Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬, ১৮ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

কমানো হয়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ, এক হাজার ডলার রেমিট্যান্সে প্রণোদনার প্রস্তাব

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৩১ জুলাই, ২০১৯, ১:৪৫ পিএম | আপডেট : ৮:২৬ পিএম, ৩১ জুলাই, ২০১৯

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে চলতি অর্থবছরের পুরো মেয়াদের জন্য সতর্ক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, ভালো মানের ঋণের অভাবেই বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। যদি ভালো ঋণ বাড়ে তাহলে আমরা এ খাতের ঋণ প্রবাহের লক্ষ্য বাড়িয়ে দেব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে বুধবার (৩১ জুলাই) ২০১৯-২০ অর্থবছরের এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ফজলে কবির। মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর এস এম মুনিরুজ্জামান, আহমেদ জামাল, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা আল্লাহ মালিক কাজেমী, বিআইএফইউ’র প্রধান আবু হেনা মো. রাজি হাসান, ব্যাংকিং রিফর্ম অ্যাডভাইজার এস. কে. সুর চৌধুরী, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মো. আখতারুজ্জামানসসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এতদিন বছরে দুটি মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন থেকে পুরো অর্থবছরের জন্য একবারই মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতে এই লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ১৬ দশমিক পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও অর্জিত হয়েছে ১১ দশমিক তিন শতাংশ। তা থেকে বাড়িয়ে এবার ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছে।

গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বাজেটে ঘোষিত মূল্যস্ফীতি পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশে পরিমিত রেখে আট দশমিক ২০ শতাংশ প্রকৃত জিডিপি অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ প্রসার সঙ্কুলানের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মুদ্রানীতির নীতিভঙ্গীটি আগেকার মতোই সতর্কভাবে সঙ্কুলানমুখী রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির বহমান জোরালো ধারার সৃষ্ট আস্থা ও মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী রেখে উচ্চতর হারে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের সহায়ক মুদ্রানীতিভঙ্গী ও কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি রেখে মুদ্রানীতির আগাম ঘোষণার এই আয়োজন করতে পারায় আমাদের সন্তোষ ও পরিতুষ্টিবোধের পাশাপাশি রয়েছে ঘনবর্ষার এই শ্রাবণে উজানের নামতে থাকা বন্যার প্লাবনে দেশের অনেক অঞ্চলের বিপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য বিষন্নতা ও সমবেদনা।

অতীতের মত এবারও বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও বন্যার্তদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানান গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, নতুন অর্থবছরের মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জনে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই দিকেই ‘কিছু ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা’ রয়েছে।

নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের ফলে এবং বন্যায় ফসলহানির কারণে বাজার দরে চাপ সৃষ্টি হলে মূল্যষ্ফীতি সরকারের প্রত্যাশিত সীমায় বেঁধে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, এগুলোর সমন্বিত প্রভাব সমগ্র অর্থবছরে কেমন দাঁড়াবে তার ধারণা পেতে কিছুটা সময় লাগবে।

আবার বিশ্ব বাণিজ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থিদের চলমান দ্বন্ধ এবং ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তাকে বৈদেশিক খাতের সম্ভাব্য ঝুঁকি বলে মনে করা হচ্ছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক ওই বিষয়গুলোকে ‘ঝুঁকি’ না বলে ‘অনিশ্চয়তা’ বলতে চান গভর্নর ফজলে কবির। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশসমূহের জন্যে এসব অনিশ্চয়তা থেকে লাভজনক সুযোগ গ্রহণের কিছু অবকাশও সামনের মাসগুলোতে আসতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর বলেন, মুদ্রানীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতির প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম হলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিকর। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ধরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব বলেও তিনি মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করেন।

নতুন মুদ্রানীতিতে গড় সুদের হার কমিয়ে আনা হয়েছে উল্লেখ করে গর্ভনর বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের গড় হার ছি ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের গড় হার কমে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে নেমে আসে। নতুন মুদ্রানীতিতে সুদহার, নগদ জমা ও তরল সম্পদের বিধিবদ্ধমাত্রাগুলো আগের মুদ্রানীতি থেকে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর বলেন, ব্যাংকে কোনো তারল্য সংকট নেই। বর্তমানে ব্যাংক খাতে তারল্য রয়েছে ৮৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। তবে সব ব্যাংকের তারল্য প্রবাহ এক না। কোনো ব্যাংকের হয়তো অনেক বেশি আছে, আবার কোনো ব্যাংকের হয়তো কিছুটা কম আছে। এছাড়া, আন্ত:ব্যাংকগুলোর কলমানি রেটও স্বাভাবিক রয়েছে। এর হার এখন চার শতাংশ বলেও জানান গভর্নর ফজলে কবির।

প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী কর্মসংস্থান না হওয়া প্রসঙ্গে ফজলে কবির বলেন, এটা নিয়ে সন্দেহ করার কিছু নাই। কর্মসংস্থান বাড়বে। রেমিট্যান্স প্রণোদনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রেমিট্যান্সে প্রণোদনার বিষয়ে কোনো অপব্যবহারের সুযোগ নেই। বরং প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যংক একটি গাইডলাইন করছে। সেই গাইডলাইনটি বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এই গাইডলাইন অনুযায়ী প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর প্রণোদনা দেওয়া হবে।

টাকার মান কমানো প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেশ যুক্তিসঙ্গত আছে। ফলে টাকার মান অবনমনের কোনো প্রয়োজন নেই।

পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি খারাপের দিকে যাচ্ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক চেষ্টা করেছিল এটিকে টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ফলে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা এটি অবসায়ন করতে বাধ্য হয়েছি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর বলেন, ২০১৮ সালে আমরা কেন ফারমার্স ব্যাংক অবসায়ন করলাম না, এটা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। আবার ২০১৯ সালে পিপলস লিজিং কেন অবসায়ন করলাম এটা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে কেনো বাংলাদেশ ব্যাংক পিপলস লিজিং বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সমালোচনা হবেই।

আরেক প্রশ্নের জবাবে ফজলে কবির বলেন, গত ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিবেচনা করে দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছর মেয়াদে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। আসলে এগুলো মূলত রিপেমেন্টের স্বার্থেই করা হয়েছে। আর এই ক্ষেত্রে পূর্বের সার্কুলার সংশোধন করার দরকার নেই। মূলত এটা করার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে চালু থাকবে। এতে করে কর্মসংস্থান ঠিক থাকবে। তবে শিগগিরই এ বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক পরিষ্কার করে সার্কুলার দেবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বর্তমান মুদ্রানীতি কৌশল থেকে একটি সুবিবেচিত নীতি সুদ হারে খোলাবাজার কার্যক্রমে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে তারল্য জোগান দিয়ে বা উত্তোলন করে সুদ হারের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব পড়বে। এতে মুদ্রানীতির কার্যকারিতা আরও বাড়বে। মধ্যম ও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে এমন কৌশল ব্যবহার হচ্ছে বলে গভর্নর জানান।

এক হাজার ডলার রেমিট্যান্সে প্রণোদনার প্রস্তাব: এক হাজার ডলার প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এলে তাৎক্ষণিক দুই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বেশি রেমিট্যান্স এলে নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে, এরপরই টাকা ছাড় হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এমন একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রানীতি প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কেন্দ্রীয় ব্যাংক


আরও
আরও পড়ুন