Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

দর বিপর্যয়ে দায় কার?

ট্যানারিগুলো আজ চামড়া কিনবে

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৭ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

এবার কোরবানির গরুর হাটে নানান বাহারি নামে পশু বিক্রি হয়েছে। মহারাজা, যুবরাজ, লালরাজা, তামিম রাজা, কালো মানিক আরো কত নানের আকর্ষণ। গাবতলী হাট থেকে ‘যুবরাজ’ নামের গরুটি ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে ক্রয় করেছেন ঢাকা সিটির এক মেয়রের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ভাতিজা। কোরবানির পর ওই যুবরাজের চামড়া তিনি কত টাকা বিক্রি করেছেন তা কেউ জানে না। একই রকম ৩০ লাখ, ২০ লাখ, ১০ লাখ, ৫ লাখ টাকা দিয়ে পশু কিনে যারা আল্লাহর নামে কোরবানি দিয়েছেন তারা সেই পশুর চামড়ার যথার্থ দাম কি পেয়েছেন?
চামড়ার বাজার দরপতন, চামড়া মাটিতে পুতে ফেলা, চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ীতে করে হাজার হাজার চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার পর সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমানো ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানির সিদ্ধান্ত ঠেকাতে মাঠে নামে। অতঃপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সরকার বেঁধে দেয়া দামে ১৭ আগস্ট থেকে চামড়া কেনার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে যদিও লাখ লাখ পিছ চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আজ (শনিবার) ট্যানারির মালিকরা আড়তদারদের কাছ থেকে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কিনতে শুরু করবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, চামড়া বেচা কেনায় কঠোর নজরদারি করা হবে। ট্যানারির মালিকরা সরকারের বেঁধে দেয়া দামে চামড়া কিনলে কাঁচা চামড়া রফতানির আদেশ প্রত্যাহার করা হতে পারে।

ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ‘পানির দামে’ বা নামমাত্র মূল্যে কেনা কোরবানির পশুর চামড়া এরই মধ্যে রাজধানীর আড়তগুলোতে মজুদ হয়েছে। চামড়ার প্রকৃত মালিকরা চামড়ার দান পাননি। মধ্যসত্ত্বভোগী আড়তদারদের হাতে এখন চামড়া।

বাণিজ্যসচিব মো. মোফিজুল ইসলাম বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ট্যানারির মালিকদের নিয়ে গত বুধবার জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করেছি। আমরা তাদের অতিসত্বর চামড়া কেনার আহ্বান জানিয়েছি। ট্যানারির মালিকরা আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৭ আগস্ট থেকে কোরবানির পশুর চামড়া কেনা শুরু করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আরো বলেন, শনিবার থেকেই কোরবানির পশুর চামড়া বেচা-কেনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কঠোর নজরদারি করবে। বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর রাখবে। ট্যানারির মালিকরা কারসাজি করে সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে কম দামে চামড়া কিনলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ রাখা হবে। প্রথম ধাপে ওয়েট ব্ল রফতানিতে উৎসাহিত করা হবে। এরপর অন্যান্য চামড়া রফতানির সুযোগ দেয়া হবে। চামড়া তো আর পানির দামে বিক্রি হতে দেয়া যায় না।

প্রশ্ন হলো হঠাৎ করে চামড়ার এই দরপতন কেন? ৩০ বছর আগে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে কেনা গরুর চামড়া বিক্রি হতো ৫শ’ থেকে ৭শ’ টাকায়। এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা দামের একটি খাসির চামড়া বিক্রি হতো একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকায়। ১০ বছর আগেও এক লাখ টাকার কেনা গরুর চামড়া বিক্রি হতো ১৫শ’ থেকে ২০ হাজার টাকা; ১০ হাজার টাকার খাসির চামড়া বিক্রি হতো ৫শ’ টাকা। অথচ এ বছর এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকায় কেনা গরুর চামড়া ৫শ’ টাকাও বিক্রি করা যায়নি। আর খাসির চামড়া একশ’ টাকায় কেউ বিক্রি করতে পেরেছেন এমন রেকর্ডও নেই। চামড়ার এই দরপতনের রহস্য কি? আবার সরকার যখন কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন; তার বিরোধিতায় কোমড় বেঁধে মাঠে নামেন চামড়া শিল্পের সঙ্গে জড়িত ট্যানারি মালিকরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রী বলেছেন, আমরা কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানি করব। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানি করার প্রতি জোর দিয়ে গতকাল বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পশুর চামড়া রফতানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়, এই সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সেটা ধ্বংস করে দিয়েছে। একটা সময় পাট শিল্প ধ্বংস করা হয়েছে, এবার চামড়া শিল্পকে ধ্বংস করা হচ্ছে।
লাখ টাকা দিয়ে কেনা কোরবানির গরুর চামড়ার দাম মাত্র তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকা বিক্রি করা হয়। ২০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা খাসির চামড়ার দাম ৫০ টাকা। অনেক এলাকায় চামড়া মাটিতে পুতে ফেলা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে মাদরাসা বা এতিমখানা কর্তৃপক্ষের লোকজনও এখন আর কোরবানির পশুর চামড়া নেয়ার জন্য তেমন আগ্রহ দেখায় না। বাড়ির পাশের গরিব লোকেরাও এখন আর সাহায্য বাবদ চামড়ার টাকা দাবি করেন না। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এতটা অনিহা আগে কখনোই ছিল না। আড়তদারদের দাবি, নগদ টাকা না থাকায় তারা এবছর বেশি দামে চামড়া কিনতে পারেননি। আর ট্যানারি মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় চামড়ার দাম কমে গেছে। তাহলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাঁচা চামড়া রফতানি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা অবস্থান নিচ্ছেন কেন?

ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবার চামড়া কেনা নিয়ে লাঠালাঠি করেনি। কিন্তু কোরবানি করা পশুর কাঁচা চামড়া কেনাবেচা ও সংরক্ষণ করা না করা নিয়ে কেলেঙ্কারির অন্ত নেই। কাঁচা চামড়া ন্যায্য দামে কেনা না কেনা নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কাঁচা চামড়ার দাম ঠিক করে দেয়ার পরও সেই দামে ট্যানারি মালিকরা কেনেননি। ন্যায্য দাম না পেয়ে কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা, রাস্তা বা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কাঁচা চামড়ায় এই বিপর্যয়ের কারণে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি কোরবানির পশুর চামড়ার ওপর নির্ভরশীল মাদরাসা ও এতিমখানার কর্তৃপক্ষ ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। কাঁচা চামড়ার এই বিপর্যয়ে দায় কার প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

জানতে চাইলে চামড়া শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ সাংবাদিকদের কাছে দাবি করে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে চামড়ার বিকল্প পণ্যের বাজার হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছোট হয়ে গেছে। এছাড়া চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হওয়ায় চামড়ার বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাই চাহিদা কমে গেছে। কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে আমরা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে পারি না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তারা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা তারা রক্ষা করেন না। ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়ার দাম বকেয়া রাখেন। গতবছরের টাকা এখনও পাওনা রয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলামের মতে চামড়া নিয়ে সঙ্কট কেটে যাবে।



 

Show all comments
  • আলী ১৭ আগস্ট, ২০১৯, ১১:৩৮ এএম says : 0
    ওবায়াদুল কাদের সাব কোথায় বলে দিলে তো হয় দোষ বি ত্রন পি আর জামাতের
    Total Reply(0) Reply
  • রহিম ১৭ আগস্ট, ২০১৯, ১১:৪০ এএম says : 0
    দেশ যে ভাবে চলছে আগামী ৫০বছরেও ত্রই দেশ উন্নিতি হবে না সব জাগায় দুরনীতি
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ