Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৭ কার্তিক ১৪২৬, ২৩ সফর ১৪৪১ হিজরী

জিম্মি মোবাইল ফোন গ্রাহক

বিটিআরসি-অপারেটর দ্ব›দ্ব

ফারুক হোসাইন | প্রকাশের সময় : ৯ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৫ এএম

নিরীক্ষা দাবির পাওনা আদায়ে গ্রামীণফোনের ৩০ শতাংশ ও রবির ১৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যানউইথ কমিয়ে দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। বিষয়টিকে অমীমাংসিত দাবি করে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে অপারেটর দুটি, অন্যদিকে টাকা না দিলে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে বিটিআরসি। উভয় পক্ষের দ্ব›েদ্ব এবং অনড় অবস্থানে কাক্সিক্ষত সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকরা। আর দুঃখ প্রকাশ করেই দায় সারছে বিটিআরসি-অপারেটর।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের নির্ধারিত মূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনেছেন রবির গ্রাহক মঞ্জুর আলম। যেখানে তিনি অপারেটর নির্ধারিত ব্যান্ডউইথের মূল্য, সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্স, সারচার্জসহ যাবতীয় অর্থ পরিশোধ করেছেন। কিন্তু নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করার পর যে সেবা পাওয়ার কথা তা না পেয়ে ক্ষুব্ধ তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, সব অর্থ পরিশোধ করার পরও রেগুলেটর-অপারেটর দ্ব›েদ্ব গ্রাহক জিম্মি কেন? তাদের ভুলে বা অবহেলা আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো কেন? কে দেবে এর ক্ষতিপূরণ? গ্রামীণফোনের গ্রাহক রশিদুল ইসলাম লিখেছেন, গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা বিটিআরসির কাজ। কিন্তু তারাই কিনা গ্রাহকদের ভোগান্তিতে ফেলেছে নিজেদের অবহেলা আড়াল করতে। গ্রাহক হিসেবে টাকা দিয়ে ডাটা কিনেও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না কেন? প্রশ্ন রেখেছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও অপারেটরদের কাছে।

টেলিযোগাযোগ সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। ফোরজি’র কথা বলে টুজি ইন্টারনেট সেবা, কথা বলতে গেলেই কলড্রপ, মিউট (সংযোগ সচল থাকে কথা শোনা যায় না) কলের বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন প্রায় সব মোবাইল ফোন গ্রাহকই। টাকা ব্যয় করে নি¤œমানের সেবা পাওয়ায় জাতীয় সংসদেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি গ্রাহকদের। আগের মতোই ধীরগতির ইন্টারনেট, পাঁচ মিনিট কথা কললেও কলড্রপ ও মিউট কলের শিকার হওয়ার অভিযোগ করছেন তারা। মাঝে মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।

এর সাথে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি) ও দুই মোবাইল ফোন অপারেটরের (গ্রামীণফোন ও রবি) দ্ব›দ্ব। তাদের এই দ্ব›েদ্ব জিম্মি হয়ে পড়েছে গ্রাহকরা। সম্প্রতি নিরীক্ষা আপত্তির পাওনা টাকা আদায়ের জন্য গ্রামীণফোন ও রবির ব্যান্ডউইথ কমিয়ে দিয়েছে বিটিআরসি। বিটিআরসির দাবি, গ্রামীণ ফোনের কাছে নিরীক্ষা আপত্তির দাবির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা এবং আরেক মোবাইল ফোন অপারেটর রবির কাছে ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে তাদের। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও ওই টাকা পরিশোধ না করার গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ব্যান্ডইউথ ক্যাপাসিটি ৩০ শতাংশ এবং রবির ১৫ শতাংশ সীমিত করতে ইন্টারনেট গেইটেওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই আইআইজি অপারেটরগুলো তা কার্যকরও করেছে। আর এতেই ভোগান্তিতে পড়েছে এই দুই অপারেটরের গ্রাহকরা। আগে থেকে ফোরজি’র নামে টুজি ইন্টারনেট পাওয়া গ্রাহকরা এখন পাচ্ছেন আরও ধীরগতির ইন্টারনেট সেবা।

যদিও নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিটিআরসির দাবি করা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে অপারেটর দুটি। বিটিআরসিকে এ নির্দেশনা তুলে নেওয়ার অনুরোধ এবং সালিস আইন, ২০০১-এর অধীনে অমীমাংসিত অডিট দাবির নিষ্পত্তিতে সহযোগিতার অনুরোধ করেছে গ্রামীণফোন ও রবি। তবে আইন অনুযায়ী এ ধরনের বিষয়ে সালিশ বা আরবিট্রেশনের সুযোগ নেই জানিয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মোঃ জহুরুল হক বলেন, বিটিআরসির আইন অনুযায়ী আরবিট্রেশনের কোনো উপায় নেই, তবে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। পাওনা টাকা অপারেটরদের দিতেই হবে।

এদিকে বিটিআরসি’র সাথে গ্রামীণফোন ও রবি’র পাওনা সম্পর্কিত বিষয় নিষ্পত্তি ও গ্রাহক ভোগান্তি নিরসনে সংসদে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ব্যান্ডউইথ কমানোর ফলে অপারেটররা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে উল্টো গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে অপারেটররা এতে করে লাভবান হচ্ছে। কারণ আইআইজি অপারেটরদের বিল কম দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা গ্রাহকদের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করার কথা। অথচ গ্রাহকদের প্রদেয় অর্থই আদায় করার জন্যই যে ব্যবস্থা তা রক্ষক হয়ে ভক্ষক হওয়ার মত।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিনের অমীমাংসীত দাবী ও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় বর্তমানে গৃহীত ব্যবস্থায় আদায় করা সম্ভব না। যে কোন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই অতি উত্তম। তার জন্য প্রয়োজনে ৩য় পক্ষের সহযোগিতা (আরবিট্রেশন) গ্রহণ করা যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে এতো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বকেয়া রাখার জন্য বিটিআরসি এবং পাওনা পরিশোধ না করায় অপারেটর দুটির সমালোচনা করছেন গ্রাহক ও খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন এতোদিন ধরে এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব কিভাবে বকেয়া রেখেছে অপারেটরগুলো। আর কিভাবে নিরীক্ষা করা হয়েছে যে, তারা অর্থ পরিশোধ না করে আপত্তি তোলার সুযোগ পায়?

বিটিআরসির নির্দেশনার ফলে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কের অধীনে থাকা গ্রাহকদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জানিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল ফোলি বিটিআরসিকে তা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, অমীমাংসিত পাওনার বিষয়ে আমরা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করতে চাই।

ব্যান্ডইউথ সীমিত করার জন্য গ্রামীণফোনের কি ধরণের আর্থিক ক্ষতি হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারপ্রাপ্ত সিএমও মোহাম্মদ সাজ্জাদ হাসিব বলেন, বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে, তবে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি।
রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, একটি বিতর্কিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখিত দাবিনামা সমাধানের জন্য সব দিক বিবেচনায় সালিশ বা আর্বিট্রেশনই সর্বোত্তম উপায়। এর জন্য আর্বিট্রেশন বা সালিশ নিষ্পত্তি আইন আছে। আর টেলিযোগাযোগ আইনে সালিশ নিষ্পত্তি করা যাবে না, এমন কোন বিধি-নিষেধ নেই। আমরা আশা করি, সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বিটিআরসি সালিশ নিষ্পত্তির বিষয়ে আগ্রহী হবে। আর ব্যান্ডউইথ কমানোর মতো ব্যবস্থা, সাধারণ মোবাইল গ্রাহকদের জন্য কোনভাবেই সুখকর নয়। প্রশ্নবিদ্ধ নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মোবাইল গ্রাহকদের জন্য এই ধরণের ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত দিয়ে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোঃ জাকির হোসেন খাঁন বলেন, বর্তমান টেলিযোগাযোগ আইনে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির কোনো সুযোগ নেই। সেবা ব্যবহারকারী গ্রাহকদের অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কমিশন আশা করছে, শীঘ্রই এ পাওনা পরিশোধ করে অপারেটর দুটি স্বাভাবিক গতিতে গ্রাহকদের সেবা প্রদানে সচেষ্ট হবে।

টাকা না পেলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেন, বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত, পরবর্তীতে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব কি করা যায়। আইন অনুযায়ী এ ধরনের ক্ষেত্রে অপারেটরের লাইসেন্স বাতিলসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।#



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিটিআরসি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ