Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে কমেছে সুন্দরী ও গেওয়া গাছ

অগ্নিকান্ডে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব

প্রকাশের সময় : ৬ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এ.টি.এম. রফিক, খুলনা থেকে : বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মূর্তিমান আতঙ্ক আগুন। এ বছরে চারবার এবং গত ১৪ বছরে ২২ বার আগুনে পুড়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবন। এতে ভস্মীভূত হয় কোটি কোটি টাকার বৃক্ষরাজি ও লতা-পাতা। অগ্নিকা-ে প্রায় সাড়ে ১০ একর বনজ সম্পদ পুড়েছে। ফলে প্রতি বছরই সুন্দরবনের গাছের সংখ্যা কমে আসছে। ষাটের দশকে প্রতি হেক্টরে ৩০০টি গাছ থাকলেও গেল বছর তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একশ’ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে। বনের মোট সীমানার ২২২ দশমিক ৭৪বর্গ কিলোমিটার সুন্দরী গাছ ও ১৪৬ বর্গকিলোমিটার গেওয়া গাছ কমেছে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনের পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশ পায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন এলাকায় চারবার আগুন লাগে। চাঁদপাই রেঞ্জ স¤্রাট বাহিনী, স্মরণখোলা রেঞ্জ জাহাঙ্গীর বাহিনী, কবির তালুকদার ও শাজাহান শিকারী নিয়ন্ত্রণ করছে। ধানসাগর এলাকায় বনসংলগ্ন বিল দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে আগুন বাহিনী। গত বছরের ২১ মে, চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশন এলাকায় ৩ একর, এ বছরের ১৩, ১৮, ২৭ মার্চ ও ২৮ এপ্রিল অগ্নিকান্ডে ১০ একর বনজসম্পদ ক্ষতিগগ্রস্ত হয়। অগ্নিকা-ের সাথে জড়িতদের ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রতিবার আগুন লাগার পর তদন্ত কমিটি দায়সারা রিপোর্ট পেশ করে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত জাকির হোসেনের ইন্ধনে মূলত বনে আগুন দেয়া হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী জানান, আগুন লাগার পর তাপ সহ্য করতে না পারায় বন্যপ্রাণী এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, যতদূর পর্যন্ত আগুন, ধুয়া ও তাপ বিস্তু হয় ততদূর পর্যন্ত প্রাণী শূন্য হয়ে যায়। এর ফলে জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। সর্বশেষ ক্যামেরা ট্রাফিংয়ের ফলাফল অনুযায়ী সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা ১০৬টি, তিন মাস আগে একটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিজ বলেন, বনের উত্তরদিকে পানি কমে যাওয়ার কারণে লবণাক্ততা বেড়ে যায়। প্রবল ¯্রােতের মুখে মাটি সরে যাচ্ছে। ঘোলাটে পানি না এসে সাধারণ পানি আসায় পলি সুন্দরবনের চারিপাশে জমা হচ্ছে। এতে বছর বছর গাছের সংখ্যা কমে আসছে। ২০২০ সাল নাগাদ সুন্দরবনে হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা নেমে আসবে ১০০টির কাছাকাছি একইভাবে কমে যাচ্ছে সুন্দরী গাছের সংখ্যা। কমে যাচ্ছে সুন্দরী গাছের উচ্চতাও। আগে যেখানে সুন্দরী গাছের উচ্চতা ছিল ৪০ থেকে ৫০ ফুট, তা এখন নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ২০ ফুটে। জলবায়ু পরিবর্তনে সাগরে পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে সমতল সুন্দরবনের অনেক গভীরে চলে যাচ্ছে লবণপানি। উল্টো দিকের নদ-নদী দিয়ে সমুদ্র অভিমুখে যাওয়া মিষ্টি পানি কমছে। বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সুন্দরবন রক্ষায় সরকার সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সঠিক প্রকল্প নেয়ার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের নির্বিচারে চলাচলের কারণে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূল ভাঙছে এবং মুখ বন্ধ হয়ে গাছ মারা যাচ্ছে। অপর এক সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও নদী ভাঙনের কারণে গোলপাতা জন্মানোর পরিমাণ কমে গেছে। সুন্দরবন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. আব্দুর রহমান জানান, ফারাক্কার প্রভাবে পশুর ও শিবসা নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গাছের খাদ্যগ্রহণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। অতিরিক্ত লবনাক্ততা পরিমাটি বৃদ্ধি ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সুন্দরী গাছের শ্বাসমূল দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের সদ্য বিদায়ী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহির উদ্দিন আহমেদ জানান, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নদীগুলো ভাঙনের কারণে সুন্দরী গাছ ভেঙ্গে উপড়ে অনেক স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে নদীর মোহনা এলাকায় বিভিন্ন গাছপালা বিশেষ করে কেওড়া ও গেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া যানবাহন চলাচলের কারণে শেওলা নদীসহ অন্যান্য নদীতে ভাঙন দেখা দেয়ায় গাছের সংখ্যা কমেছে। ‘সুন্দরবন’ নামক অত্র বিভাগের এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে সুন্দরবনের ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এলাকা মারাত্মকভাবে, ১৫ দশমিক ২৩ শতাংশ এলাকা আংশিকভাবে এবং ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ এলাকা সামান্য ক্ষতি হয়। উল্লখ্যে, সুন্দরবন বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী ১ লাখ ৫ হাজার ৯৭৩ হেক্টর জমিতে সুন্দরী ও গেওয়া গাছ রয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন