Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬, ১৬ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

আত্মহত্যা মানসিক ব্যাধি

মো. শামসুল ইসলাম সাদিক | প্রকাশের সময় : ১ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

আত্মহত্যা মানে নিজকে নিজে ধ্বংস করা। আত্মাকে চরম কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চত করা। স্বীয়হাতে নিজ জীবনের যাবতীয় কর্মকান্ডের ইতি ঘটানো। জঙ্গিরা ইসলাম নাম করে আত্মহত্যা শুরু করছে। অন্যদিকে অনেক নারী-পুরুষ বিশেষ করে যুবতী বোনেরা জীবন সংগ্রামের পরিবর্তে জীবন থেকে পালিয়ে যাবার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। তুচ্ছ পারিবারিক কলহ, বিদ্যালয় গমনাপথে বখাটেদের উৎপাত, ভালোবাসায় ব্যর্থতা, শত দুঃখ-কষ্ট বঞ্চনা ও প্রতারণা ইত্যাদিকে কেন্দ্রকরে তরুন-তরুণীরা এবং স্বামীর নির্যাতন-অত্যাচার, যৌতুক সমস্যা, স্বামীর অর্থনৈতিক অক্ষমতা, পারিবারিক অশান্তি থেকে বাঁচার পথ হিসেবে আত্মহত্যাকে বেছে নিচ্ছেন। এছাড়াও

অজ্ঞতা-অশিক্ষা, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীলতা, পারিবারিক কলহ, যৌতুক প্রথা, পিতা-মাতার বিবাহ বিচ্ছেদ, যৌন হয়রানি কিংবা অসম প্রেম, নি:সঙ্গতা বা দীর্ঘ মেয়াদী বিষন্নতা, অবসেশন, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশা, আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সাথে অসঙ্গতি বিধান, মাদকাসক্ততা, কিশোরদের ক্ষেত্রে থ্রিল বা এডভেঞ্জার প্রিয়তা ইত্যাদি। এসবই বড় ভুল, এসব সমস্যা সব দেশে, সব জাতিতে আছে। আত্মহত্যা এসবের কোনো সুষ্ঠু সমাধান বা সঠিক প্রতিকার নয়, বরং আত্মহত্যা মহাপাপ। আত্মহত্যা বর্তমান সময়ে এক গুরুতর মানসিক ব্যাধিতে রুপ নিচ্ছে। আর প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনা বিস্তর প্রভাব ফেলে তার আত্মীয়, পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশিদের উপরে। বাংলাদেশে আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে আত্মহত্যার ঘটনা। পূর্বে গ্রামীন অশিক্ষিত সমাজে আত্মহত্যা বেশি ঘটত। বর্তমানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতেও আত্মহত্যা জনিত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার ব্যক্তিরা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আত্মহত্যা কাজটি অপর ব্যক্তিকে হত্যার সমান অপরাধ। কারণ, মানুষ নিজের মালিক সে নিজে নয়। ইচ্ছা করলেই সে নিজেকে হত্যা করতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা কবীরা গুনাহ। শিরকেরপর সবচে বড় গুনাহ।

সৃষ্টিকর্তা মানুষকে মরণশীল হিসেবেই সৃষ্টিকরেছেন। ধনী-গরীব, বিদ্বান-মূর্খ, রাজা-প্রজা সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। মানুষের মৃত্যু ঘটানোর কাজটি একমাত্র সৃষ্টিকর্তার। অতএব কেউ যদি কাজটি নিজের হাতে তুলেনেন, নিজের মৃত্যু ঘটান নিজের হাতে তবে তিনি অনধিকার চর্চাই করবেন। সৃষ্টিকর্তা তা পছন্দ করেন না। কেউঅনধিকার চর্চা প্রত্যাশা করে না। ইসলাম আত্মহত্যা মহাপাপ বলে গণ্য করেছে। কাজই এ থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ এর পরিণাম কঠোর ও যন্ত্রণাদায় শাস্তি রয়েছে। মানুষ ইসলামের অনুশাসন ও প্রেরণা অনুসরণ করতে হবে। শত হতাশা ও দুঃখ সত্তে¡ও সৃষ্টিকর্তার ওপর ঈমান-আস্থা-ভরসা তাকে রক্ষা করবে। পরকালের অনন্তকালীন শাস্তির ভয় তাকে আত্মঘাতী হওয়া থেকে ফেরাবে। সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তাকে বাঁচার সাহস জোগাবে। আত্মহত্যা তো দূরে থাক, মৃত্যু কামনাও বৈধ নয়, কোনো বিপদে পড়ে বা জীবনযন্ত্রনায় কাতর হয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করতে পর্যন্ত নিষেধ রয়েছে। আত্মহত্যা প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা দেয়া জরুরি। প্রতিদিন যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নানা রকম নিয়ম রক্ষা করা হয়। তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত পরিচর্যা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আমাদের চোখ-কান খোলা রাখা জরুরি। খুব আপন জনের মনের ভেতর ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, একটুখানি সচেতনার অভাবে তা আমলে আসছে না। তাই পারিবারিক বন্ধন মজবুত করা আবশ্যক। সামান্য অস্বাভাবিকতাকেও গুরুত্ব দিন। বর্তমানে জটিল আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় উপযুক্ত শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও পেশা গ্রহণে ব্যর্থ কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের সামঞ্জস্য বিধান করতে না পারার কারণে সামাজিক শোষণ বঞ্চনার শিকার হয়। ফলে তাদের মনে তীব্র হতাশা ও নৈরাশ্য দানা বাঁধে, যা এক পর্যায়ে সমাজের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও আক্রোশে রূপ নেয়। এমন পরিস্থিতিতে এই ব্যর্থ কিশোর-কিশোরীরা সামাজিক আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এবং অপরাধমূলক আচার আচরণে লিপ্ত হয়। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে, ইন্টারনেট, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, বগ, ইউটিউবের ন্যায় গণমাধ্যমগুলো শিশু-কিশোরদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। উক্ত গণমাধ্যমগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকরা যথেষ্ট সচেতন না হলে কোমলমতি শিশু-কিশোররা অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। বিশেষ করে কুরুচিপূর্ণ যৌন আবেগ ভরপুর ম্যাগাজিন ও পত্রিকা কিশোর-কিশোরীদের মন-মানসিকতার ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। যৌন রসে সিক্ত সিনেমা, বিজ্ঞাপন চিত্র, ফ্যাশন শো-এর নামে টেলিভিশনে প্রদর্শিত যৌন আবেদনময়ী অনুষ্ঠানমালা আবেগপ্রবণ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ও মানসিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বিপথগামী করে তোলে। অনেক পত্রিকা থেকে জানা যায় মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্ত ব্যক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তার শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় ঘটার ফলে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, নারী-শিশু নির্যাতন, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, পকেটমারা ইত্যাদি বড় বড় সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যখন এর মাত্রা দ্বিগুন আকার ধারণ করে তখন অনেকে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। এজন্য আত্মহত্যা একটি মানসিক রোগ। তাই প্রাণ খুলে হাসুন, বুক ভরে নি:শ্বাস নিন, শত ব্যস্ততার মাঝেও দিনে অন্তত ২০ মিনিট হলেও নিজের জন্য বাঁচুন।

বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখে প্রায় ১২৮ জন ব্যক্তি আত্মহত্যা করে এবং প্রায় ২৮১ জন ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকে। আত্মহত্যায় মৃত ব্যক্তিদের প্রায় ৮৯ ভাগ নারী এবং ২১ ভাগ পুরুষ। নারীদের মাঝে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অবিবাহিত নারীদের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে ভার্চুয়াল লাইফের প্রতি ঝুঁকে পরার কারণে মানুষ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে স্ট্যাটাস দিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। আত্মহত্যার পূর্বে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার মাধ্যমে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষটি সামাজের প্রতি তার অভিমানের জানান দিয়ে যায়। মানুষ সত্যি বড় অভিমানী প্রাণী, হয়তো, শেষ মুহুর্তে আশা করে কেউ ভালোবাসা অথবা স্নেহ-মমতা পূর্ণ হাত বাড়িয়ে দেবে! কিন্তু, বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। বাংলাদেশে আত্মহত্যায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হচ্ছে ঝিনাইদহের শৈলকূপা অঞ্চল। বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৬ মোতাবেক, আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীর জন্য সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদন্ডের বিধান রয়েছে এবং দন্ডবিধি ৩০৯ মোতাবেক, আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর এক বছর কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পরে যে, তাকে কারাদন্ড নয় বরং যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা বা চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা অধিক জরুরি। নিজে সচেতন হোন, অপরকেও সচেতন হতে সাহায্য করুন, প্রয়োজনে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আত্মহত্যা

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ