Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

অরক্ষিত রেলক্রসিং মৃত্যুফাঁদ

ইসমাইল মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ২৫ জুলাই, ২০১৯, ১২:০১ এএম

সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামের রাজন শেখ (৩২) ও চরঘাটিনা গুচ্ছগ্রামের সুমাইয়া খাতুন (২১)। দুই গ্রামের এই দুই নর-নারী চরম সুখের প্রত্যাশায় গত ১৫ জুলাই দুপুরে নদীর দুই ধারার মতো এক মোহনায় এসে মিলেছিলেন। হাতে হাত রেখে সেদিনই তাঁরা দুই দেহ এক আত্মা হবার বাসনায় এবং জীবন-মরণের সাথী হবার প্রত্যয় নিয়ে কবুল করে নিয়েছিলেন উভয়ে-উভয়কে। কিন্তু বিয়ের পিঁড়িতে বসার মাত্র চার ঘন্টার পেরোবার আগেই তাঁদের ভবিষ্যতের সকল আশা আর রঙিন স্বপ্ন পরিণত হয়েছে নির্মম সমাধিতে। যুগল জীবন শুরু করার আগেই নিভে গেছে উভয়েরই জীবনপ্রদীপ। সুমাইয়া খাতুনকে জীবন-মরণের সাথী করে রাজন শেখ যখন আত্মীয়-স্বজন সমেত বাড়ি ফিরছিলেন তখন উল্লাপাড়া উপজেলার সলপ রেলস্টেশনের প্রায় অর্ধ কিলোমিটার উত্তরে অরক্ষিত একটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসের ওপর এসে হামলে পড়ে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ‘পদ্মা’ এক্সপ্রেস নামের একটি যাত্রীবাহী ট্রেন। বর-কনেসহ বরের আত্মীয়-স্বজনদের বহনকারী মাইক্রোবাসটিকে পদ্মা ট্রেনটি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় রেলক্রসিং থেকে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার দূরে। এতে বর রাজন ও কনে সুমাইয়াসহ ওই মাইক্রোবাসটির এগারো আরোহীর সকলেই মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মাইক্রোবাস আরোহী কয়েকজনের দেহ একেবারে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেছে। তাদের চেনার কোন উপায় নেই। এ ঘটনার পর বিয়ের আনন্দে মাতোয়ারা দু’পরিবারে নেমে আসে বিষাদের কালো ছায়া।

বাংলাদেশ রেলওয়ে এখন অব্যবস্থাপনায় পরিপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। রেলওয়ের চরম অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মের একটি ক্ষেত্র হলো সারাদেশের অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো। দেশের প্রায় প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে গড়পড়তা প্রতি মাসেই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। রেলক্রসিং নামক মরণফাঁদে অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। অবৈধ যে রেলক্রসিংগুলো রয়েছে তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। উপরন্ত বৈধ রেলক্রসিংগুলোর প্রায় অর্ধেকের মতো গেটম্যান নেই। ফলে অরক্ষিত ক্রসিংয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। বৈধ রেলক্রসিংগুলো সুরক্ষিত করার কোনো তাগিদ নেই.। প্রতিবার এসব রেলক্রসিং-এ দুর্ঘটনা ঘটার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। নির্দিষ্ট মেয়াদেতদন্ত কমিটিকে তদন্ত রিপোর্ট দেবার নির্দেশ দেয়া হয়। ব্যাস, এ পর্যন্তই। এক সপ্তাহের মধ্যে সব পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে যায়।

সারাদেশে সর্বমোট ৪ হাজার ৪৪৩ কিলোমিটার (২০০৩-২০০৪) রেলপথ রয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চল জোনে মোট রেলস্টেশন রয়েছে ৪৫৮টি রেল স্টেশন ও জংশন। রেলওয়ের মোট ৩৪৭টি ট্রেনে (আন্তঃনগর : ৯০টি, মেইল এক্সপ্রেস ডেমো : ১২০টি এবং লোকাল : ১৩৫টি) প্রতি বছর যাত্রী পরিবহন করে প্রায় ৪২ লক্ষ জন; আর মালামাল বা পন্য পরিবহন করে প্রায় ৩২ লক্ষ ৬ হাজার মেট্রিক টন। এতে বছরে গড়পড়তা রেলেও আয় হয় ৪৪৫ কোটি ৬২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। রেলওয়ের উক্ত দুই জোনে কর্তৃপক্ষের হিসেব মতে বৈধ রেলক্রসিং রয়েছে ১ হাজার ৬১০টি। আর অবৈধ রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০টি। এই অবৈধ ক্রসিংগুলো পুরোপুরিই অরক্ষিত এবং মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বৈধ রেলক্রসিং যেগুলো রয়েছে সেগুলো দিয়ে পারাপার, রেললাইনের ওপর দিয়ে চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। যেসব বৈধ রেলক্রসিং রয়েছে সেগুলোতে অনেক সময় গেটম্যান থাকেন না। ফলে বৈধ রেলক্রসিং-এও দুর্ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় রেল কর্তৃপক্ষের যখন করণীয় হলো দেশে রেলপথে অধিক পরিমাণ রেলক্রসিং স্থাপন, রেলক্রসিগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধ করে রেলক্রসিং-এ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমিয়ে আনা। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ যেন কুম্বকর্ণের ঘুমে! অকালে এসব প্রাণহানির দায় কার?

মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়া অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো দ্রæততম সময়ের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধের ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষের দাবি করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে জন্য একের পর এক তৈরি হচ্ছে অবৈধ রেলক্রসিং। তাঁরা তাদের সীমাবদ্ধতার কথা জানান দিচ্ছেন। অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ের ব্যাপারে আমাদের দেশের আইন কী বলছে তা আমরা জানি না। তবে এইটুকু জানি মানুষের স্বার্থেই তৈরি হয় দেশের আইন। দেশের মানুষের সময়ের দাবি হচ্ছে রেলক্রসিংকে ঝুঁকিমুক্ত করে জান-মালের সুরক্ষা করা। রেল দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে সুরক্ষিত করতে হবে রেলক্রসিংগুলোকে। দেশে যেসব বৈধ রেলক্রসিং আছে সেগুলোতে গেটম্যান থাকা সুনিশ্চিত করতে হবে। যদি কোন বৈধ রেলক্রসিং-এ গেটম্যান না থাকে তবে সেসব রেলক্রসিং-এ দ্রæত নিয়োগ প্রদান করে গেটম্যান নিযুক্ত করতে হবে। দেশের ১ হাজার ৩০০টি অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে যদি কোন কারণে সেগুলো বন্ধ করা সম্ভব না হয় তবে গেট নির্মাণ করতঃ গেটম্যান নিয়োগের মাধ্যমে সেগুলো সুরক্ষিত করা বা বৈধ করার ব্যবস্থা অচিরেই করতে হবে। নতুবা রেলক্রসিং-এ মৃত্যুর মিছিল রোধ করা কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না।

ismail.press2019@gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন