Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি ২০২১, ০৭ মাঘ ১৪২৭, ০৭ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

খেলাপি ঋণ অবশ্যই কমেছে : অর্থমন্ত্রী

প্রতিটি ব্যাংকে গ্রাহকসেবা উইং চালুর নির্দেশ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৩ জুলাই, ২০১৯, ১২:০৪ এএম | আপডেট : ১২:১১ এএম, ২৩ জুলাই, ২০১৯

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণ কমেছে দাবি করে বলেছেন, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলাম খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। আপনারা লিখেছেন বেড়েছে। কিন্তু হিসেব অনুযায়ী খেলাপি ঋণ বাড়েনি। বরং খেলাপি ঋণ কমে এসেছে, অবশ্যই কমেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জুনে অধিকাংশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে এসেছে তথ্য দিয়ে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে প্রতিটি সরকারি ব্যাংকে গ্রাহকদের সেবা দেয়ার লক্ষ্যে একটি করে সেবা উইং চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এটি বাস্তবায়ন করবে। শিগগিরই আমরা তাদের নিয়ে বসব বলে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। একই সঙ্গে তাদেরকেও মানতে হবে। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ এবং সাধারণ মানুষের চাওয়া।

গতকাল সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমরা ব্যাংকিং খাত নিয়ে আলোচনা করেছি। সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। খেলাপী ঋণ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আমি শপথ নেয়ার সময় বলেছিলাম খেলাপি ঋণ বাড়বে না, গণমাধ্যমে এসেছে বেড়েছে। কিন্তু আসলে তা বাড়েনি। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ২০১৮ থেকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ২০১৯ সালে কমে এসেছে। ব্যাংকগুলো যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায়, আমাদের খেলাপি ঋণ আগের থেকে কমেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল ৩০ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ২০১৯ জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশ। জনতা ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৩৭ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১৯ জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ, ২০১৯ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ, ২০১৯ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৫৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ২০১৯ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৫৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ২০১৯ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কৃষি ব্যাংকের ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ছিল ২৩ শতাংশ। তবে এ দু’টি ব্যাংকের ডিসেম্বরের পর কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে বলে জানান তিনি।
মুস্তফা কামাল বলেন, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, খেলাপি ঋণ কমে আসছে। খেলাপি ঋণ থেকে এক্সিটের জন্য যে সুযোগ দিয়েছি সেটা বাস্তবায়ন হলে আরও কমে যাবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংক ঋণে সুদহার আমরা সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসব। সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ না হলে খেলাপি ঋণ বাড়ে। এতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ই ক্ষতিতে পরে। যদি ৯ শতাংশ সুদও হয় সেটাও পৃথিবীর প্রায় সব দেশের ওপরে। ১৪, ১৫, ১৬ শতাংশ সুদ দিয়ে আবার আমাদের দেশে সুদহার হিসাব করার সময় চক্রাকারে হিসাব করা হয়। এটা সিম্পল রেটে হিসাব করা হয় না।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, সকালে ১০০ টাকা ছিল, বিকেলে ১০ শতাংশ সুদ যোগ করে হিসাব করে। পরের দিন আবার একটু বাড়ে। কেউ তিন মাস পরপর এটা হিসাব করে, কেউ ছয় মাস পরপর হিসাব করে। এটা কিন্তু ঠিক নয়। ১০ শতাংশ সুদ এক বছরের জন্যই সিম্পল সুদ হওয়ার কথা।
ব্যাংকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাদের অনুরোধ করছি, প্রজ্ঞাপন দেন আর না দেন এটা আপনারা বাস্তবায়ন করবেন। এতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ই লাভবান হবেন। টাকাটা আছে কিন্তু জীবনেও পেলাম না, এটা ভালো না। সুতরাং যেটা দেশের অর্থনীতিতে ভালো হয় সেটাই ভালো।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা আজকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, ত্রুটি করে কেউ যদি বলে আমরা ভুল করেছি এখন ঋণ পরিশোধ করব, সেটা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু যারা অন্যায়ভাবে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে দেশের বাইরে নিয়ে গেছে কিংবা টাকা নিয়ে দেশেই বালিশের নিচে রেখে দিয়েছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইন আইনের গতি অনুযায়ী চলে, সেভাবে চলবে। দু-চারটি অনিয়ম তুলে ধরা আমাদের কাজ।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংক খাতে অন্যায়ের কারণে বর্তমানে অনেকেই জেলে রয়েছে। জনতা, ফারমার্সসহ অন্যান্য ব্যাংকের অনেকেই জেলে রয়েছে। শুধু এমডি বা চেয়ারম্যানই নন, পরিবারসহ জেলে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমরা কাউকে ছাড় দেব না। আজকে ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে একটা অ্যাসেসমেন্ট করলাম। এতে দেখলাম আমরা সেভ, এমনিভাবে প্রতি তিন মাস পরপর আমরা বসব। প্রগ্রেস রিপোর্ট দেবো। একই সঙ্গে স্বচ্ছতার সাথে কাজ শেষ করতে চাই এবং সকলের সহযোগিতার কথা বলেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ ছাড়াও তিনি ব্যাংকিং খাতকে আরো জোড়দার করতে গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার জন্য ব্যাংকারদের নির্দেশ দেন।
সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকের এমডি, চেয়ারম্যানরা কি আপনাকে আশ্বস্ত করেছে? জানতে চাইলে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ইতোমধ্যে অনেক ব্যাংক এটি কার্যকর করেছে। দু-একটি বাকি আছে, তারাও করবে। সরকারি ব্যাংক শতভাগ এটি বাস্তবায়ন করেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো কবে নাগাদ এটি বাস্তবায়ন করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গেও আমরা বসব।

অর্থমন্ত্রী প্রত্যেক ব্যাংকে সেবা উইং চালু করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজ সেবা বিক্রি করা। আমরা পানি বিক্রি করি না, সেবা বিক্রি করব। কোথাও আর্থিক খাতের অভিযোগ থাকলে অভিযোগ দিন। প্রত্যেক ব্যাংকে সেবা উইং চালু করা হবে। গ্রাহকরা সেখানে অভিযোগ করবে এবং অভিযোগগুলো আমাদের জানাবে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, স্বচ্ছতার সাথে আমাদের কাজ কর্মগুলো করতে চাই। এ ক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা চাই। এখন যদি মানুষের মনে অবিশ্বাস জন্মায় এটা দেখতে ভালো দেখাবে না। দেশের অর্থনীতি কোথায় আছে দেশ মানুষ জানে আপনারাও জানেন। দেশের অর্থনীতির সাথে আমাদের ব্যাংকিং খাত, নন-ব্যাংকিং খাত এবং বিশেষায়িত খাতসহ যত আর্থিক খাত আছে তাদের সবাইকে সমৃদ্ধ করে। দেশের জনসাধারণকে সমৃদ্ধ করে তাদের সবাইকে নিয়ে আমাদের এই অগ্রগতির সুফল ও সফলতা যাতে সভায় ভোগ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মেখ হাসিনা আমাদের যে নির্দেশনা দিয়েছেন যাকে যেখানে সেবা দেয়ার দরকার আমরা তাদের সে ভাবে সেবা দেবো বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ফজলে কবির, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল মকবুল এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান খন্দকার সাবেরা ইসলাম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুছ ছালাম আজাদ, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামস-উল-ইসলাম, রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান, বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আলম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আলমগীর উপস্থিত ছিলেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ