Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

পবিত্র রমজান মাসে আমাদের সিয়াম সাধনা সার্থক হোক

প্রকাশের সময় : ৯ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মোহাম্মদ আবদুল গফুর

বর্ষ পরিক্রমায় আমাদের দ্বারে পুনরায় ফিরে এসেছে মাহে রমজান। ফিরে এসেছে সিয়ামের বার্তা নিয়ে। ইসলামের যে পাঁচটি বুনিয়াদি ইবাদত রয়েছে তার অন্যতম সিয়ামে রমজান। রমজানের পূর্ণ এক মাস সুবেহ সাদেক থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সর্ব প্রকার পানাহার ও যৌনাচার থেকে বিরত থাকার সাধনা চালাতে হয় প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মুমিন মুসলমানকে। এই সিয়াম সাধনা নানা কারণেই অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবীদার।
ইসলামের বুনিয়াদী ইবাদতসমূহের মধ্যে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য অবশ্য পালনীয় ইবাদতের মধ্যে সালাত বিশেষ গুরুত্বের দাবীদার। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান থাকলেও দীর্ঘতম চার রাকাত নামাজ আদায় করতেও সাধারণত একটানা কয়েক মিনিটের অধিক সময় লাগে না। কিন্তু একটি সওম বা রোজা আদায় করতে ঋতুভেদে ১২ থেকে ১৭/১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সেই নিরিখে এক মাস ধরে পালনীয় রমজানের সওম বা রোজা হচ্ছে দীর্ঘতম সময় ধরে পালনীয় বুনিয়াদী ইবাদত।
সিয়ামে রমজানের পূর্ণ এক মাস দিনের বেলায় এই দীর্ঘ সময় ধরে বৈধ পানাহার ও বৈধ যৌনাচার থেকেও বিরত থেকে মুমিন মুসলমান সংযমের যে কঠিন পরীক্ষা দেয় তাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশেষ গুরুত্ব দেন। কারণ রোজাদার যে দীর্ঘ ১৭/১৮ ঘণ্টা পানাহার থেকে বিরত থাকে, তার মধ্যে এমন অনেক সময়ই আসে, যখন সে ইচ্ছা করলেই লোকচক্ষুর আড়ালে তার ক্ষুধা নিবারণ করে নিতে পারে। কিন্তু তা যে সে করে না তার কারণ সে বিশ্বাস করে কোনো মানুষ না দেখলেও সর্বদ্রষ্টা আল্লাহতায়ালা তা দেখবেন। এ কারণে আল্লাহতায়ালা বলেন, রোজাদার রোজা রাখে শুধু আমার জন্য। সুতরাং তার রোজার পুরস্কার আমি নিজে দিয়ে থাকি।
এ তো গেল সিয়ামের ফজিলতের দিক। এর সামাজিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যও মোটেই কম নয়। ঋতুভেদে ১২ থেকে ১৭/১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বৈধ পানাহার থেকে বিরত থেকে যে কাজটির মাধ্যমে রোজাদার প্রাকৃতিক বা ফিতরাতী জীবন ধারায় ফিরে আসে তার নাম ইফতার। ইফতার শব্দটি এসেছে ফিতরাত থেকে। যার অর্থ প্রকৃতি। ইফতারের মাধ্যমে রোজাদার ফিতরাতী তথা প্রাকৃতিক জীবন ধারায় ফিরে আসায় রোজাদারদের মধ্যে যারা ধনী, তারাও অর্থাভাবে যেসব দরিদ্র মানুষ বছরের অধিকাংশ দিন ভুখা থাকতে বাধ্য হয় তাদের দুর্ভাগা জীবনের ব্যথা-বেদনা হৃদয়ঙ্গম করতে সমর্থ হয়। এ কারণে ইফতারে যত বেশি লোককে শরিক করানো যায় তত বেশি ছওয়াব পায় রোজাদার।
একই কারণে রমজানের সারা মাস শেষে উপবাস ভঙ্গের বার্ষিক উৎসব হিসেবে ইসলামে বিধান রয়েছে ঈদুল ফিতর পালনের। শুধু তাই না, এ দিন যাতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই সাম্য-ভ্রাতৃত্বের এ মহান উৎসবে একাত্ম হতে পারে, সে লক্ষ্যে ঈদুল ফিতর নামাজের আগেই ধনীদের পক্ষ থেকে দরিদ্রকে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা দানের বিধান রয়েছে ইসলামে। এই সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা ধনীদের স্বেচ্ছামূলক দয়ার দান নয়। এটা দরিদ্রের হক বা অধিকার এবং ধনীদের জন্য অবশ্য পালনীয় একটি কাজ।
একইভাবে ধনী মুসলমানরা সাধারণ রমজানের মধ্যে জাকাত দেয়াকে তাদের অন্যতম অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বিবেচনা করে থাকে। এই জাকাতও তাদের স্বেচ্ছাধীন দান-খয়রাত নয়, এটা ধনীদের অবশ্য পালনীয় বা বাধ্যতামূলক কাজ এবং দরিদ্রদের অধিকার। কোনো রাষ্ট্র ইসলামী আদর্শে পরিচালিত বলে দাবি করতে চাইলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধনীদের নিকট থেকে জাকাত আদায় ও দরিদ্রদের মধ্যে তা বণ্টনের সুব্যবস্থা করা সে রাষ্ট্রের দায়িত্বের অন্তর্গত বিবেচনা করতে হবে।
এ আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রমজানের সিয়াম সাধনার যেমন রয়েছে সামাজিক তাৎপর্য, তেমনি রয়েছে ব্যক্তিগত ও আত্মিক তাৎপর্য। রমজান শব্দ এসেছে ‘রমজ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়া। প্রতিটি মানুষের মধ্যে যে ‘অহম’ বোধ থাকে তাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়ে মহান ¯্রষ্টার ইচ্ছার কাছে আত্মসমপর্ণের যে বিধান দেয় ইসলাম, তার শিক্ষা পাই আমরা সিয়ামের রমজানের মধ্যে। তাই একদিকে আমরা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যেমন সামাজিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ হই, তেমনি নিজের মধ্যকার অহম চেতনা ধ্বংস করে আল্লাহমুখী হওয়ার মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণের দুর্লভ সুযোগ লাভ করি। যদি আমরা এ দৃষ্টিভঙ্গিতে সিয়াম সাধনা না করি, তাহলে আমাদের সিয়াম সাধনা কতটুকু সার্থকতা লাভ করবে সে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মুসলিম অধ্যুষিত এ বাংলাদেশে রমজান মাসে যে দৃশ্য আমরা দেখতে পাই, তা ইসলামের মহান আদর্শের সাথে খুব কমই সঙ্গতিশীল। রমজান মাস আসার সাথে সাথেই যেসব পণ্য রোজাদারদের রোজা পালনে অধিক ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যেমনÑ ছোলা, পিয়াজ, খেজুর ইত্যাদিÑ এসবের মূল্য হু হু করে বেড়ে যায়। অথচ শতকরা ৯২ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এদেশে রমজানে এসব পণ্যের মূল্য যাতে না বাড়ে তার নিশ্চয়তা থাকা উচিত ছিল। অবশ্য অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নেতারা রমজানের প্রাক্কালে এবারও আশ্বাস দিয়েছিলেন, রমজান উপলক্ষে কিছুতেই সংশ্লিষ্ট পণ্যসমূহের মূল্য বৃদ্ধি হতে দেয়া হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সে আশ্বাস অর্থহীন প্রমাণিত হয়েছে। আরো দুঃখজনক এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়পুষ্ট সিন্ডিকেটই দায়ী বলে জানা গেছে।
এসবের পাশাপাশি রয়েছে বিনা ভোটে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের অন্যায় শাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিথ্যা অভিযোগে বিরোধী নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার ও হত্যা অভিযান এবং সরকারি মাস্তানদের দৌরাত্ম্য, পবিত্র রমজান মাসেও অব্যাহত রয়েছে। শুধু তাই নয়, ইসলামী আদর্শ সমর্থনের অপরাধে সংশ্লিষ্টদের শাস্তিদানের পালা পবিত্র রমজান মাসেও অব্যাহত রয়েছে। একদিকে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার ও হত্যা অভিযান, অন্যদিকে সরকার সমর্থক মাস্তানদের সাহায্যে জাতীয় পর্যায় থেকে উপজেলা হয়ে ইউপি পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতার বিস্তার সাধন করে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকার বাংলাদেশে যে নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তাতে মহাখুশি হয়েছে বিশ্বের তাবৎ মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্র।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ বাংলাদেশে বসে আমাদের পবিত্র রমজান মাসে যে দৃশ্য দেখতে হচ্ছে তাতে বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়েই ভাবিত হয়ে উঠতে হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত যে, পবিত্র কোরআনের বাণী মিথ্যা হওয়ার নয়।
বিশ্বের মুসলিমবিরোধী অপশক্তিসমূহের আশীর্বাদ ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে জালেম শক্তি জগদ্দল পাথরের মতো এ দেশের জনগণের ওপর চেপে বসলেও সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এদেশে সর্বশক্তিমান আল্লাহর বিধান কার্যকর হবে। পবিত্র রমজান মাসে এটা শুধু আমাদের প্রত্যাশা নয়, আন্তরিক বিশ্বাসও।
কারণ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠার পেছনে যেমন রয়েছে এদেশের লক্ষ-কোটি তৌহিদী জনতার হাজার বছরের মুক্তি সংগ্রাম, তেমনি এদেশের মাটির তলে শায়িত রয়েছেন সুদূর অতীতের অসংখ্য ফকীর, দরবেশ, ইসলাম প্রচারকÑ যাদের মাধ্যমে এদেশের সেকালের জাতিভেদ -লাঞ্ছিত সমাজের মুক্তিকামী গণমানুষেরা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাদের সেদিনের সে মুক্তি স্বপ্ন ব্যর্থ করে দেয়ার শক্তি নেই ইসলামবিদ্বেষী বিদেশি অপশক্তির আশীর্বাদপুষ্ট কোনো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর।
পবিত্র রমজান মাসে সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার কাছে এদেশের লক্ষ-কোটি তৌহিদী জনতার মাত্র একটাই মোনাজাতÑ এদেশের হাজার বছরের গণমানুষের মুক্তি সংগ্রাম ব্যর্থ করে দিতে চায় এমন কোনো ইসলামবিদ্বেষী সা¤্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যবাদী অপশক্তির ষড়যন্ত্র যেন এদেশে কখনো জয়যুক্ত না হয়। এদেশে গণমানুষের তৌহিদী ঝা-া যেন চিরকাল সগৌরবে উড্ডীয়মান থাকে। পবিত্র রমজান মাসে আমাদের সিয়াম সাধনা যেন সার্থক হয়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।