Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২১ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক মলয় কুমার সাহার স্ত্রী প্রিয়া সাহা গত ১৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ৩ কোটি ৭০ লাখ লোক গুম (ডিসঅ্যাপিয়ারড) হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘এখন বাংলাদেশে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। আমরা আমাদের বাড়ি-ঘড় খুইয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের ভূমি দখল করেছে। দয়া করে আমাদের লোকজনকে সাহায্য করুন।’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার ব্যক্তির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাক্ষাৎকারকালে প্রিয়া সাহা এ কথা বলেন। প্রিয়া সাহা’র এমন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হয়ে দেশবিরোধী এত বড় মিথ্যাচারে তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তার এই বক্তব্যকে দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রবিরোধী, মুসলমানবিরোধী, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা এবং নজিরবিহীন হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। সে পার্শ্ববর্তী দেশের এজেন্ট হয়ে দেশবিরোধী এ কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রবিরোধী ও রাষ্ট্রদ্রোহী এমন অপকর্মের জন্য দলমত নির্বিশেষে অনেক মানুষ আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেফতার এবং কঠোর শাস্তি দাবী করেছে। আমরাও তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে প্রিয়া সাহার এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর শাস্তি দাবী করছি।

বিশ্বের প্রভাবশালী দেশসহ সকল দেশ যেখানে বাংলাদেশকে একটি উজ্জ্বল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে, রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, দিচ্ছে এবং যেখানে সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদে পারস্পরিক সহবস্থানের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে, সেখানে এ দেশেরই এক হিন্দু মহিলার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে দেশের বিরুদ্ধে বিচার দেয়া শুধু মিথ্যাচার নয়, তা অপরাধ, অন্যায় এবং কোনোভাবেই তা বরদাশত করা যায় না। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, প্রিয়া সাহাকে সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়নি। এ সম্পর্কে সাংগঠনিকভাবে তিনি কিছু জানেন না। তাহলে প্রশ্ন উঠেছে, কে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে? কারা তাকে ট্রাম্পের খাস কামরা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে? তার পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো দেশ ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি রয়েছে। আর এ কাজে পার্শ্ববর্তী ভারতের হাত রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তা নাহলে ঐ মহিলার পক্ষে ট্রাম্প পর্যন্ত পৌঁছা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থীরা ভয়ংকর এবং হিন্দুত্ববাদের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে। দেশটিতে প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নিপীড়ন নির্যাতন চালানো হচ্ছে। মুসলমানদের জোর করে হিন্দু বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় এবং প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের কারণে তারা মহাউল্লাসে মুসলমানদের ভারত থেকে বের করে দেয়ার মিশন ও ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এর প্রভাবে বাংলাদেশের কিছু হিন্দুও অতি উৎসাহী হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্টে উঠেপড়ে লেগেছে। তার সর্বশেষ উদাহরণ হিন্দু সংগঠন ইসকন ও প্রিয়া সাহা। বলা বাহুল্য, প্রিয়া সাহা যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার দিয়েছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রই কয়েক দিন আগে ভারতের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ করেছে। আবার যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এ অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বৃহত্তর পরিসরে দেখলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে মুসলমানদের ওপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন, হত্যা, যুদ্ধ-বিগ্রহ চলানো হচ্ছে, তার নেপথ্যে এই যুক্তরাষ্ট্রেরই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব চিত্রের বিপরীতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা যে নিরাপদ পরিবেশ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে রয়েছে তা বিশ্বে বিরল। বাংলাদেশই বিশ্বে একমাত্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেখানে সকল ধর্মের মানুষই সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ থেকে শুরু করে সর্বত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সমান সুযোগ পাচ্ছে এবং কর্মরত। এমনকি প্রিয়া সাহার স্বামীও দুদকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারকে ধন্যবাদ দিতে হয় এ জন্য যে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ট্রাম্পের কাছে যে নারী বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেছি, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রশংসনীয়। প্রিয়া সাহা বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু গুম হয়েছে বলে যে কথা বলেছেন, এ তথ্য যে ঢাহামিথ্যা এবং দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক তা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৫ সালের আদম শুমারির হিসাব অনুযায়ী, দেশে হিন্দুদের সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যা শতকরা ৮.৯৬ ভাগ। অন্যদিকে বৌদ্ধ মোট ০.৬ ভাগ এবং খ্রিস্টান ০.৪ ভাগ। দেখা যাচ্ছে, প্রিয়া সাহা যে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু গুম (ডিসঅ্যাপিয়ারড) হয়েছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বলেছেন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান মিলিয়ে এত সংখ্যক সংখ্যালঘু বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। এমনকি স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে যে আদম শুমারি হয়েছিল তাতে হিন্দুর সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৩.৫ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখের মতো। এ থেকে প্রতীয়মাণ হয়, প্রিয়া সাহা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে হেয় প্রতিপন্ন ও বদনাম করার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে এবং কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্যই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছেন। তার এই অপকর্ম দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রবিরোধী ও দেশের মানুষের বিরোধিতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

দেশ, রাষ্ট্র, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিবিরোধী প্রিয়া সাহার এই অপকর্মের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ট্রাম্পের কাছে যে নালিশ করা হয়েছে তা একটি চক্রান্ত ও উদ্দেশ্যমূলক। তবে তার এই চক্রান্ত এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে তা তিনি বলেননি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রিয়া সাহার বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, তিনি কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলে বলছেন, যেখানে প্রিয়া সাহার কথা সারাদেশের মানুষ দেখেছে ও শুনেছে, সেখানে খতিয়ে দেখার কি আছে? এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট প্রিয়া সাহা দেশ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে, দেশের ভাবমর্যাদার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ট্রাম্পের কাছে বিচার দিয়েছেন। তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে অভিযুক্ত করাই সমীচিন। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলে বলছেন, আজ যদি দেশের ইসলামী সংগঠনের কোনো নেতা এ ধরনের কাজ করত, তাহলে কি সরকার চুপ করে বসে থাকত? ইতোমধ্যে এ নিয়ে সরকারের মধ্যে তোলপাড় এবং ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়ে যেত। সারাদেশে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা বক্তব্য-বিবৃতি, মিছিল-সমাবেশ করতে নেমে যেত। এত বড় দেশবিরোধী অপরাধ ও অন্যায় করে যদি ঐ মহিলা পার পেয়ে যায়, তাহলে দেখা যাবে আরও অনেকে এ ধরনের চক্রান্তে উৎসাহী হয়ে উঠবে। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, ইসকন নামে একটি হিন্দু সংগঠন চট্টগ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রসাদ খাইয়ে হিন্দুদের মন্ত্র পাঠ করিয়েছে। এ কাজটি যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তা নিয়ে সরকার তো বটেই দেশের সুশীল ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কাছ থেকে কোনো ধরনের প্রতিবাদ লক্ষ্য করা যায়নি। আমাদের কথা হচ্ছে, দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং দেশদ্রোহী অপকর্মের সাথে জড়িতদের সম্পর্কে সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে। ‘উচিত হয়নি’, ‘চক্রান্ত’ এমন বক্তব্য দিয়ে অপরাধীকে পার পাওয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না। দেশের ভাবমর্যাদাকে কেউ হেয় প্রতিপন্ন করে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করবে, তা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না এবং সময়ক্ষেপণ বা কৌশলে তা এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। যে বা যারাই এ ধরনের অপরাধ ও অন্যায়ের সাথে জড়িত থাকুক না কেন তাদেরকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের সাহস না দেখায়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন