Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৬ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

নওগাঁয় সচ্ছভাবে পুলিশে লোক নিয়োগ চাকুরী পেলেন রবিদাস, ভিক্ষুক, শ্রমিক ও রিক্সা চালকের ছেলেমেয়েরা

নওগাঁ জেলা সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৫ জুলাই, ২০১৯, ৫:৩৬ পিএম

 

মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নওগাঁয় এবার স্বচ্ছভাবে পুলিশে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ কনেস্টবল পদে মোট চাকুরী পেয়েছেন ১২০ জন। কনেস্টবল পদে চাকুরী প্রাপ্তদের মধ্যে অধিকাংশই সাধারন কৃষক, দিনমজুর, রবিদাস, মুক্তিযোদ্ধার হতদরিদ্র নাতী, রিক্সা চালকের মেয়ে, ভিক্ষুকের ছেলেও পেয়েছেন চাকুরী।

নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্য ও নওগাঁ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন জানান, পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন পিপিএম ইতি পূর্বেই বলে ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘সোনা বাংলা’ ও প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘দুর্নীতি মুক্ত দেশ আধুনিক দেশ’ গড়তে আগামীতে পুলিশে কনেস্টবল পদে যারা চাকুরী প্রত্যাশী তারা কেই যেন কোন দালাল চক্রর ফাঁদে পড়ে চাকুরীর জন্য দালাল চক্রসহ কাউকে যেন টাকা না দেন। শুধুমাত্র মেধা ও যোগ্যতা সম্পূর্ন হলেই বিনা টাকায় পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকুরী পাবেন চাকুরী প্রত্যাশীরা।
নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা জানান, নওগাঁর পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন পিপিএম তার কথাই রাখলেন। দালাল চক্র মুক্ত ও তদবির বিহীন মেধা ও যোগ্যতা সম্পূর্ন চাকুরী প্রত্যাশী ৩ জুলাই ১২০ জন নারী-পুরুষকে পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকুরী দিলেন।
পার-নওগাঁ পারঘাটি মহল্লার হরজিন পল্লীর রবিদাস সম্প্রদায়ের শিল্পী রাণী রবিদাস। শিল্পীর বাবা ব্রিজের মোড়ে জুতা সেলাই করতেন। গত বছর বুকের ভালব নষ্ট হয়ে মারা গেছেন। তার মা ও বৃদ্ধা দাদিকে নিয়ে তাদের সংসার। এক সময় বিভিন্ন লোকজনদের বাড়িতে গৃহস্থলী কাজ করতেন। পরিবারের এক মাত্র অর্থ উপার্জনকারি বাবা মারা যাওয়ার পর শিল্পীর মা শত অভাব-অনটনের মধ্যে মেয়েকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করিয়েছেন। বর্তমানে শিল্পী নওগাঁ কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছেন।
শিল্পী রাণী রবিদাস জানান, তার বাবা মারা যাওয়ার পর অভাব-অনটনে অনেক কষ্টে দিনপথ চলছিল। এমতাবস্তায় নওগাঁয় পুলিশ কনেস্টবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন। এরপর নওগাঁ পুলিশ লাইর্ন্সে দাঁড়ান তিনি। বর্তমান সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা ও পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেনের স্বচ্ছতার কারণে মেধার ভিত্তিতে তিনি পুলিশ কনেস্টবলে চাকুরি পান।
তিনি আরো জানান, আমরা গরীব মানুষ। বেশি ভাগ দিন ঠিক খারাব মেটানো সম্ভব হতো না। সমাজে শতশত বৃত্তবান মানুষ রয়েছে। তাদের সন্তানদের চাকুরি নিতে লাখ লাখ টাকা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু নওগাঁয় পুলিশ কনেস্টবলে চাকুরি পেতে কোন টাকা পয়সা লাগেনি। তাই আমি চাকুরি পেতেম না। আগামিতে তিনিও স্বচ্ছতা ও সততার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবো।
শিল্পীর পুলিশে চাকুরি হওয়ার সংবাদে হরজিন পল্লী রবিদাস সম্প্রদায়ের পাড়াতে চলছে আনন্দের বন্যা বইছে। পাশাপাশি মিষ্টি বিতরণও করা হয়।
শুধু শিল্পী নয় ! এই ভাবে নওগাঁয় পুলিশ কনেস্টবল পদে টাকা ছাড়াই নিয়োগ হয়েছে মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মৃত তারা মোল্লার ছেলে লাল চাঁন আলীর। সহায় সম্পদ বলতে কিছুই নেই তার। লাল চাঁন আলী নওগাঁর মহাদেবপুরের নওহাটামোড় (চৌমাশিয়া) বাজার বাস ষ্টান্ডে দাঁড়ানো বাসের যাত্রীদের কাছে ভিক্ষার টাকায় সংসার চালানোর পাশাপাশি তার ছেলে ফিরোজ হোসেনকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ভিক্ষুক লাল চাঁন আলীর ছেলে ফিরোজ হোসেন এবার পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকুরী পেয়েছেন।
লাল চাঁন আলী বলেন, আমি একজন সহায় সম্বলহীন মানুষ। আমি বাসের যাত্রীদের কাছে হাত পাতিয়ে ভিক্ষা করে সংসার চালিয়েছি এবং ছেলেকে লেখাপড়া শিখায়েছি জানিয়ে কাঁদতে শুরু করেন আর কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, মহান আল্লাহ নওগাঁতে ভালো পুলিশ সুপারকে পাঠিয়েছেন বলেই আমার ছেলেটির চাকুরী হলো।
মহাদেবপুর উপজেলার চকরাজা গ্রামের হতদরিদ্র সহিদুল ইসলাম জানান, আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা ও পুলিশের হাবিলদার ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর আমার বাকরুদ্ধ মাসহ স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছি এবং মৃত মুক্তিযোদ্ধা পিতার নামে পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা দিয়ে সংসার চালানো ও ছেলেকে লেখাপড়া চালাতে আমি যাত্রীবাহী বাসের শ্রমিক (হেলপার) এর কাজ করি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আমার ছেলে বাপ্পী হোসেন মেধাবী ও যোগ্যতা সম্পূর্ন হওয়ার পরও চাকুরীতে ঢুকানোর জন্য ইতিপূর্বে কয়েকটি দপ্তরে আবেদন করে এমনকি সম্পূর্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়ার পর ও শুধুমাত্র টাকা-পয়সা না থাকার কারণে ছেলেটির চাকুরী এতদিন হয়নি। কোন প্রকার ঘুষ ছাড়াই এবার আমার মেধাবী ছেলে বাপ্পী হোসেন (মুক্তিযোদ্ধার নাতী) মেধা তালিকায় ২য় স্থান অধিকারী বাপ্পী হোসেনকে চাকুরী দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, আমি সেই শুরু থেকেই পুলিশ লাইন এ রয়েছি এ জন্য অনেক লোকজনের সাথে কথা বলে ও জেনেছি, শুধু আমার ছেলে না এবারে আমাদের এসপি স্যার খুবই ভালো মানুষ বলেই আমার ছেলে সহ দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ও যোগ্য ছেলে ও মেয়েদের চাকুরী দিয়েছেন।
আরো কয়েক জন অভিভাবক ও একইভাবে বলেছেন, যে এইবার কোন প্রকার টাকা বা দালাল ছাড়াই জেলা পুলিশ সুপার সচ্ছভাবে ১২০ জনকেই শুধুমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়েছেন।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নওগাঁ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রোটানিয়ন চন্দন কুমার দেব জানান, নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের অনেকের সাথে তার কথোকথন হয়েছে। তারা সবাই জানিয়েছেন, এ বছর মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকুরি হয়েছে। এ জন্যে সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। তিনি আরো জানান, আগামাতিও একই ভাবে সকল চাকুরিতে সকল পদে মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
নওগাঁর পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন পিপিএম জানান, শুধুমাত্র যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ১২০ জন ছেলে-মেয়ের পুলিশ কনেস্টবল পদে চাকুরী হয়েছে। নিয়োগ প্রাপ্তদের মধ্যে অধিকাংশই সাধারন কৃষক, দিনমজুর, রবিদাস, মুক্তিযোদ্ধার হতদরিদ্র নাতী, রিক্সা চালকের মেয়ে ও ভিক্ষুকের ছেলেও পেয়েছেন চাকুরী। পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করা হয়েছে। বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের নিয়োগ আরো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য ভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরো জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনা বাংলা’ ও প্রধান মন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার ‘দুর্নীতি মুক্ত দেশ আধুনিক সোনার বাংলা’ গড়তে পুলিশে কনেস্টবল পদ স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্নভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে- এই নতুন পুলিশ সদস্যরা প্রধান মন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ‘দুর্নীতি, ক্ষুধা মুক্ত আধুনিক সোনার বাংলা’ গড়তে তৎপর থাকবে।

 



 

Show all comments
  • মু হেলাল উদ্দিন ১৬ জুলাই, ২০১৯, ৮:৫২ এএম says : 0
    চােখে পানি এসে গেল
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন