Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

আইএস জিহাদির শিশু নিয়ে ইয়াজিদি এক নারীর নিজের সংসারে টানাপোড়েন

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১ আগস্ট, ২০১৯, ৮:০৮ পিএম

"অ্যাডামের ছিল সোনালী চুল ও সবুজ চোখ। দেখতে সে তার অন্য ভাই বোনদের চেয়ে আলাদা ছিল। তার প্রথম কান্নার আওয়াজ শোনার পর থেকেই আমি তাকে ভালবেসে ফেলি," বলেন তার মা জোভান।

কিন্তু অ্যাডামের পিতা আইএস জিহাদি আবু মুহাজিরের হাতেই বন্দী ছিল তার মা ইয়াজিদি নারী জোভান। তাদের ঘরে জন্ম হয় অ্যাডামের।

যুদ্ধে আবু মুজাহির মারা গেলে জোভান তার নবজাতককে নিয়ে ফিরতে চাইলেন নিজের সংসারে। কিন্তু পারলেন না। পরিবার ও সমাজের চাপে অ্যাডামকে হারালেন জোভান। হারালেন তার আগের সংসারও।

জোভান তার স্বামী খেদরের সাথে একটি গ্রামে বসবাস করতেন। এই গ্রামেই তিনি বড় হয়েছেন। তার স্বামী ও সংসার নিয়ে তিনি খুব সুখেই ছিলেন।

কিন্তু পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করেই তার জীবন আমূল বদলে যায়। সময়টা ছিল ২০১৪ সালের অগাস্ট মাস। কালো পতাকা উড়িয়ে দুটো গাড়ি সেদিন তাদের গ্রামে এসে পৌঁছালো।

জোভান ও খেদর বুঝতে পারছিলো না গ্রামে কী হচ্ছে কিন্তু ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল যে তাদের সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। গাড়িতে করে যে লোকগুলো এসেছিল তারা ইসলামিক স্টেটের জিহাদি।

এই গ্রুপের কোন কোন মুখ তাদের পরিচিত ছিল। তাদের কেউ কেউ পাশের গ্রামের ছেলে যাদেরকে তার স্বামী খেদর চিনতেন।

তারা তখন তাদের জোর করে একটি গাড়িতে তুলে সিঞ্জার উপত্যকায় নিয়ে যায়। তাদের সাথে ছিল আরো ২০টির মতো পরিবার।

পরে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকের রাজধানী বাগদাদের কাছের একটি শহরে। এর পাঁচ মাস পর আই এস জঙ্গিরা তাদেরকে নিয়ে যায় জোভান ও খেদরের গ্রামের কাছে মসুল শহরে।

সেসময় ওই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তখন আই এসের ওই গ্রুপের নেতা খেদরকে বলেন তাদেরকে বুঝিয়ে গ্রামে ফিরিয়ে আনতে।

"আমরা সবাইকে বলেছিলাম যে তাদের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু কেউ একথা বিশ্বাস করেনি," বলেন খেদর।

গ্রামবাসীরা জানতো আই এস যোদ্ধারা যেসব পুরুষকে তুলে নিয়ে যেত তারা যদি কোন কাজের না হয় তাহলে তাদের মেরে ফেলা হয়।

যারা মাউন্ট সিঞ্জারে পালিয়ে গিয়েছিল তারা সেখানে আটকা পড়ে গেল। তাদের ছিল না খাবার পানি। ছিল প্রচণ্ড গরম। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শত শত মানুষ মারাও গিয়েছিল।

কিন্তু যারা পাহাড়ে যায় নি তাদেরকে ধরে নিয়ে গেল আই এস। সেসব পরিবারের সদস্যরা ছিটকে পড়লো এদিকে সেদিকে। ছেলেদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। আর নারীদের নিয়ে যাওয়া হলো যৌন-দাসী হিসেবে। আর যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে রাজি হলো না তাদের হত্যা করা হলো।

আই এস ঠিক কতজন ইয়াজিদিকে অপহরণ করেছে তার কোন হিসেব নেই কারো কাছে। তবে জাতিসংঘের এক হিসেবে বলা হচ্ছে, সেসময় সিঞ্জারে চার লাখ ইয়াজিদি বসবাস করতো। তাদের মধ্যে কয়েক হাজারকে হত্যা করা হয় এবং সাড়ে ছয় হাজারের মতো ইয়াজিদিকে দাস বানিয়ে তাদের ধর্ষণ করা হয়, নির্যাতন চালানো হয় এবং তাদের অনেককে বিক্রি করে দেওয়া হায়।

জোভানের সাথে ছিল তার তিনটি সন্তান। তাদের একটি লরির পেছনে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় আইএস খেলাফতের তথাকথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা শহরে। পরের চার বছর জোভানের সাথে তার স্বামী খেদরের আর দেখা হয়নি।

জোভান ও তার সন্তানদের রাখা হয় একটি তিনতলা বাড়িতে। সেখানে ছিল আরো দেড় হাজারের মতো নারী ও শিশু। তাদের অনেকেই জোভানের পরিচিত ছিল।

এক পর্যায়ে জোভানকে বলা হলো কোন আই এস যোদ্ধার কাছে তাকে তুলে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত তাকে দেওয়া হলো আবু মুহাজির আল তিউনিসি নামের এক যোদ্ধাকে যে তিউনিসিয়ার নাগরিক ছিল। সে ছিল শীর্ষস্থানীয় একজন কমান্ডার।

জোভানকে তখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাকে বিয়ে করতে বলা হয়। এরপর জোভান সারা দিন ধরে শুধু কাঁদতো। তিন তিনবার পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়। প্রত্যেকবারই সে আবু মুহাজিরের হাতে ধরা পড়ে।

"একসময় আমার আত্মহত্যা করার কথাও মনে হয়েছিল। কিন্তু সন্তানদের কথা ভেবে সেটা করতে পারিনি।"

জোভান বুঝতে পারলেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তার আর উপায় নেই।

আই এসের যে জঙ্গির হাতে জোভান বন্দী ছিলেন তার সম্পর্কে তিনি খুব বেশি বলতে পারেন নি। তবে তিনি বলেছেন যে আই এসের সেই যোদ্ধা তাদের সবাইকে দেখভাল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

অথচ বেশিরভাগ পরিবারেই বাচ্চাদেরকে তাদের মায়েদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। ছেলেদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আর মেয়েদেরকে ব্যবহার করা হতো যৌন কাজে ও বাড়ির কাজের লোক হিসেবে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মধ্যপ্রাচ্য


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ