Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।
শিরোনাম

রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে কঠোর পদক্ষেপ

অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা হবে : পরিবেশমন্ত্রী

রফিক মুহাম্মদ | প্রকাশের সময় : ১৬ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০২ এএম

আইনের সঙ্গে যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন : বাপা
বায়ুদূষণের জন্য রাজধানী ঢাকা এখন বিশ্বের মধ্যে আলোচিত শহর। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইপিএর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিশ্বে সবচেয়ে দ‚ষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আর বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের মধ্যে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ সব চেয়ে বেশি। আর এই রাজধানীর বায়ুদ‚ষণের জন্য এর আশপাশের ইটভাটাগুলো ৫৮ ভাগ দায়ী ।

রাজধানীর পরিবেশকে দ‚ষণের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। গত ৫ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে পরিবেশের দ‚ষণ রোধে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের সব ইটভাটা পরিবেশসম্মত উপায়ে বøক পদ্ধতিতে অর্থাৎ নির্দিষ্ট ছিদ্রযুক্ত ইট তৈরি করবে। প্রাথমিকভাবে চলতি বছরে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে ২০ শতাংশ ইটভাটায়। পরের বছর তা ৩০ শতাংশ ভাটায় কার্যকর করা হবে। আর ২০২৪-২৫ সাল নাগাদ ১০০ ভাগ ইটভাটায় এ পদ্ধতি কার্যকর হবে।

রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে রয়েছে ২ হাজারেরও বেশি ইটভাটা। এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়া প্রতিনিয়ত রাজধানীর বায়ুকে দূষণ করছে। আগামী আক্টোবর-নভেম্বর থেকে ইটভাটার মৌসুম শুরু হবে। বরাবরের মতো চলতি শীত মৌসুমের শুরুতে প্রায় সবগুলো ইটভাটায় ইট তৈরি শুরু হলে রাজধানীতে দ‚ষণের মাত্রা আরো বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে মানুষের রোগ-ব্যাধি। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে বেশি আক্রান্ত হবে। এ বিষয়টি সামনে রেখে আগামী মৌসুম শুরুর আগেই ইটভাটার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঢাকার আশপাশে যেসব অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে সেগুলো আগামী মৌসুমে চালু হতে দেয়া হবে না।

অবৈধ ইটভাটা বন্ধে চলতি বছর ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন আইন, ২০১৯’ বিল সংসদে পাস হয়েছে। লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ইটভাটা চালালে দুই বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান সংযোজন করে ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনে সংশোধনী এনে সংসদে পাস করা হয়েছে। এ ছাড়া এ আইনে ইটভাটায় মাটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ বিশেষ করে টপ সয়েলের ব্যবস্থা বন্ধ করা, ইটের বিকল্প বøক উৎপাদন ও ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, এখন থেকে আইনের কঠোর প্রয়োগ হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে, ফসলি জমি ধ্বংস করে এবং খাদ্যে হুমকি সৃষ্টি করে ইটভাটাগুলোকে এমন কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না। ঢাকার আশপাশে যেসব অবৈধ ইটভাটা আছে সেগুলো আর চলতে দেয়া হবে না। বৈধ ইটভাটাতেও এখন থেকে পরিবেশসম্মত বøক পদ্ধতিতে ইট তৈরি করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প থেকে দেশের আটটি শহরের বায়ুর মান প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাতে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা শহরের বায়ুর মান মারাত্মক ও খুব অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দ‚ষিত বায়ুর শহর হলো রাজধানী ঢাকা। এরপর রয়েছে রাজশাহী। বরিশাল সবচেয়ে কম দ‚ষিত শহর হলেও এর বায়ু মানমাত্রার চেয়ে খারাপ, অর্থাৎ আশঙ্কাজনক।
‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বে দ‚ষিত বায়ুর শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। শীর্ষে রয়েছে ভারতের দিল্লি। ঢাকার পরেই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। গত ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বে বায়ুদ‚ষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে। আর এই দ‚ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বলা হয়েছে। আর বায়ুদ‚ষণের কারণে শিশুমৃত্যুর হারের দিক থেকে পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

পরিবেশবিদরা বলছেন, রাজধানীর বায়ুদূষণের জন্য এর আশপাশের ইটভাটাগুলো দায়ী। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ধ্বংস করছে পরিবেশ। মাটি কেটে ইট তৈরি করায় একদিকে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। অন্যদিকে ইট পোড়াতে কাঠ ব্যবহারে উজাড় হচ্ছে বন। আবার ইটশিল্প দেশের গ্রিনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস হওয়ায় হুমকির মুখে মানুষের খাদ্যচক্র। তারপরও এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ড. আব্দুল মতিন বলেন, ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন আইন, ২০১৯’ বিল সংসদে পাস হয়েছে। তবে শুধু আইন হলেই তো হবে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকতে হবে। যারা আইনের প্রয়োগ করবেন তারাই যদি অবৈধ কাজে সহযোগিতা করেন তাহলে কঠোর আইন করে লাভ কি? রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা হতাশাজনক। ঢাকার আশপাশে শত শত অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে এগুলো বন্ধে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ইতঃপূর্বে নেয়নি। মাঝে মাঝে দু-একটিতে লোক দেখানো অভিযান চালালেও অনেকের অভিযোগ পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব ইটভাটা নির্বিঘেœ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই আইনের প্রয়োগ করতে হলে আগে তাদের শুদ্ধ হতে হবে।

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ