Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

জবিতে কার্যকর হয় না বহিষ্কারাদেশ

দেড় বছরে বহিষ্কার ২৮ শিক্ষার্থী, সবাই ছাত্রলীগের

নাইমুর রহমান নাবিল | প্রকাশের সময় : ৯ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৭ এএম

অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববদ্যালয়ে (জবি) গত দেড় বছরে (২০১৭ অক্টোবর থেকে ২০১৯ মে পর্যন্ত) ২৮ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের সবাই সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। নিয়মানুযায়ী বহিষ্কৃত থাকাকালীন কেউ একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিতে না পারলেও বহিষ্কৃতদের অনেকেই ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন এবং ফলও পেয়েছেন। বহিষ্কারাদেশ তুলেও নিয়েছেন কেউ কেউ। অভিযোগ রয়েছে বহিষ্কারাদেশ সম্বলিত চিঠি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে না পৌঁছানোয় আদেশগুলো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ কে এম আক্তারুজ্জামান বলেন, বহিষ্কার হলে পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ নেই। শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনেক সময় বহিষ্কৃতদের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ দেয়া হয়। তবে সবার ক্ষেত্রে এমন হয়না তারপরেও যদি এমন কেউ থেকে থাকে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।

প্রক্টরিয়াল আইন অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত থাকাকালে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। সাময়িক বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার পরপরই তা ধামাচাপা দিতে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ বলেন, অপরাধের মাত্রা দেখে শৃংখলা কমিটি, ডিন, প্রক্টরিয়াল বডি মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মানবিক দিক চিন্তা করে অনেক সময় ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ দেয় হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে জানা যায়, ভর্তি জালিয়াতি, যৌন হয়রানি, সাংবাদিক নির্যাতন, সংঘর্ষসহ বিভিন্ন অভিযোগে গত ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের ২৮ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন জনকে স্থায়ীভাবে এবং ২৫ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বহিষ্কৃত ৫ জন । ২৪ অক্টোবর এক শিক্ষার্থীকে ক্ষুর দিয়ে আঘাত করার অপরাধে ৩০ অক্টোবর উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম শান্তকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই বছরে ২৮ অক্টোবর এক ব্যবসায়ীর নিকট চাদাঁ চাওয়া, তাকে মারধর করা সহ পাঁচ শিক্ষার্থীকে আহত করার অভিযোগে ১২ই নভেম্বর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের হোসনে মোবারক, ফিন্যান্স বিভাগের সুজন দাস অর্ক, এস কে মিরাজ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের রাজীব বিশ্বাসকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

২০১৮ সালে বহিষ্কার হয়েছে ১৫ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিককে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার অপরাধে ৭ জানুয়ারী মার্কেটিং বিভাগের তানভীর চৌধুরী শাকিল কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করা, বিশ্ববিদ্যালয় বাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মারধর, শিক্ষকদের সাথে খারাপ আচরন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি মারামারির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে ফার্মেসি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের মোঃ আল ইকরাম অর্ণবকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০৫-এর ১১(১০) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হয়। ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে ২২ মার্চ সমাজকর্ম বিভাগের আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

১২ এপ্রিল এক শিক্ষাথীকে মারপিট করার অভিযোগে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মোঃ সিয়াম আহমেদকে সাময়িক এবং ১৭ই এপ্রিল এক সেকশন অফিসারকে মারধর করার অভিযোগে একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের রাজীব বিশ্বাসকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

১০ জুলাই শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গণিত বিভাগের মোঃ হাবুল হোসেন ও ইতিহাস বিভাগের নূরে আলম সিদ্দিকিকে সাময়িক এবং ১৭ জুলাই ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় ফার্মেসী বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের আকিব বিন বারীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর দূর্জয় বাসের ৬ শিক্ষার্থীকে মারধর করার অভিযোগে সিএসই বিভাগের মাসফিক খান আদর, দর্শন বিভাগের মেহেদী হাসান, ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শান্ত কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী এক ছাত্রীকে অশালীন ও হয়রানিমূলক কথাবার্তা বলার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের মোবারক ঠাকুর প্রিন্স এবং জয়নুল আবেদীনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের গেটে ঘোড়ার গাড়ীর চালক রাব্বি মিয়ার উপর হামলার অভিযোগে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আল সাদিক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের তৌহিদুল ইসলাম শান্ত ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের আশিকুর রহমান আশিককে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন।

২০১৯ সালে এ পর্যন্ত ৮ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গণিত বিভাগের মো. শাহরিয়ার রহমান শান্ত, তৌহিদুল ইসলাম তুহিন, মেহেদী এবং সিএসই বিভাগের আশরাফুল আল রিফাত সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয়। শিক্ষার্থী মারপিটের ঘটনায় ৩১মার্চ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের হাসানুজ্জামানকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া ছিনতাইয়ের অভিযোগে গত ১৮ এপ্রিল পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিম আহমেদ খান, ভ‚গোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ মারুফ আহমেদকে সাময়িকভাবে বহিস্কার করা হয়। পরে একই অভিযোগে ভ‚গোল ও পরিবেশ বিভাগের মিরাজুল ইসলাম কে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

উল্লেখ্য, সাময়িক বহিষ্কৃত প্রায় সকলেই নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা এবং ফলও পেয়েছে। স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত ৩ জনের মধ্যে রাজীব বিশ্বাস বহিষ্কারাদেশ তুলে নিয়েছেন। স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত আরেক শিক্ষার্থী আকিব বিন বারী বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়ার জন্য নিয়মিত প্রশাসনিক ভবনে যাতায়াত করছেন। এছাড়া অপর শিক্ষার্থী আল ইকরাম অর্ণবকে নিয়মিত ক্যাম্পাসে দেখা যায়।

এ ব্যাপারে জবি ভিসি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, যারা নকল করে পরীক্ষা দেয় তাদের ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করার সুযোগ নেই। আর যারা মারামারি, ইভটিজিং এসব কারণে বহিষ্কার হয় দেখা যায় তারা নিজেরাই পরে আপোষ করে ফেলে। তবে তারা শৃংখলা কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে পারবে কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হবে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: জবি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ