Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৭ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

সাপ থেকে সাবধান

ডা: মাও: লোকমান হেকিম | প্রকাশের সময় : ৯ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এ দেশের প্রকৃতিতে লাগে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এখন বর্ষা, বর্ষার পানিতে লোকালয়ে পানি ডুকে পড়েছে। জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ বাঁচার তাগিদে বাগান, গাছ- গাছালি এবং গর্ত থেকে বেরিয়ে আশ্রয় খুঁজছে। এমনকি মানুষের ঘরে এসে আশ্রয় নেয়। অনুরূপ সাপও এই সুযোগটি নেয়, এই সাপ মাঝে মধ্যে মানব শরীরে কামড় বসায়। এ সম্পর্কে সতর্ক করতে এই প্রতিবেদন- আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই। শুধু তাই নয়, একটু খোঁজ নিলেই দেখতে পাবেন মানুষ তার সুস্থতার জন্য জীবনের সব অর্থ ব্যয় করতেও রাজি। এই সব কিছুর থেকে কি একটু বেশী সচেতন হলে হয় না।
পৃথিবীতে তিন হাজার ৫০০ প্রজাতির সাপ আছে, কিন্তু এগুলোর মধ্যে শুধু ২৫০ প্রজাতি হলো বিষধর সাপ। যার মধ্যে আবার সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশে আছে ২১৬ প্রজাতির সাপ এবং এদের মধ্যে শুধু ৫২ প্রজাতি হলো বিষধর। তাহলে আসুন, একটু দেখে নেয়া যাক কিভাবে চিনব এই বিষধর সাপগুলো-* বিষধর সাপের মাথার ওপরের ডোরাগুলো হবে ছোট ছোট (সাধারণত) * পেটের ডোরাগুলো হবে তুলনামূলক বড়। * দাঁত থাকবে দু’টি এবং লম্বা প্রকৃতির (বিষহীন সাপের দাঁত অবশ্যই কয়েকটা থাকবে এবং ছোট প্রকৃতির) * লেজ হবে চ্যাপটা ধরনের* সাধারণত এরা চলাচল করে রাতে।
সাপের বিষ কী? আমরা যখন খাবার খাই তখন আমাদের মুখ থেকে এক ধরনের লালা নিঃসৃত হয়, যা খাবার হজম হতে সাহায্য করে। ঠিক তেমনি সাপ যখন খাবার খায় তখন সাপের এই খাবার হজম যে রসের মাধ্যমে হয় অর্থাৎ সাপের লালাই হচ্ছে বিষ। কিন্তু সাপের লালা শুধু খাদ্য হজমেই সাহায্য করে না, এটি সাপের অন্যতম একটি প্রতিরোধব্যবস্থা, যা সে বিভিন্ন আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে ব্যবহার করে।
সাপের কামড় কখন মারাত্মক? যেহেতু সাধারণ প্রক্রিয়ায় সাপ তার খাদ্য হজমের জন্য এই বিষ উৎপাদন করে তাই সাপের খালি পেটে এই লালা জমা থাকে সবচেয়ে বেশী। আর যখন সাপ খাদ্য গ্রহণ করে তখন তার এই লালা খরচ হয়ে যায়। কাজেই সাপের কামড় তখনই বেশী মারাত্মক হবে যখন সে অনেকক্ষণ না খাওয়া অবস্থায় থাকে। অর্থাৎ একটি সাপ কামড় দিলে যেখানে কতটকুু বিষ গেল তা সাপের ওপরই নির্ভর করে।
সাপে কামড়ালে প্রাথমিক চিকিৎসা- প্রথমত তাকে আশ্বস্ত করতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে সাপটি তাকে কামড়েছে সেটি বিষধর সাপ নাও হতে পারে। কারণ ভারতীয় উপমহাদেশে আছে ২১৬ প্রজাতির সাপ এবং সেগুলোর মধ্যে শুধু ৫২ প্রজাতি হলো বিষধর।
* যেখানে সাপটি কামড় দিয়েছে তার একটু ওপরে চাপ দিয়ে ধরতে হবে, তাহলে বিষ দেহে ছড়ানোর হার কমে যাবে।
* সাথে সাথেই যেখানে সাপটি কামড় দিয়েছে তার একটু ওপরে কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধতে হবে। বাঁধনটি ৩০ মিনিট পর পর ৩০ সেকেন্ডের জন্য খুলে দিতে হবে।
* যেখানে সাপটি কামড় দিয়েছে সেই হাত বা পা যতটুকু সম্ভব নড়াচড়া না করানো যায় সেটিই ভালে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সাপ যেখানে কামড় দেয় সেখানে কেটে রক্ত বের করার চেষ্টা করা হয়, কিন্ত এটা কখনো ঠিক নয়। কারণ এতে করে আশপাশের রক্ত সংবহনতন্ত্র বা স্নায়ুতন্ত্র কেটে যেতে পারে।
* কোনো অবস্থাতেই বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা ঠিক নয়। সাপে কামড়ানোর জায়গায় কোনো ধরনের ওষুধ বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা ঠিক নয়। বরং আপনি জায়গাটিকে সাবান বা আয়োডিন দিয়ে পরিষ্কার করতে পারেন।
সাপ সম্পর্কে কিছু সতর্কতা * রাতের বেলা যখনই বাইরে বের হবেন বিশেষ করে মেঠোপথে তখনই আপনার টর্চ লাইট সাথে নিন। কারণ বিষধর সাপ রাতের বেলায়ই বেশি চলাচল করে। * পানিতে সাপ দেখে ভয় পাবেন না, যদি পানিতে থাকা অবস্থায় কাউকে সাপে কামড় দেয় তবে ভয় পাওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। কারণ আপনি নিঃসন্দেহে ধারণা করে নিতে পারেন যে পানিতে সাপটি যখন কামড় দিয়েছে তখন তার বিষ শরীরে প্রবেশের আগেই পানিতে মিশে গেছে।
কিছু আশার কথা- * যতদ্রæত সম্ভব সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালে নিন। কারণ বর্তমানে সাপে কামড়ানো রোগীর জন্য পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিস্নেক ভেনোম সেরাম দেয়া হয়, যা যেকোনো সাপে কামড়ানোর জন্য ব্যবহার করা যায়। এই এন্টিভেনোম এখন বাংলাদেশেই তৈরী হচ্ছে। * বেশির ভাগ জেলা সদর হাসপাতালেই এখন এটি দেয়ার সুবিধা রয়েছে। কাজেই ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের দরকার নেই।
সবশেষে যা বলতে চাই তা হলো, সব সময় মনে রাখবেন বিষধর সাপের সংখ্যা খুবই কম। কাজেই রোগীকে আশ্বস্ত করুন তাকে যে সাপটি কামড়েছে সেটি বিষধর নাও হতে পারে। (যেন রোগী ভয়ে মারা না যায়, অনেক ক্ষেত্রেই সাপে কাটা রোগী মারা যাওয়ার কারণ ভয়।) সাপ সম্পর্কে আরও কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা- লেজ দিয়ে আঘাত: অনেকেরই ধারণা দারাঁশ (ঈড়ষঁনবৎ গঁপড়ংঁং) সাপ লেজ দিয়ে আঘাত করে এবং এই আঘাত যেখানে লাগে সেখানে পচন ধরে ইত্যাদি। কিন্তু এই ধারনা সত্য নয়।

চিকিৎসক-কলামিস্ট, মোবাইল- ০১৭১৬২৭০১২০।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন