Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী

মহাসড়কে অযান্ত্রিক যানের লেন প্রসঙ্গে

| প্রকাশের সময় : ১১ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৭ এএম

মূলত ঢাকা শহরের যানজট, গণপরিবহন সংকট ও জনভোগান্তি লাঘবে রিকশাসহ অযান্ত্রিক যানবাহন বন্ধের দাবী তোলা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। সে দাবী বাস্তবায়ন কখনো সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে ঢাকার যানজট নিরসনে বেশ কিছু ফ্লাইওভার নির্মানসহ হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও তেমন কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি ঢাকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পর্যায়ক্রমে শহরের রাস্তাগুলো থেকে রিকশাসহ অযান্ত্রিক ও ধীরগতির যান তুলে দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় রিকশাচালক-মালিকদের পক্ষ থেকে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় ১০ লক্ষাধিক অবৈধ রিকশা চলছে। এসব রিকশার সাথে জড়িত আছে অন্তত ১০ লাখ পরিবারের কর্মসংস্থানের স্বার্থ। রিকশা বন্ধ করে দিলে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি সরকারের জন্য মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দেশে রিকশাচালকদের কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। আমাদের গ্রামীন সমাজ ও অর্থনীতি এখনো মূলত কৃষিভিত্তিক। একদিকে গ্রামে গঞ্জে লাখ লাখ কর্মক্ষম মানুষ বেকার-কর্মহীন থাকলেও প্রতিবছরই ধানপাট কাটার মওসুমে কৃষিশ্রমিকের সংকট প্রকট হয়ে উঠতে দেখা যায়। শ্রমিকের মূল্য পরিশোধ করে ধানচাষিরা উৎপাদন খরচ উঠাতে পারে না। গ্রামীন অর্থনীতির সেই লাইফলাইন ও খাদ্য নিরাপত্তায় নিয়োজিত সে সব কৃষি শ্রমিকরা কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়ে শহরে এসে রিকশা শ্রমিকে রূপান্তরিত হওয়ার কারণে শহরে ও গ্রামে বহুমাত্রিক সংকট দেখা দিয়েছে।

অর্থবছরের প্রথম একনেক সভায় দেশের মহাসড়কগুলোতে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে সব রাস্তায়ই রিকশা-ভ্যান ও ঠেলাগাড়ির মত অযান্ত্রিক যানের জন্য বিকল্প লেন গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা বলেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে রাতারাতি রিকশা বন্ধ করে দেয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও তা যথাসাধ্য নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতকরণ জরুরী। এ ক্ষেত্রে রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরের ব্যস্ততম এলাকায় গণপরিবহন লেনের বাইরে রিকশাসহ অযান্ত্রিক ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন করার উদ্যোগ হতে পারে। তবে ঢাকা শহরের বর্তমান বাস্তবতায় অধিকাংশ রাস্তায় রিকশার জন্য আলাদা লেন করা প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে রিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকায় বিদ্যমান বাস্তবতায় নগরবাসির জন্য রিকশার মত যানবাহনের বিকল্প ব্যবস্থাও এখন নেই। সিএনজি অটো রিকশা, টেক্সিক্যাব, রাইড শেয়ারিংয়ের মত প্রাইভেট পরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি করে সহজলভ্য এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জরুরী। সেই সাথে অবৈধ রিকশা বন্ধ এবং বৈধ রিকশা চালকদের ট্রাফিক বিধি মেনে চলা এবং রিকশা-ভ্যানের দৈনিক জমা ও ভাড়া নির্ধারণের মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলে শহরে রিকশার দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনা অসম্ভব নয়। সড়কের উপর অতিরিক্ত চাপ, নির্ভরশীলতা, যানজট ও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে নিরাপদ ্িকল্প হিসেবে সারাদেশে নৌ ও রেলপথের উপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

একবিংশ শতকে এসে আমরা যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি, ঠিক তখন আমাদের রাজধানী শহরে যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘন্টায় ৭ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের আর কোনো উন্নয়নশীল দেশের রাজধানী শহরে বা মহাসড়ক এমন অযান্ত্রিক যানবাহনের দখলে থাকার কোনো নজির নেই। পরিবেশগত সচেতনতার কারণে কোনো কোনো দেশে বাইসাইকেলসহ অযান্ত্রিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানীর পরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। তবে দ্রুতগতির আধুনিক যানবাহনের সাথে অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের নজির কোথাও নেই। দশকের পর দশক ধরে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে যানজট ও জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ রিকশার আধিক্য। রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগগুলো সফল না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অনুপস্থিতিকেই মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়। লাখ লাখ রিকশাচালকের কর্মসংস্থানের স্বার্থের কথা বলে তাদেরকে রাজনৈতিক আন্দোলন ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কারণেই রিকশা বন্ধ করা যায়নি। এখন ঢাকার কিছু কিছু রাস্তায় রিকশা বন্ধ হওয়ার কারণে এসব রাস্তায় যানজটের চিত্র কিছুটা হলেও বদলে যেতে দেখা যাচ্ছে। অবৈধ রিকশা বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যে সব রাস্তায় রিকশা ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা সম্ভব শুধুমাত্র সে সব রাস্তাকে বৈধ রিকশার জন্য উন্মুক্ত রাখা যেতে পারে। সে ব্যবস্থা না করে সড়ক মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন করার নির্দেশ এই মুহূর্তে বাস্তবসম্মত কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। কৃষিখাত ছাড়াও রিকশা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। মহাসড়কে রিকশার মত যানবাহনের আলাদা লেন করার সরকারী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবী রাখে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: যানজট

২ অক্টোবর, ২০১৯
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৯ আগস্ট, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন