Inqilab Logo

সোমবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ৩০ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অনন্য অর্জন

| প্রকাশের সময় : ৭ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

বাংলাদেশের ক্রিকেট দল যে বিশ্বের বড় বড় দলগুলোর কাছে এখন আর হেসেখেলে উড়িয়ে দেয়ার দল নয়, তা অনেক আগেই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সব বড় দলকে নিয়মিতই হারিয়েছে। হোম সিরিজে নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়েকে হোয়াইট ওয়াশ করেছে। অন্যান্য বড় দলগুলোকে হারিয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সামর্থ্য কতখানি তা বুঝিয়ে দিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল সেমিফাইনাল খেলা। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এ টার্গেট করাকে বড় দলগুলোর কাছে উচ্চাভিলাসী মনে হয়েছিল। তবে প্রথম ম্যাচে যখন দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাশক্তিধর দলকে হারিয়ে দিল, তখন অন্য দলগুলো নড়েচড়ে বসে। শ্রীলঙ্কার সাথে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পÐ হয়ে যাওয়ার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তিনশ’র বেশি রান অবলীলায় তাড়া করে জেতার মধ্য দিয়ে পরাশক্তির দলগুলোকে এই ম্যাসেজই দেয়, আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্যই এসেছি। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে, শ্রীলঙ্কার সাথে ম্যাচটি যদি বৃষ্টিতে ভেসে না যেত তবে তাকে হারিয়ে এতদিনে সেমিফাইনালে পৌঁছে যেত। এই একটি ম্যাচই বাংলাদেশের লক্ষ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতের মতো পরাশক্তির দলগুলোর সাথে যেভাবে পাল্লা দেয় তাতে তাদের কপালে হারের দুঃশ্চিন্তা রেখা দেখা দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, টুর্নামেন্টের একেবারে শেষ অবদি পাঁচ নম্বর স্থানটি ধরে রেখেছিল। আশা ছিল, ক্রিকেটীয় ভাষায় অসম্ভব বলে কিছু নেই এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তানকে হারিয়ে সেমিফাইনালে চলে যাওয়ার পথটি প্রশস্ত হতে পারে। সে আশা পূর্ণ হয়নি। শেষ দুই ম্যাচে হেরে এবারের বিশ্বকাপ মিশন শেষ করেছে টাইগাররা। তবে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ক্রিকেটাররা যে দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখিয়েছে তা অতুলনীয়। আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। বড় দলগুলোর সাথে খেলার আগেই হেরে বসে থাকার মানসিকতা অনেক আগে ঝেরে ফেলে তাদের চ্যালেঞ্জ জানানো এবং হারানোর সামর্থ্য আরো ভালভাবে দেখিয়েছে। বিশ্বের তাবৎ কিক্রেটপ্রেমী এবং বিশ্বখ্যাত ধারাভাষ্যকারদের মুখেও অকুণ্ঠ প্রশংসা ঝরেছে। বাংলাদেশের বড় শক্তি যে দর্শক, তারা ইংল্যান্ডের গ্যালারিগুলোকে বাংলাদেশের হোমগ্রাউন্ডে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশের খেলার দিন মনে হতো দেশের মাটিতেই তারা খেলছে। দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে এই দর্শকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বিশ্বের অপরাপর ক্রিকেট দলসহ সবাই বাংলাদেশি দর্শকদের বিপুল উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হয়েছেন। প্রায় একশ’ কোটি দর্শকসহ পুরো বিশ্ব দেখেছে, যে বাংলাদেশকে তারা ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যার দেশ হিসেবে চিনতো, সেই দেশ আজ ক্রিকেটের মতো অভিজাত খেলা নিয়ে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। এই অর্জন এবং গৌরব এনে দিয়েছে আমাদের দামাল ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন বিশ্বকাপের মতো আসরে একটি জয়ের আশাকে পেছনে ফেলে ধারাবাহিক জয়ের মানসিকতা ধারণ করা। বাংলাদেশ যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চ্যাম্পিয়নের পথে যেতে চায় তা প্রমাণ করা। এই মানসিকতার কারণে বেশ কয়েকটি রেকর্ডও হয়েছে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডটি এখন বাংলাদেশের। ব্যক্তিগত রেকর্ডের ক্ষেত্রে সাকিবের কৃতৃত্বকে শুধু বলতে হয় অসাধারণ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারতের যুবরাজের পর দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে পাঁচ উইকেট ও সেঞ্চুরি করেছেন। শচীন টেন্ডুলকার, ম্যাথু হেইডেনের পর এক বিশ্বকাপে তাদের চেয়ে দুই-তিন ম্যাচ কম খেলে ৬০০ রান করা (৮ ম্যাচ) তৃতীয় ব্যাটসম্যান। এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে ওয়ানডেতে ইতিহাসের চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে ৫ হাজার রান, ২৫০ উইকেট ও ৫০ ক্যাচ নেয়ার ‘ট্রেবল’ পাওয়া ক্রিকেটর সাকিব। সাকিব বুঝিয়ে দিয়েছেন, আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে কেন তিনি একটানা অলরাউন্ডারদের তালিকার শীর্ষে থাকেন। যদি বাংলাদেশ সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারত, তাহলে তার কীর্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত তা সহজেই অনুমান করা যায়। সবমিলিয়ে এবারের বিশ্বকাপটি হয়ে উঠেছে সাকিবময়। বাংলাদেশের বোলিংয়ে বিস্ময় বালক মোস্তাফিজুর রহমান পরপর দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেট যেমন নিয়েছেন তেমনি ওয়ানডেতে চতুর্থ দ্রুততম বোলার হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়েছেন। এছাড়া মুশফিকুর রহিম, তামিম, মাহমুদুল্লাহ’র মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের পাশাপাশি সাইফুদ্দিন, মিরাজ, মোসাদ্দেক, লিটন দাসের মতো তরুণ ক্রিকেটাররা তাদের প্রতিভা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রগতির পথে এবারের বিশ্বকাপটি হয়ে থাকবে স্বপ্নের এক বিশ্বকাপ। বলা যায়, বিশ্বকাপ জেতার ভিত্তি হিসেবে এ আসর বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বে দেশের ভাবমর্জাদা বৃদ্ধি এবং সুনাম অর্জনের ক্ষেত্রে ক্রিকেট এখন শীর্ষ স্থানে রয়েছে। আমরা মনে করি, ক্রিকেটের এই অর্জন ধরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ক্রিকেট বোর্ড ক্রিকেটের উন্নয়নে তাদের ধারাবাহিক পরিকল্পনাকে আরও বেগবান করবে। নতুন নতুন প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের বিকাশে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেবে। ক্রিকেটারদের পর্যাপ্ত কোচিং, খাদ্যাভ্যাস, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং বয়সভিত্তিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে বেগবান করে ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করবে। বিশ্বকাপে ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের যে অর্জন দেখিয়েছে তা ধরে রেখে অধিক সাফল্য লাভের পথ সৃষ্টি করতে হবে। ক্রিকেটারদের মধ্যে পেশাদার মনোভাব সৃষ্টি এবং জেতার ধারাবাহিক অভ্যাস গড়ে তুলতে শারিরীক ও মানসিকভাব প্রস্তুত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বকাপের পর ২০ জুলাই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের শ্রীলঙ্কা সফর রয়েছে। সেখানে তারা তিনটি ওয়ান ডে খেলবে। আমরা আশা করি, এই সিরিজে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপে তাদের যে সক্ষমতা দেখিয়েছে তা ধরে রেখে শ্রীলঙ্কাকে হোয়াইট ওয়াশ করবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এক বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে উত্থান ও অনন্য অর্জন, তা আগামীতে বিশ্বকাপ জয়ে সবচেয়ে বড় প্রেরণার ভিত্তি হয়ে থাকবে। এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে যাবে এবং ক্রিকেটাররা তা ধরে রাখবে, আমরা এই প্রত্যাশা করি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিশ্বকাপ ক্রিকেট

১৬ জুলাই, ২০১৯
১৫ জুলাই, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন