Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

ডিপ্রেশন: সমস্যা, কারণ ও প্রতিকার

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ১৮ জুলাই, ২০১৯, ৮:২১ পিএম

ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। ডিপ্রেশন থেকে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, অনিদ্রা, বøাড প্রেসার, ক্যানসারসহ বহু জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে সঙ্গে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়ে যাচ্ছে। ডিপ্রেশন থেকে যেমন মারাত্মক ধরণের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে তেমনই নানা রকম অনৈতিক কাজও চলছে। আরেকটা বিষয় বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হল নেশার যে এত রমরমা অবস্থা তার কারণও ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনে আক্রান্তÍÍ কিনা বুঝতে হলে বেশি কিছু করার দরকার নেই শুধুমাত্র নিচের কয়েকটি বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখলেই দেখা যাবে, ডিপ্রেশন কীভাবে সর্বব্যাপী হয়ে গেছে , নিজের অজান্তেÍÍই। 

* জীবনের প্রতি ঘৃণা বা উদাসীনতা। মনে হয় অনেক কিছু পাওয়ার ছিল, করার ছিল, কিন্তু হল না। অতএব এই জীবনটা অর্থহীন। এটাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে, কিন্তু আর কত দিন? * কখনও খুশি কখনও উদাসী। সকালে ভালো বিকালে খারাপ। আজ বেশ আনন্দে আছে কাল মানসিক যন্ত্রনায় গুমরে মরছে। * জীবনটাকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কখনও ভাবে এই জীবন জীবন নয়। কখনও ভাবে এইতো বেশ আছি, ভালো আছি। * কিছু কেউ বলল। যে কেউ কিছু বলুক যদি ভালো বলে তো ঠিক আছে কিন্তু বিরূপ সমালোচনা করলে টেম্পার লুস করে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। * অন্ধকারকে ভয়, কোনো জন্তু, পোকা, পানি, আগুনের ভয় বা অজানা আতঙ্ক। বার বার হাত-পা ধোওয়া, গোসল করা, ঘ্যান ঘ্যান করা ইত্যাদি। আবার অহেতুক চিন্তÍÍা ও উত্তেজনা, একটুতেই ঘাবড়ে যাওয়া, একটুতেই ভেঙে পড়া। * কাজ করার ইচ্ছা হয় না। উৎসাহের অভাবে অল্প বয়সেই ক্লান্তিÍÍ অনুভব করা। কাজ করার ক্ষমতা আছে কিন্তু ইচ্ছার অভাবে কিছুই করতে চায় না। অলসতা যেন গ্রাস করে ফেলেছে। এমনকি খেলাধুলা বা পড়শোনার ক্ষেত্রেও উৎসাহের অভাব হলে বুঝতে হবে ডিপ্রেশন হয়ে আছে। *গোসল করা, কাপড় ধোওয়া, খাবার ইচ্ছে ত্যাগ। গোসল করতে চায় না, খেতেও ইচ্ছুক নয় আবার ময়লা পোশাকেই যেন থাকতে চায়, এমতাবস্থায় বুঝতে হবে ডিপ্রেশনে ভুগছে। * ঘুমানো। কখনও কম ঘুমায়, কখনও সবসময় শুয়ে থাকতে ভালোবাসে। * হরমোন চেঞ্জ। হরমোনের পরিবর্তন হতে থাকলে ডিপ্রেশন আসে। বয়ঃসন্ধিকালে এই ধরনের অবস্থা লক্ষ করা যায়। * নানা চাহিদা। চাহিদার শেষ নেই। একটা পেলে আর একটা চায়। কখনও একটাতে বা একটুতে সন্তুষ্ট নয়। বার বার বিভিন্ন ধরনের আবদার বা বায়না করতে থাকে। * ক্রোধ। যে ধরনের বিচার বা চিন্তÍÍা চলবে তা যদি নেতিবাচক বা ব্যর্থ হয় তাহলে ক্রোধ জন্ম নেয়। অনেকে বলেন, ক্রোধ ছাড়া চলে না। এটা ভুল। ক্রোধ শুধু ক্রোধ নয়- এ যেমন নিজেকে জ্বালায়, অন্যকেও জ্বালায়। ফলে, ক্রোধ প্রশমিত হলে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। ডিপ্রেশনের শিকার হতে হয়। * ইমোশনাল হওয়া ভালো কিন্তু অতি ইমোশনাল ভালো নয়। এ হল ডিপ্রেশনের লক্ষণ। ইমোশনাল ব্যক্তি বার বার চেষ্টা করে অন্যকে আকর্ষিত করতে। যখন পারে না বা নিজেকে অন্যের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে যখন ব্যর্থ হয় তখন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হয়ে যায়। * আত্মহত্যা হল মানসিক ব্যাধি যা ডিপ্রেশন থেকে জন্ম নেয়। ডিপ্রেশনের শেষ অবস্থায় পৌছালেই আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত হয়।
যে কোনো বয়সে হতে পারে। ছেলে-মেয়ে, ছাত্র-ছাত্রী, শিশু থেকে বয়স্ক সবাই ডিপ্রেশনের শিকার হয়ে থাকে।
ডিপ্রেশনের জন্য আমরাই দায়ী। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যেমন মা-বাবা দায়ী, যুবক-যুবতীদের ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই দায়ী, বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ দায়ী। সব কথার শেষ কথা হল ডিপ্রেশন যেহেতু মানসিক রোগ সেহেতু ওই রোগের আক্রমণকে অনুভব করে, নিজেই নিজের শিক্ষক হতে পারলে বহুলাংশে উপকৃত হওয়া যায়। এছাড়া মনের একাগ্রতা দ্বারা ডিপ্রেশন কেন হচ্ছে যদি বোঝা যায়, মনকে রিড করতে পারলে ডিপ্রেশনের কারণও জানা যাবে। তাহলে যেমন মেডিটেশন তেমনি ভালো ডাক্তারের সুপরামর্শ তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে সাহায্য করে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজেকে নিজে লুকানোর বা ঠকানোর চেষ্টা করলে পরবর্তী কালে তা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। তখন কাউন্সেলিং বা স্টেপ বাই স্টেপ ট্রিটমেন্ট, নিয়মিত ব্যায়াম ও রাজযোগ মেডিটেশন অভ্যাস করলে এবং মনকে পরিবর্তন করার পদ্ধতি জানা থাকলে ডিপ্রেশন সহজেই দূর করা যায়। অন্যথা শেষের সেদিন বড়োই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
সমাধান : * লক্ষ্য রাখা দরকার সবসময় যেন আনন্দে থাকা যায় । * সুখ-দুঃখ টাকার এপিঠ আর ওপিঠ। দুটোকে মেনে নিতে হয়। * যেখানে খুশি হারিয়ে যায় সেখান থেকে খুশির পথ খুঁজে নিতে হয়। * চিন্তÍÍার পরিবর্তন দরকার। বিষাক্ত চিন্তÍÍা, ব্যর্থ চিন্তÍÍা, নেতিবাচক চিন্তÍÍা, অহেতুক চিন্তÍÍা, ভয়ের চিন্তÍÍা ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকার ব্যবস্থা নিতে হবে। তারজন্য ম্যানেজমেন্টের কথা হল, কথা বলো, শান্তÍÍথাক, ইতিবাচক হও, অন্যকে বদলানো নয় নিজেকে বদলাও। * আমাদের মধ্যে যেমন অনেক গুণ আছে তেমনি আবার ত্রæটিও আছে। ত্রæটিগুলোকে বার বার স্মরন না-করে গুনগুলিকে স্মরণ করা ও কাজে লাগানো দরকার। * নিজের কাউন্সেলিং নিজে করা দরকার। বিশেষ করে রাত্রে শোবার আগে, সারাদিনের অ্যাকাউন্ট চেক করা এবং পরের দিন পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তার প্রতি লক্ষ্য রেখে নতুনভাবে শুরু করা দরকার। * মনের প্রভু তো আমি। মন আমার দাস। তাই মনকে দমন নয় বরং সুমনে পরিবর্তন করা দরকার। চাবকে নয় ভালোবেসে করা দরকার। * কেউ আমাকে বিরক্ত করলে কেন বিরক্ত হব? আমি পারমিশন দিচ্ছি কেন? কারণ মন দুর্বল তাই। মনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা দরকার। * আমি যা আমি তাই। মেনে নিতে হয়। লক্ষ্য মহৎ হলে সফলতা আসবেই। ধৈর্য ও সহনশীলতা কবচ সঙ্গে থাকলে জয় হবেই হবে। এক্সপেক্ট ও রিজেক্ট এই অঙ্ক জানা থাকলে ডিপ্রেশন আসবে না। * যুবক-যুবতীরা মাথাকে যত ব্যবহার করবে ততই ভালো থাকবে। * যত সিম্পল হওয়া যাবে ততই ডিপ্রেশন মুক্ত থাকা যাবে। অসম্ভব কথাটা আমাদের অভিধানে থাকতে নেই। * নৈতিকতা ও মুল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে চললে ডিপ্রেশনকে প্রতিহত করা যাবে। * ভুলে যাও, ক্ষমা করো এই দুটো শব্দ ডিপ্রেশন মুক্ত জীবনের চাবিকাঠি। * সব বোঝা সৃষ্টিকর্তাকে সমর্পণ করে দিয়ে মুক্ত মনে থাকতে পারলে ডিপ্রেশন আসবে না। * বাহ্যিক সুখ ক্ষণস্থায়ী, সেইজন্য এই সুখে লালায়িত না-হয়ে আন্তÍÍরিক সুখের সন্ধানে নিয়োজিত থাকা দরকার। * যেমন পানিকে পানি, বরফকে দরফ দেখি তেমনি যা দেখছি, যা শুনছি সেইভাবে দেখা ও শোনা দরকার। অতিশয়তা ভালো নয়। * আধ্যাত্মিক হওয়া দরকার। শারীরিক, মানসিক, সামজিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের প্রতি একনিষ্ঠ হলে ডিপ্রেশন আসবে না।
ক্রোধ থেকে মুক্ত থাকা দরকার। এর জন্য, * ভুলকে ঠিক করতে ভুল নয়। * হীনতাকে সহযোগী করা উচিত নয়। * তর্কে তর্ক বাড়ায় সেইজন্য প্রয়োজনে হার স্বীকার করা ভালো। এই হার, হার নয় হারমোনি সৃষ্টি করে। * রোগ আসবে কিন্তু রোগী হওয়া ঠিক নয়। রোগ দেহের হয়, চিকিৎসা করা দরকার কিন্তু মন যেমন রোগাক্রান্তÍÍনা হয়ে যায়। * ক্রোধকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করা দুর্বলতার লক্ষণ। দুর্বল নয় সবল হওয়া দরকার। তিন-চার বার গভীর শ্বাস নিলে ক্রোধ কমে যাবে। * শুভ ভাবনার এনার্জি বিকিরণ করা দরকার। * নিজের পছন্দ মত সব কিছু সবসময় হবে আশা করা বৃথা। সেইজন্য পছন্দমতো যদি না হয় তাহলে ইগোকে ব্রেক করে সবকিছুকে মেনে দেওয়া দরকার। * রেসপেক্ট (শ্রদ্ধা) এক প্রকার ইতিবাচক এনার্জি। সবার জন্য সমান হওয়া দরকার সে ছোটো হোক আর বড়ো। * বহির্জগৎ, টিভি, ইন্টারনেট, সেল ফোন ডিপ্রেশন সৃষ্টি করে সেইজন্য নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এসবের ব্যবহার করা উচিত। অন্যথায় জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে।

সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন