Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার , ২২ জানুয়ারী ২০২০, ০৮ মাঘ ১৪২৬, ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

মিথ্যা মামলা বাড়ছেই

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের যথেচ্ছ প্রয়োগ

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ৭ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের যথেচ্ছ ব্যবহার বাড়াচ্ছে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘মিথ্যা মামলা’র হার। ফৌজদারি কার্যবিধিতে এক সময় মামলা রুজুর আগে যাচাই-বাছাইয়ের বিধান থাকলেও সেটি বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এখন যেকোনো ব্যক্তি যে কারো বিরুদ্ধে ঠুকে দিতে পারছে মামলা। পরে এ মামলা ‘মিথ্যা’ ও ‘উদ্দেশ্যমূলক’ প্রমাণিত হলেও মামলার প্রতিপক্ষ ফেরত পান না তার ভোগান্তি ও ব্যয়িত অর্থ।

অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় মামলার কারণে আটকে থাকে গুরুত্বপূর্ণ বহু মামলার বিচার। এসব মামলার শুনানি গ্রহণে দিনের পর দিন ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে আদালতকে। বিচারপ্রার্থীর দুর্ভোগ বাড়ছে। অর্থ ব্যয় হচ্ছে অপরিমেয়। সংবিধানে ৩১ অনুচ্ছেদ নিয়ন্ত্রণহীন প্রয়োগে ব্যক্তিপর্যায়ে উৎসাহিত হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলক, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের প্রবণতা। ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি এ প্রবণতায় ব্যপকভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও।

একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, দেশের আদালতগুলোতে অন্তত ৩৭ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ২০ লাখের বেশি ফৌজদারি মামলা। এসব মামলার ৯০ ভাগই শেষ পর্যন্ত উদ্দেশ্যমূলক, মিথ্যা, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়।

ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলা রুজুর আগে প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করার একটি বিধান ছিল। সেটি বাতিল করে দেয়ায় যে কেউ যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকতে পারছে, যার অধিকাংশই পরে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ এবং ‘মিথ্যা’ প্রতিপন্ন হয়। মামলা শেষ পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে- ৯০ ভাগ মামলার ক্ষেত্রে এমন সম্ভাবনা সত্তে¡ও দিনের পর দিন ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে আদালতগুলোকে। ফলে প্রকৃত বিচারপ্রার্থীরা শিকার হচ্ছেন দুর্ভোগের। আদালতে বাড়ছে মামলার সংখ্যা।

প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাস্তবতায় সরকার ফৌজদারি, দেওয়ানি এবং পারিবারিক মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (অল্টারনেটিভ ডিসপিউট রি-সলিউশন-এডিআর) পদ্ধতি যুক্ত করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়া আইনগত সহায়তাদানকারী বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদ, মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সালিশের মাধ্যমে মামলা হ্রাসে সহযোগিতা করছে। মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়ের থেকে বিরত থাকতে গণসচেতনতা সৃষ্টিতেও কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। চলমান এ প্রক্রিয়াগুলোর বিপরীতেই দেশে বেড়ে চলেছে উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়েরের প্রবণতা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালে নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ২১৯টি, ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ৭৩০টি, ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ৪৮৬টি, ২০১৪ সালে ১৯ হাজার ৬১৩টি, ২০১৩ সালে ১৮ হাজার ৯১টি, ২০১২ সালে ১৯ হাজার ২৯৫টি এবং ২০১১ সালে ১৯ হাজার ৬৮৩টি। কিন্তু পুলিশি তদন্তে মামলাগুলোর ৯০ শতাংশই ভুয়া প্রমাণিত হয়।

২০১৩ সালে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এক সেমিনারে জানান, নারী নির্যাতন মামলার ৮০ শতাংশই মিথ্যা মামলা। সে সময়কার আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম জানান, যৌতুক নিয়ে যেসব মামলা হয়, তার ৯০ শতাংশই মিথ্যা। তিনি বলেন, বিদেশে ১০০ ভাগ আসামির সাজা হয়। আর আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ খালাস পায়। এর কারণ মিথ্যা মামলা।

সূত্র মতে, উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়েরের প্রবণতায় যুক্ত রয়েছে থানা পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো বেশ ক’টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন কমিশন ওয়ান-ইলেভেনের পর অন্তত আড়াইশ’ মামলা দায়ের করে। যা পরে উচ্চ আদালতে মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে মর্মে বাতিল হয়ে যায়।
সম্প্রতি জাহালমের বিরুদ্ধে দাখিলকৃত ৩৬টি ভুয়া মামলার চার্জশিটই এ অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে। এ ছাড়া এনবিআর দায়েরকৃত বহু মামলা উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যায়। এ সময় প্রচলিত আইনের বিভিন্ন ধারায় দায়েরকৃত মামলার মধ্যে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ বিবেচনায় অন্তত ১০ হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহার করে নেয় সরকার।

তবে এর পরে গত কয়েক বছরে শত শত মামলা দায়ের করে, যা এখন ‘গায়েবি মামলা’ হিসেবে পরিচিত। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৭ লাখেরও বেশি। সূত্র মতে, উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়েরের সংস্কৃতি পুরনো হলেও ব্যক্তিপর্যায়ে এ প্রবণতা বেড়ে চলেছে। জনস্বার্থ, আদালত অবমাননা, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত- ইত্যাদি অভিযোগে দায়ের করা হচ্ছে মামলা।

আদালতে বিদ্যমান মামলাজটের ওপর যা বোঝার উপর খড়ের আঁটি হয়ে জট আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, জনস্বার্থ, আদালত অবমাননা, মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়েরকৃত মামলাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই রুজু করা হয়।

চাঞ্চল্য সৃষ্টি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দৃষ্টিতে আসা, সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে আলোচনায় থাকা এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার লক্ষ্যেই অধিকাংশ মামলা রুজু হয়। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় স্বীয় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সুনজরে আসার জন্য। একই ঘটনায় মামলা হয় একাধিক। যদিও একই ঘটনায় একাধিক মামলা করার আইনগত ভিত্তি নিয়ে একটি রিট হয়েছে, তবুও ভাটা পড়েনি মামলা দায়েরে।

তৃণমূল পর্যায়ের অতি উৎসাহী রাজনৈতিক কর্মীরা লাইমলাইটে আসার সিঁড়ি হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছেন মামলার। অপরাধের শাস্তি বা ঘটনার প্রতিকার নয়- উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই রুজু হয় এসব মামলা।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে। এ কারণে কাউকে মামলা থেকে নিবৃত রাখার অধিকার কারও নেই। এ অধিকারেরই যথেচ্ছ প্রয়োগের মাধ্যমে হরণ করা হচ্ছে অন্যের আইনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকার। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঠুকে দেয়া হচ্ছে মামলা। মামলার চূড়ান্ত রায় যা-ই হোক, মামলা পরিচালন ব্যয়, হয়রানি, কারাভোগে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বহু নিরীহ অভিযুক্তের জীবন। আর এসব মামলা নিয়ে আদালত ব্যস্ত থাকায় অন্যের বিচার প্রাপ্তি হচ্ছে বিলম্বিত।

বিচারক স্বল্পতা, অকারণ বারবার তারিখ প্রদান, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে আইনজীবীদের অনীহার মতো বহুবিধ কারণ মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বাধা। মামলা কার্যতালিকায় ওঠানো, আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি লাভে বিলম্বসহ দুর্ভোগের অন্ত নেই আদালত অঙ্গনে। বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় কাটিয়ে দিতে হয় নিতান্তই মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত মামলার বিচার পেতে। এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নেহায়েত আত্মপ্রচারণার মতো অমৌলিক বিষয়ে মামলা দায়ের করে আদালতের কর্মঘণ্টা বিনষ্ট কতটা মানবিক ও যৌক্তিক- অনুসন্ধানে এ প্রশ্নও উঠে এসেছে।

মামলাজট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট ‘ব্লাস্ট’-এর উপ-পরিচালক (্আইন) অ্যাডভোকেট বরকত আলী বলেন, আমরা মামলা থেকে বিরত রাখতে গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রধান চেষ্টাই হচ্ছে মানুষকে মামলা থেকে বিরত রাখা। এ লক্ষ্যে ব্লাস্ট বহু ঘটনার নিষ্পত্তি করেছে সালিশের মাধ্যমে। তিনি জানান, গত বছর অন্তত ৪ হাজার ঘটনার নিষ্পত্তি করা হয়েছে সালিশের মাধ্যমে। এগুলো মামলায় পরিণত হলে আদালতের ওপর চাপ বাড়ত। সরকার মামলার চাপ কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি চালু করলেও অধিকাংশ আইনজীবী এ পদ্ধতি কার্যকরে আগ্রহী নন। তাদের ধারণা, এডিআর কার্যকর হলে মামলার সংখ্যা হ্রাস পাবে। পেশায় ধস নামবে। এ ধারণা সঠিক নয়।

মামলার চাপ কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি চালু হলেও এ পদ্ধতির সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এতে আইনজীবীদের আন্তরিকতা নেই। তারা ধারণা করছেন, এতে তাদের পেশার ক্ষতি হবে। এ ধারণা ভুল।

তিনি বলেন, মিডিয়ার খোরাক হওয়ার জন্যই উদ্দেশ্যমূলক মামলা দায়ের করা হয়। মিডিয়ার প্রয়োজন চাঞ্চল্যকর সংবাদ। আর এ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে অদ্ভুত বিষয়েও মামলা দায়ের হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকায় ফৌজদারি অপরাধ আমাদের তুলনায় ১০গুণ বেশি। কিন্তু তাদের মিডিয়ায় এসবের ফলাও প্রচার নেই। তাদের প্রচারণারও নীতিমালা রয়েছে।

মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলক মামলা প্রসঙ্গে আইনজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে আগে মামলা রুজুর আগে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের একটি বিধান ছিল। এটি বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এর সুফল ভালো হয়নি।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ ‘ইনকিলাব’কে বলেন, দন্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কেউ যদি তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা আদালতে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে বাদীর বিরুদ্ধেও একই ধারায় পাল্টা মামলা করা যায়। ফৌজদারি কার্যবিধি ২৫০ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন আদালত। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আমলযোগ্য নয়, এ রকম কোনো মামলায় মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করলে তার বিরুদ্ধেও এ ধারা অনুযায়ী ভিকটিমের পক্ষে আদালত ক্ষতিপূরণের রায় দিতে পারেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সংবিধান

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৩ নভেম্বর, ২০১৮
৫ নভেম্বর, ২০১৭

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ