Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

পিডিবিএফে লুটপাটের রাজত্ব

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৫ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

গ্রামের গরিব মানুষকে ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার প্রত্যয়ে গঠন করা হয় পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ)। ঋণদানকারী এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির কাজ গরিবদের স্বাবলম্বী করা হলেও চলছে এর উল্টো কার্যক্রম। নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের হতদরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন না ঘটলেও কপাল ফিরছে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের। যে উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই উদ্দেশ্যও ভেস্তে যেতে বসেছে। দিন দিন কমছে ঋণদান। বিপরীতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। স¤প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের তদন্তে এ প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। আর এ প্রতিবেদনে এ সব অনিয়মের হোতা হিসেবে পিডিবিএফ’র ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মদন মোহন সাহাকে উল্লেখ করা হয়েছে। এমডি’র বহুমুখী অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় সহযোগীতা করেছেন অতিরিক্ত পরিচালক (আইটি) ও প্রকল্প পরিচালক (সৌরশক্তি প্রকল্প) সহিদ হোসেন সেলিম এবং যুগ্ম পরিচালক (মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) শিপ্রা চক্রবর্তি।

আর এসব বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আর্থিক লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। গত ১৯ জুন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের উপসচিব কাজী মোশতাক জহির এ ব্যাপারে দুদককে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে মদন মোহন সাহা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ২৯ টি অভিযোগ প্রমানিত হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের তদন্তে পাওয়া অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর করে কমিশন আদায়, শীর্ষ কর্মকর্তার অতিরিক্ত বেতন-ভাতা নেওয়া, টিআর-কাবিটা প্রকল্পের কাজে কমিশন আদায়, ভুয়া কোম্পানিকে কাজ দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার নামে সদস্যদের অর্থ আত্মসাৎ, কর্মীদের জীবন বীমা করিয়ে দিয়ে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে কমিশন নেওয়া, বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধভাবে পদোন্নতি-বদলি ও ঘুষ বাণিজ্য, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও অযোগ্যতাসহ নানা অনিয়ম উঠে এসেছে।

সুত্র মতে, দেশের দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে ২০০০ সালে পিডিবিএফ গঠন করা হয়। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হতে শুরু করে। গত ৯ ডিসেম্বর পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নাসরিন আক্তার চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দু’জন ছিলেন যুগ্মসচিব খালিদ পারভেজ খান ও উপসচিব মো. আজম-ই সাদাত। গত ৪ এপ্রিল তদন্ত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে উঠে আসে পিডিবিএফে সংঘটিত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র।

অতিরিক্ত বেতন নেওয়া : জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুসারে কোনো কর্মকর্তার ১৭ বছর চাকরিজীবন পূর্ণ হলে তিনি দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন স্কেল পেতে পারেন। কিন্তু পিডিবিএফের ভারপ্রাপ্ত এমডি মদন মোহন তার চকরিজীবন ১৪ বছর হওয়ার পরই বিধিবহির্ভূত দ্বিতীয় গ্রেডে ৬৬ হাজার টাকা বেতন স্কেলে বেতন নিতে থাকেন। পরে একইভাবে তার বেতন প্রথম গ্রেডে উন্নীত করা হয়।

বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জনবল নিয়োগ : পত্রিকা বা অভ্যন্তরীণ কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ২০১৭ সালে ৯২ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি নিয়োগে ২ থেকে ১০ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়েছে।

বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রেখে কমিশন : পিডিবিএফের ৬৩তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরকারি ব্যাংকে এফডিআর করা হবে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানের ১০০ কোটি টাকা চারটি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বেসরকারি ব্যাংকে টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব ব্যাংক থেকে কমিশন বাবদ আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।

অবৈধভাবে পরিচালককে পদোন্নতি : ২০১৪ সালে সংস্থার অর্থ আত্মসাতের দায়ে পিডিবিএফের পরিচালক সহিদ হোসেন সেলিমের পদোন্নতি আদেশ স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। কিন্তু ২০১৭ সালে মদন মোহন সাহা বিধিবহির্ভূতভাবে এ আদেশ প্রত্যাহার করে নেন এবং তাকে বকেয়া পদোন্নতি দিয়ে পরিচালক পদে আসীন করা হয়। তদন্ত কমিটির মত, সাজা কমানোর এখতিয়ার পিডিবিএফ কর্তৃপক্ষের নেই।
পুরনো মালে নতুনের দাম : সরকারের টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের সৌরশক্তি প্রকল্পের জন্য সাত কোটি ৭৪ লাখ টাকায় বিভিন্ন ধরনের সৌরসামগ্রী কেনা হয়। মিরপুরের ২ নম্বর সেকশনের ৩ নম্বর এভিনিউয়ের ১২ নম্বর প্লটের ‘সলিটন ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী’কে এসব সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি নতুনের পরিবর্তে পুরনো মালপত্র সরবরাহ করে। এ জন্য ভারপ্রাপ্ত এমডি মদন মোহন সাহা ও প্রকল্প পরিচালক সহিদ হোসেন সেলিম প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ২০ লাখ ৪১ হাজার ১৬২ টাকা ঘুষ নেন। মোট ছয়টি চেকের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। এসব টাকা বেসিক ব্যাংকের মিরপুর শাখায় পিডিবিএফের হিসাব সহকারী সাইফুল ইসলামের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। সহিদ হোসেন সেলিম ও তার ভাগিনার ইস্টার্ন ব্যাংক মিরপুর শাখার একটি অ্যাকাউন্টেও ক্যাশ হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সাইফুল ইসলামকে নাটোরে বদলি করা হয় ও সহিদ হোসেন সেলিমকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান করতে গিয়ে সলিটনের ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির কোনো অফিস খুঁজে পায়নি। দেখা যায় প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স হালনাগাদ নেই। টিন সার্টিফিকেটও ভুয়া।

মামলার খরচের নামে আত্মসাৎ : মামলার খরচের নামে পিডিবিএফের অ্যাকাউন্ট থেকে ৫০ লাখ টাকা তোলা হয়েছে। ওই টাকা কোথায় খরচ হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ পিডিবিএফে পাওয়া যায়নি। নোটশিটেও খরচের বিস্তারিত উল্লেখ নেই। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারপ্রাপ্ত এমডি ওই টাকা নিজে নিয়েছেন।
অর্থ আত্মসাতের পুরস্কার : পিডিবিএফ সিবিএ সভাপতি তাপস চন্দ্র রায়ের স্ত্রী কিশোরগঞ্জের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের সময় গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সংস্থার ৩১ লাখ ৩৬ হাজার ২১ টাকা আত্মসাৎ করেন। ধরা পড়লে তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরে ছবি রানী টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু পরে তার কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত না নিয়েই তাকে প্রধান কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়। বরিশাল অঞ্চলের সহকারী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তা ঝর্ণা রাণী মন্ডল ১৬ লাখ ৪ হাজার ৬৫২ টাকা আত্মসাৎ করায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু পরে তার কাছ থেকে টাকা ফেরত না নিয়েই চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়। এ ছাড়া খুলনার কালিয়ার মাঠ কর্মকর্তা নিতীশ কুমার সরদার ও জিতেন্দ্র নাথ রায়সহ কয়েকজন অর্থ আত্মাসাৎ করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উৎকোচ নিয়ে চাকরিতে বহাল : পিডিবিএফ কর্মচারী প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারী কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে টানা ৩০ দিন অনুপস্থিত থাকলে তার চাকরি বিলোপ হবে। কিন্তু কর্মচারী হাবিবুর রহমান টানা ১০০ দিন অনুপস্থিত থাকার পরও তাকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়। তদন্ত কমিটির মতে, যারা তাকে চাকরিতে বহাল রেখেছেন, তারা সুবিধাভোগী হয়েছেন।

নিয়ম লঙ্ঘন করে পদোন্নতি : ২০১৭ সালে ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা ছাড়াই ও কমিটির সদস্যদের না জানিয়ে ১২তম গ্রেডের ২০ কর্মীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। যা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে শীর্ষ কর্মকর্তার অদক্ষতায় খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অনৈতিকভাবে সৌরশক্তি প্রকল্পের একশ’ কর্মীকে চুক্তিভিত্তিক ঋণ আদায়কারী ও সহকারী ঋণ আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ, উচ্চপদের কর্মকর্তার দুর্নীতির তদন্তে নিম্নপদের কর্মকর্তাকে নিয়োগ, একজন সিনিয়র কর্মকর্তা আনোয়ারুজ্জামানকে দু’বছর বিভাগীয় মামলায় ঝুলিয়ে চাকরিজীবনের শেষ দিনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত, নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে সুমন সরকারকে চালক পদে নিয়োগ, ড্রাইভার কুদ্দুস মোল্লার ভাগিনা মো. আশরাফের কাগুজে কোম্পানি এক্সিলন বাংলাদেশ লিমিটেডকে কাজ ছাড়াই ৪৬ লাখ ৩৭ হাজার ৯৪০ টাকা অগ্রিম দেওয়াসহ নানা অনিয়ম উঠে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আফজাল হোসেন বলেন, নানা অনিয়ম প্রমানিত হলেও বোর্ড মিটিং না হওয়ায় মদন মোহান সাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমডি এই বোর্ডের সদস্য সচিব। তাই তিনি সভা না ডাকলে কিছু করার সুযোগ নেই। তারপরও বার বার বলা স্বত্তেও সভা না ডাকায় মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে এমডি মামলা করে বোর্ডের কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছেন। তাই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় নি। একই সঙ্গে আর্থিক অনিয়মের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য প্রশাসনিক অনিয়মের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।
পিডিবিএফ’র ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মদন মোহন সাহার সাথে সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল এবং এসএমএস করলেও তিনি সাড়া দেননি।

 



 

Show all comments
  • Sudhir Roy ১৫ জুলাই, ২০১৯, ৯:৪০ এএম says : 0
    আমিও পি ডি বি এফ এর একজন সামান্য কর্মচারী ছিলাম। আমাকেও পিডিবিএফ ঘুষখোর ম্যানেজমেন্ট লঘু পাপে গুরু দন্ড দিয়েছিল। আমার পাওনা বাবদ সি পি এফ এর জমাকৃত ৩,৯০,০০০/ টাকার মধ্যে ১,৭০,০০০/ টাকা দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে চাকুরীচুত্য করা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ঘটনা এটা।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ