙ্গে বন ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে কঠোর অভিযানের চালিয়ে যাচ্ছে কোস্টগার্ড।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ