Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০২ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ সফর ১৪৪১ হিজরী

বর্ষার প্র্রেমের কবিতা : কালিদাস ও অন্যান্য

সু ম ন আ মী ন | প্রকাশের সময় : ২ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

কালিদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্য প্রাচীন নগরী, দেশ ও পর্বতের চিত্র এঁকেছেন নিপূনতায়। যক্ষের কাছ থেকে বারতা নিয়ে মেঘ নানান দেশ, নদী পেরিয়ে প্রিয়ার কাছে পৌঁছে। নতুন মেঘ দর্শনে মানুষের মনে প্রেমের স্ফুরণ ঘটে

অপরূপ রূপ বৈচিত্রের দেশ বাংলাদেশ। প্রকৃতি উজাড় করে সাজিয়েছে এই দেশ। এর সবুজ বন-বনানী, বয়ে চলা নদী, নদীতে পাল তোলা নৌকা, মাঠে মাঠে সোনার ধান, পাহাড়, সুনীল আকাশ প্রভৃতি একজন মানুষকে কবি, ভাবুক, বাউল বানাতে যথেষ্ট। বাংলাদেশের ঋতু বৈচিত্র অতুলনীয়। ছয় ঋতুর আবর্তনে এই দেশ এক এক সময় এক এক রূপ নিয়ে হাজির হয়। গ্রীষ্মের তাপদাহে মানুষ যখন অতীষ্ট তখনই বর্ষা আসে প্রশান্তির অবিরল ধারা নিয়ে। বর্ষা বাঙ্গালীর প্রিয় ঋতু। বিরহের ঋতু। আর এই বর্ষা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক কাজ হয়েছে। বিশেষ করে বাংলা কবিতায় প্রাচীন সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যে পর্যন্ত বর্ষা তার স্বমহিমায় অবস্থান করে আছে।

প্রাচীন সাহিত্যে বর্ষাকে বিরহের ঋতু হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। কারন বর্ষা আসার সাথে সাথে পথঘাট ও মাঠ প্রান্তর বর্ষার জলে ডুবে যায়। চলাচল হয়ে যায় দুর্গম। প্রবাসী স্বামীরা তাই বর্ষার আগেই বাড়ি চলে আসে। কিন্তু কেউ যদি বাড়ি আসতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাকে পুরো সাত আট মাস নিঃসঙ্গতার মধ্যদিয়ে কাটাতে হয়। আর এই কারনেই বাংলা সাহিত্যে প্রচুর প্রেম ও বিরহের কবিতা সৃষ্টি হয়েছে।

বর্ষাকে বিরহের আবহে প্রথম চিত্রিত হাতে দেখি সংস্কৃত কবি কালিদাসের কবিতায়। কালিদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যগ্রন্থে যক্ষের বিরহ বার্তা, যক্ষ প্রিয়ার বেদনা, কুবেরের অভিশাপ আর মেঘের দৌত্য অভিযান কে অভিনব কাব্যিক রূপে সাজিয়েছেন। বাংলা ভাষার কবি না হয়ে ও কালিদাস আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। আর বাংলার ভাষার ঋন সংস্কৃতের কাছে অপূরণীয়। বাংলা ভাষার ‘মেঘদূত’ অনূদিত হয়ে আসছে শত শত বছর পূর্ব থেকেই। বর্ষা যেন বাংলার চিরন্তন ঋতু। আর অনুবাদ যদি কোন প্রকৃত কবির হাতে হয়ে থাকে তাহলে তার রস শেষ না হয়ে আরো বৃদ্ধি পায়। আদর্শ অনুবাদ যেন একটি স্বচ্ছ কাঁচ যার মধ্য দিয়ে আমরা শিল্পটিকে দেখি দু চোখ মেলে; এবং স্বচ্ছতা এত বেশি যে কাঁচের অস্তিত্ব সম্পর্কেই আমাদের কোন খেয়াল থাকে না। ফরাসী একটি প্রবচন আছে- অনুবাদ যেন একজন নারী যদি রুপসী হয় তাহলে বুঝতে হবে সে অবশ্যই অসতী, আর যদি বিশ্বস্থ হয় তাহলে কু রুপা। বাংলা ভাষায় প্রথম ‘মেঘদূত’ ছন্দোবন্দ অনুবাদে হাত দেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৫৯খ্রিঃ তিনি ‘মেঘদূতের’ বঙ্গানুবাদ করেন।

ভারতীয় সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র বিশ্বনন্দিত সংস্কৃত মহাকবি কালিদাস। তিনি আর ব্যক্তি জীবন-পরিচয় কোথাও লিপিবদ্ধ করেন নি। ‘মেঘদূত’ এর রঘু বংশের প্ররাম্বে কবির শঙ্কা- ত্রিভুবনখ্যাত যে সূর্য বংশের গৌরব মহিমা বর্ণনায় বাল্লীক পেয়েছেন অপরিমিত সাফল্য, সেই উঁচু চূড়ার উপরে উঠার ক্ষমতায় মন্দ কবিযশ: প্রার্থী বামনসদৃশ অপটু কালিদাস কি উপহাসাস্পদ হবে ভভিষ্যতের কাছে? কত বিনয়ী তার আত্মপ্রকাশ। কালিদাস ছিলেন উজ্জয়নীর কবি। যে দূর্লভ নবরত্ন কিংবদন্তীখ্যাত বিক্রমাদিত্যের রাজসভা অলংকৃত করেছিল, কালিদাস ছিলেন তাদের একজন। মহারাজ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য উপাধী গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজত্বকাল ছিল ৩৮০-৪১৩ খ্রিঃ। পন্ডিত মহলের অভিমত, কালিদাস সম্ভ^বত চুতর্থ-পঞ্চশ শতাব্দীর কবি। কালিদাসকে নিয়ে শতশত লোক কাহিনী ছড়িয়ে আছে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। একদা যিনি ছিলেন নিরক্ষর, পরবর্তীকালে তিনিই হন কিংবদন্তী। কোন একদিন কালিদাস যে ডালে বসেছিলেন, সেই ডালটিকেই কাটছিলেন। এই নিবোর্ধ লোকটিকে ধরে আনা হয় বারাণসীর রাজকন্যার স্বয়স্বর সভায়। বহু রাজপুত্র ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে বারে বারে রাজকন্যার প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে। বিরক্ত রাজপুরুষরা তাই এবার সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে এনেছে। রাজকন্যার তিনটি প্রশ্ন ছিল- বেশি শক্তি কার, দ্বন্দহয় কাদের মধ্যে, সবচেয়ে মধুরতম কী? কালিদাস চুপ থাকলেন। তারপর উত্তর দিলেন বেশি শক্তি হল ভয়, দ্বন্দঘনায় দুইয়ের মধ্যে, মধুরতম বস্তু হল প্রণয়। উত্তর দিতে সফল হওয়ায় রাজকন্যার সাথে তার বিয়ে হল। কিন্তু বাসর ঘরেই রাজকন্যা তার ভুল বুঝতে পারলেন, যখন কালিদাসের মুখে ‘উস্ট্র’, কে উট্র উচ্চারণ হতে দেখলেন। পরে তাকে গভীর অরন্যে নির্বাসন দেয়া হয়। অনেক পরে কালিদাসের কবিখ্যাতি যখন গগনস্পর্শী, তখন স্বামী-স্ত্রীর মিলন হয় দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর। কালিদাস ছিলেন রুপবান ও নারীসঙ্গ পিয়াসী। তিনি নিহত ও হয়েছিলেন জনৈকা বারবিলাসীনির গৃহে। তার বিখ্যাত চারটি কাব্য গ্রন্থ হল “ঋতুসংহারম”, “রঘুবংশম”, “কুমারসম্ভব” “মেঘদূতম”। নাটক তিনটি হলো- মালবিকাগ্নিমিশ্রম, বিক্রমোর্বশীয় ও অভিজ্ঞান- শকুন্তলম।

মেঘদূতের যক্ষ বর্ষার সমাগমে প্রেয়সী ভার্যার দেহ পায়নি সুখ শয্যার মধ্যে, তাইতো ধ্যানের জগতে পেয়েছে মানস চিরন্তন রূপে; অভিশাপ হয়েছে আশীবার্দ, দূরে থাকার বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছে স্বপ্ন ময়তায়। মেঘ কে দূত করে প্রেয়সীর কাছে পাঠিয়েছিলেন প্রাচীন চীনা কবি স্যু-কান।
কালিদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্য প্রাচীন নগরী, দেশ ও পর্বতের চিত্র এঁকেছেন নিপূনতায়। যক্ষের কাছ থেকে বারতা নিয়ে মেঘ নানান দেশ, নদী পেরিয়ে প্রিয়ার কাছে পৌঁছে। নতুন মেঘ দর্শনে মানুষের মনে প্রেমের স্ফুরণ ঘটে। মেঘদূতে তাই দেখি-
নব মেঘ সন্দর্শনে সুখিদের ও সৌম্যমনে অন্যভাব সহসা ঘনায়
কন্ঠাশ্লিষ্ট কান্তা যার দূরে দুরে থাকে, দশা তার আর বুঝিবে কি হায়?

(পূর্বমেঘ/ ৩য়সর্গ)
মেঘ অলকা পূরীতে যাত্রাকালে যে সব সৌন্দর্য অবলোকন করবে তার ছবি এমন। ---
নব পথে যাবে যবে প্রোষিতভর্তৃকা সবে লোচনাগ্রে পতিত অলক
উত্তোলিয়া তব পানে চাহিবে প্রেমের টানে; তুমি প্রিয়-বার্তা-সংবাহক।
(পূর্বমেঘ)

প্রিয়ার কুশলাদী জানার জন্য উদগ্রীব যক্ষ। মেঘকে তাই শিঘ্রই ফিরে আসার জন্য যে আকুলতা তা সত্যিই অতুলনীয়।
প্রথম বিরহ তাপে শোকাতুর প্রিয়া যাপে, তারে শিঘ্র শান্তনা দানিয়া,
এ্যম্বকের বৃষভের শৃঙ্গাহত কৈলাসের ভীতিভরা সানুদেশ দিয়া
দ্রুত প্রত্যাবৃত্ত হয়ে কান্তার কুশল লয়ে, রক্ষ মেঘ, দূর্ভর জীবন;
বিরহের যে প্রাণ মম প্রভাতের কুন্দসম হোলো হায়, শিথিল বন্দন।
(উত্তর মেঘ/ শ্লোক-৫২।)

মেঘদূতের চিরন্তন প্রেম পিয়াসা বাংলা কবিতার কবিদের নানাভাবে প্রভাবিত ও মুগ্ধ করেছে।
মেঘদূত নিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্লেষণ-

“মেঘদূতে যক্ষের বিরহ নিজের দুঃখের টানে স্বতন্ত্র হয়ে একলা কোনে বসে বিলাপ করছে না। বিরহ দুঃখেই তার চিত্তকে নববর্ষায় প্রফুল্ল পৃথিবীর সমস্ত নদনদী- অরণ্য- নগরীর মধ্যে পরিব্যপ্ত করে দিয়েছে। মানুষের হৃদয় বেদনাকে কবি সংকীর্ণ করে দেখাননি, তাকে বিরাটের মধ্যে বিস্তৃর্ণ করেছেন; এজন্যই প্রভুশাপগ্রস্ত একজন যক্ষের দুঃখ বার্তা চিরকালের মতো বর্ষা ঋতুর মর্মস্থান অধিকার করে প্রণয়ী হৃদয়ের খেয়াল কে বিশ্ব সংগীতের ধ্রুপদে এমন করে বেঁধে দিয়েছে”। (অসমাপ্ত)



 

Show all comments
  • Whidurnobi ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১০:০৯ পিএম says : 0
    ভালো হয়েছে অনেক গুড ভাইয়া
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন