Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭ আশ্বিন ১৪২৭, ০৪ সফর ১৪৪২ হিজরী

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা

| প্রকাশের সময় : ৬ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের দুই অঙ্গরাজ্যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৩২ জন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন ৩০ জন। এদের মধ্যে রয়েছে ছোট্ট শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে মেক্সিকো সীমান্তবর্তী টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি শপিং মলে। অন্যটি ওহাই অঙ্গরাজ্যের ডেটন শহরের একটি পানশালায়। এই হামলাকে বিশ্লেষকরা ‘শ্বেতসন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। টেক্সাসের হামলাকারি ২১ বছর বয়সী প্যাট্রিক ক্রুসিয়াস এ বছরের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হামলাকারি বেন্টনের অনুসারী বলে মন্তব্য করেছে এফবিআই। তারা মনে করছেন, ক্রাইস্টচার্চে হামলার আগে ব্রেন্টন যেভাবে অনলাইনে বর্ণবাদী ও মুসলমান বিদ্বেষের কথা উল্লেখ করে ইশতেহার প্রকাশ করেছে, তেমনি সন্ত্রাসী ক্রুসিয়াসের হামলার ১৯ মিনিট আগে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে ‘দ্য ইনকনভিনিয়েন্ট ট্রুথ’ শিরোনামে ঘৃণায় ভরা অভিবাসনবিরোধী একটি ইশতেহার। এর সাথে ক্রুসিয়াসের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। ওহাইওর হামলার পেছনেও একই কারণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশ ক্রুসিয়াসকে গ্রেফতার করেছে এবং ওহাইর হামলাকারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এসব ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্যুইট করে নিন্দা জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বিগত তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ঘটনাটি ঘটে ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর লাস ভেগাসে একটি জনাকীর্ণ কনসার্টে। ৬৪ বছর বয়স্ক এক মার্কিন নাগরিক বন্দুক নিয়ে হামলা চালিয়ে ৫৮ জনকে হত্যা করে। এছাড়া ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের একটি গির্জায়, ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার এক হাইস্কুলে, এ বছরের ৩১ মে ভার্জিনিয়া বিচের একটি পৌরভবনে হামলা চালিয়ে মোট ৫৪ জনকে হত্যা করা হয়। বলা হয়ে থাকে এসব হত্যাকান্ডের পেছনে হামলাকারিদের উগ্রবাদ এবং ‘শ্বেতসন্ত্রাস’ মনোভাব রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম হাতিয়ার ছিল ‘বর্ণবাদ’ এবং ‘অভিবাসনবিরোধী’ বক্তব্য। সে সময় তিনি স্পষ্টতই বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শ্বেতাঙ্গদের দেশ। নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শ্বেতাঙ্গদের দেশে পরিণত এবং যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছে তাদের বিতাড়িত করবেন। অভিবাসন ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেবেন। তখন তার এসব কথা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বলা বলে অনেকে মনে করেছিলেন। অনেক মার্কিন নাগরিক তার এসব কথার নিন্দাও করেন। তবে এতে উৎসাহী হয়ে উঠে যুক্তরাষ্ট্রে উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গদের সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যান বা (কে কে কে)। ট্রাম্পের হয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে শ্বেতাঙ্গদের দেশে পরিণত করার প্রচারণাও চালায়। ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প তার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তৈরি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী বহুজাতির অভিবাসনের দেশের চরিত্র বদলে ফেলতে শুরু করেছেন। নতুন করে অভিবাসনবিরোদী নীতি তৈরি করেছেন। এতে দেশটির শ্বেতাঙ্গরা যেমন প্রশ্রয় পাচ্ছে তেমনি তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন সময়ে শ্বেতসন্ত্রাস চালিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করে চলেছে। শ্বেতসন্ত্রাস বা বর্ণবাদের উত্থান শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে নরওয়ের এক বর্ণবাদ ও শ্বেতসন্ত্রাসে বিশ্বাসী হয়ে এক ব্যক্তি গির্জায় হামলা চালিয়ে অনেক লোককে হত্যা করে। এছাড়া বেলজিয়ামসহ অন্যদেশগুলোতেও প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তার মিত্ররা যুগের পর যুগ ধরে মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য জঙ্গী অজুহাতে মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রিকার মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতে নিরন্তর হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের আক্রমণে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ার মতো সমৃদ্ধশালী দেশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনো সিরিয়ায় আইএস দমনের নামে হামলা চালিয়ে শত শত মুসলমানকে হত্যা করা হচ্ছে। ভারতে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ, হত্যা ও নিপীড়ন-নির্যাতন সীমাছাড়া হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর মুসলমানবিরোধী ও নিধন নীতির প্রভাবই তাদের দেশের একশ্রেণীর নাগরিককে উগ্রবাদী হতে উৎসাহী করে তুলছে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে এবং টেক্সাসে হামলাকারির হামলার নেপথ্য লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে এটাই প্রতীয়মাণ হচ্ছে। অর্থাৎ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের স্বার্থে জঙ্গী সৃষ্টি করে এবং তা নিধনের নামে মুসলমান দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তার প্রভাব এখন তাদের দেশের উগ্রবাদীদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। বিষয়টি অনেকটা বুমেরাং হয়ে পড়েছে। তাদের অপনীতিই তাদের দেশে প্রয়োগ শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদেশগুলো যদি সম্মিলিতভাবে তাদের অভিবাসনবিরোধী ও বর্ণবাদ নীতির পরিবর্তন না ঘটায়, তবে তাদের দেশের অভ্যন্তরে এ ধরনের উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বাড়তেই থাকবে। কয়েক বছর আগেও দেখা যেত, এ ধরনের হামলা ঘটলে হামলাকারির পরিচয় পাওয়া যেত না এবং তার দায় আল কায়দা বা মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হতো। বলা হতো মুসলমান জঙ্গীরা হামলা চালিয়েছে। এখন এসব হামলার স্পটেই হামলাকারির পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে এবং তার হামলার নেপথ্য লক্ষ্য সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। হামলাকারী হামলার আগেই অনেকটা ঘোষণা দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। এখন এর দায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই নিতে হবে। এ থেকে উত্তরণের পথও তাদেরকেই বের করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে নীতি অবলম্বন করে চলেছে, এ নীতি না বদলালে যুক্তরাষ্ট্রকে যে ক্রমাগত তার অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষত-বিক্ষত হতে হবে, তাতে সন্দেহ নেই। তিনি কী করেন তাই এখন দেখার বিষয়। আমরা মনে করি, অভিবাসনবিরোধী হোক বা বর্ণবাদ হোক-কোনো উসিলায়ই নিরীহ মানুষকে হত্যা করা গর্হিত কাজ। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোকে তাদের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থেই নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন