Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০২ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ সফর ১৪৪১ হিজরী

একটি বিশ্বাসঘাতকতা...

কাতারের সাথে বিরোধে ইউএই সউদী পক্ষে যোগ না দেয়ায় অসন্তোষ সৃষ্টি

ডন | প্রকাশের সময় : ৬ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বশির আবুধাবিতে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের (এমবিজেড) সাথে সাক্ষাত করেন। সে সময় সুদান ও ইউএইর মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ ছিল। ইরান ও তাদের মিত্র মইয়েমেনের সরকার বিরোধী হুতি জোটের বিরুদ্ধে সউদী ও ইউএই নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অংশ হিসেবে ১৪ হাজারের মত সুদানি সৈন্য ইয়েমেনে লড়াই করছিল।
সুদানি সরকারের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ক‚টনীতিকদের মধ্যে এমবিজেড নামে পরিচিত যুবরাজ মোহাম্মদ আরেকটি ক্ষেত্রে বশিরের সহযোগিতা চাইছিলেন। আর সেটি ছিল ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের দমন করা।

ইউএই রাজনৈতিক ইসলামকে মোকাবেলার জন্য আঞ্চলিক প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল। তারা ও সউদী আরব এটাকে রাজতন্ত্র এবং এ অঞ্চলের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখত। ২০১১ সালে যখন আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে, সে সময় এ প্রচেষ্টা নতুন গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে একটি উগ্রপন্থী গ্রæপ মুসলিম ব্রাদারহুড ব্যাপক শক্তি অর্জন করছিল। ইউএই ও সউদী আরব মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করত। তবে ব্রাদারহুড বলে, তারা শান্তিপন্থী।

২০১২ সালে মিসরীয়রা মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসিকে তাদের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। এক বছরের মধ্যেই তিনি সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন যা ইউএই ও সউদী আরবকে সন্তুষ্ট করে। দেশ দুটি কুয়েতের সাথে মিলে পরবর্তী ১৮ মাসে মিসরকে ২৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য প্রদান করে।

সুদানে ইসলামী উগ্রপন্থীরা কয়েক দশক আগে থেকেই মিসরের চেয়ে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত ছিল। বশির ধর্মীয় জান্তার প্রধান হিসেবে ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা দখল করেন। উগ্রবাদ সামরিক বাহিনী, গেয়েন্দা বিভাগ ও প্রধান প্রধানমন্ত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করছিল।

সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বশির ও এমবিজেড একটি সমঝোতায় পৌঁছেন যে বশির ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের নির্মূল করবেন। বিনিময়ে ইউএই সুদানকে আর্থিক সাহায্য দেবে। বশির এটা কিভাবে করবেন সে বিষয়ে কোনো আভাস দেননি। বৈঠককালে সম্প্রচারিত মন্তব্যে এমবিজেড ইয়েমেনে ইউএই ও সউদী সৈন্যদের সমর্থনে নিজ সৈন্য পাঠানোর জন্য সুদানি নেতাকে ধন্যবাদ জানান।

বশিরের পাশে উপবিষ্ট এমবিজেড বলেন, আমি সুদানি প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে একটি সত্য কথা বলতে চাই। যা ঘটছিল ও পরিস্থিতি যখন খারাপ হচ্ছিল, সুদান কোনো প্রতিদানের আশা না করেই আরব জোটকে সমর্থন দেয়।

আবুধাবি আলোচনার পর ইউএই থেকে শত শত কোটি ডলার দেয়া হয় সুদানকে। ইউএই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা জানায়, গত বছরের মার্চে ইউএই সুদান জাতীয় ব্যাংক, বেসরকারি বিনিয়োগ ও আবুধাবি উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে সুদানে মোট ৭৬০ কোটি ডলার প্রেরণ করে।
ওমর বশিরের অন্যতম বিশ^স্ত সহযোগী ছিলেন তার অফিসের পরিচালক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাহা ওসমান আল-হোসেন। তাকে ইউএই ও সউদী আরবের সাথে সুদানের সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। সহকর্মীরা তাকে উচ্চাকাক্সক্ষী ও দক্ষ হিসেবে জানতেন। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা তার প্রভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল যে হোসেনের মাধ্যমে তারা বশিরের কাছে পৌঁছতে পারতেন না। হোসেন কার্যকরভাবে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন।

একটি ঘটনায় তিনি সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পরিহার করে সুদানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ও সউদী আরবের বার্তা সংস্থার কাছে পররাষ্ট্র নীতি ঘোষণা প্রদান করেন। বশিরের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ঘামার হাবানি বলেন, বশিরের মনের উপর এ লোকটির জাদুকরি প্রভাব ছিল।
হোসেনের শত্রæদের মধ্যে ছিলেন তৎকালিন গুপ্তচর প্রধান ও নেতৃস্থানীয় রাজনীতিকরা। তারা সউদী আরবের পক্ষে গুপ্তচর বৃত্তির জন্য তাকে অভিযুক্ত করেন। সুদানি গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, সউদী আরব ও ইউএই দুবাইয়ের একটি ব্যাংক একাউন্টে তার নামে ১০৯ মিলিয়ন ডলার জমা দিয়েছে। কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, হোসেন বশিরের সাথে বৈঠকে এ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

হোসেন সউদী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলে জানার পর ২০১৭ সালের জুনে বশির তাকে বরখাস্ত করেন। হোসেন রিয়াদে চলে যান এবং সউদী আরব ও ইউএইর একজন উপদেষ্টা হন। এখনো তিনি এ পদে আছেন ও দুই দেশের মধ্যে শাটলককের মত আসা যাওয়া করেন।

মন্তব্যের জন্য রয়টার্স হোসেনের কাছে পৌঁছতে পারেনি। ইউএই ও সউদী সরকার এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্নের জবাব দেয় না। হাবানি বলেন, তাহা আল-হোসেনের ঘটনাটি বাশিরের জন্য কলঙ্কের বড় দাগ হয়ে আছে। তার চাকরিচ্যুতি ইউএইর জন্য একটা বড় ধাক্কা ছিল।
আমরা ইসলামপন্থী
২০১৭ সালের গ্রীষ্মে আরব দেশগুলোর মধ্যে এক ক‚টনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়। ইউএই ও সউদী আরব মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি অব্যাহত সমর্থন প্রদানের জন্য কাতারের সাথে ক‚টনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ বিরোধ বশিরকে কঠিন অবস্থায় ফেলে দেয়। ইউএইর মত কাতারও সুদানের দরিদ্র অর্থনীতির জন্য শত শত কোটি ডলার আর্থিক সাহায্য দিয়েছিল।
সুদানে বশিরের উগ্রপন্থী মিত্ররা কাতারের সাথে সংযোগ রক্ষা এবং এ বিরোধে কোনো পক্ষ না নেয়ার জন্য তার উপর চাপ সৃষ্টি করে। তাদের বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট- আমরা কাতারের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করব। গত বছরের মার্চে সুদানের উপক‚লে লোহিত সাগরতীরস্থ বন্দর সুয়াকিমের যৌথ উন্নয়নে সুদান ও কাতার ৪০০ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি পরিকল্পনা গ্রহণে ঐকমত্যে পৌঁছে।
বশির এ বিরোধে ইউএই ও সউদী আরবকে সমর্থন না করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার সরকারে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের প্রভাব বিলুপ্ত না করার পক্ষে মত দেন। উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বশির ক্ষমতাশালী নেতাদের সরিয়ে দিতে ভীত ছিলেন। এ ক্ষমতাশালীদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট আলি ওসমান তাহা ও তার উত্তরসূরি বাকরি হাসান সালেহ। যে অভ্যুত্থানে বশির ক্ষমতায় আসেন, তিনি তাতে অংশ নিয়েছিলেন।

গত বছরের অক্টোবরে সুদান এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ে। রুটি, জ¦ালানি ও নগদ অর্থের সরবরাহ হ্রাস পায়। বশিরের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির এক বৈঠকে দলের কর্মকর্তা হাব্বানি প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করেন যে সউদী আরব ও ইউএই কেন সুদানের সাহায্যে আসছে না। বশির জবাবে বলেন, আমার ভাইয়েরা চায় যে আমি যেন আপনারা যারা ইসলামপন্থী, তাদের কাছ থেকে মুক্তি লাভ করি।

গত বছরের ডিসেম্বরে ইউএই সুদানে জ¦ালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। বশির ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার তার অঙ্গীকার পূরণ না করায় দেশটি অসন্তুষ্ট হয়। হাবানি বলেন, ইউএই ও সউদী আরব বশিরকে আর অর্থ সাহায্য না দেয়ার সিদ্ধান্তÍ নেয়। কারণ তিনি ইসলামী উগ্রপন্থীদের হাত থেকে মুক্ত এবং কাতারের বিরুদ্ধে সউদী আরব ও ইউএইকে সমর্থন করতে রাজি হচ্ছিলেন না। সুদানের তাদের পক্ষ নেবে না, এটা তারা মেনে নিতে পারেনি।

চলতি বছরের ফেব্রæয়ারিতে দেশের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত সুদানের শুরা কাউন্সিলের এক বৈঠকে তার ভাগ্য নির্ধারণ করেন বলে দেখা যায়। তখন রুটির মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বশির ঘোষণা করেন, আমরা ইসলামপন্থী এবং সে জন্য গর্বিত। সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ফেরার পথ ছিল না। পরিষ্কার হয়ে যায় যে বশির ইসলামপন্থীদের দমন করছেন না। (আগামীকাল সমাপ্য)



 

Show all comments
  • Muhammad Nasrullah ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৬ এএম says : 2
    পশ্চিমা মিডিয়া মুসলিমদের বিষয়ে যে খবরই প্রচার করুক না কেন তা আমাদের যাচাই করে দেখা উচিত, কেননা কুরআন স্বাক্ষী তারা কখনোই আমাদের মঙ্গল চায় না। তারা কখনোই আমাদের বন্ধু হতে পারে না ।
    Total Reply(0) Reply
  • Mamunur Rashid ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 2
    একে একে সব ইসলামপন্থী সরকার‌কে ষড়য‌ন্ত্রের মাধ্য‌মে উৎখাত করা হ‌চ্ছে । ইহুদী ও খ্রিষ্টান স‌ম্মি‌লিত জোট একসা‌থে কাজ কর‌ছে ইসলা‌মের প্রদীপ‌কে চিরত‌রে নি‌ভি‌য়ে দি‌তে । এখনই সময় সব ভেদা‌ভেদ ভু‌লে সকল মুস‌লিম এক হ‌য়ে ও‌দের বিরু‌দ্ধে জিহা‌দের । আল্লাহর সাহায্য অতি স‌ন্নিক‌টে ।আর জা‌লিমরা ইনশাআল্লাহ পরা‌জিত হ‌বেই ।
    Total Reply(0) Reply
  • Monir Hossain ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 2
    আমেরিকা যাকে মন্দ বলবে সে আমাদের জন্য ভাল।
    Total Reply(0) Reply
  • Mahbub Sufi ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 2
    শতভাগ সত্য,আমি দারফুর-নিয়ালা একবছর un কাজ করার সুযোগ হয়েছিল,আসলে চিরন্তন সত্য,লেখাটি আসলে বাস্তবতার সাথে মিল রয়েছে,
    Total Reply(0) Reply
  • Abbas Ahmed ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 1
    অতশত বুঝি না যা বুঝি আর মনে করে তা হলো আল্লাহ তায়লা কোরআন এ উল্লেখ করেছেন ইহুদি নাসারা মুশরিকরা কখনো তুমাদের বন্ধু না ।তুমাদের দুঃখে তারা বাহিরে খুশি ভিতরে আরো বেশি খুশি ।ওরা যাদের কে ভাল বলবে মূলত তারা মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকর আর যাকে খারাপ বলবে সে মুসলিমদের জন্য ভাল।
    Total Reply(0) Reply
  • মুহাম্মদ শামীম হোসাইন ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৮ এএম says : 1
    গনতন্ত্র নামক বিষফোঁড়ার কারনেই পশ্চিমারা মুসলিম দেশগুলোতে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ক্ষমতালোভী সেনাকর্মকর্তা, মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এবং মূর্খ জনগন CIA এর পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, মিশর ও সিরিয়ার পর এখন সুদানও পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রনে চলে গেল। অত্যান্ত দুঃখজনক।
    Total Reply(0) Reply
  • Noruddin Bepari ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৮ এএম says : 0
    আমি সুদানে ১২ বছর যাবত আছি, সুদানের বড় বড় মন্ত্রী ও প্রশাসন এত এত দুর্নীতি করছে যা হিসাব করা যাবেনা, আর সুদানে অর্থনীনি অনেক খারাপ, ব্যাংকে টাকা নাই, খাবারের দোকানে রুটি নাই, যত দিন যায় অতি হারে নিত্য দিনের জিনিস এর দাম বাড়ে অতিমাত্রায়।
    Total Reply(0) Reply
  • Dipu Sk Al Amin ৬ জুলাই, ২০১৯, ১:৩৯ এএম says : 2
    এতক্ষনে বুঝলাম এই অভ্যূথথানে সৌদি আরব কেন এত সমর্থন করতেছে।
    Total Reply(1) Reply
    • A.R.Saifullah ১১ জুলাই, ২০১৯, ৮:৪২ পিএম says : 1
      Saudi Arabia

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সুদান


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ