Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

ধকল না কাটতেই ফের বড় বন্যার আশঙ্কা

পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯টি স্থানে ৫০টি স্থানে নদীর সমতল হ্রাস পেয়েছে

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

ভয়াবহ বন্যার কারণে ৩০ জেলার বানভাসি মানুষ ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করতে পারেনি। কোনো কোনো জেলার মানুষ বেড়িবাঁধের ওপর বা অন্য কোনো উঁচু স্থানের এক টুকরো শুকনো জমিতে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। অনেকে কোরবানি দিতে পারেনি। ঈদের আনন্দ বানভাসিদের কাছে নিরানন্দ হয়েই দেখা দিয়েছে। বন্যার সেই ধকল কেটে যেতে না যেতেই আবারো ধেয়ে আসছে বন্যা। প্রবল বর্ষণে ইতোমধ্যে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল প্রবল বর্ষণে খুলনা এবং বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। এতে মৎস্য খামার ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, মনু, খোয়াই, তিস্তা, ধরলা. দুধকুমার ও জাদুকাটা নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরো দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পুর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসের শেষে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলে মাঝারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী সপ্তাহের শেষার্ধে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলা এবং কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, লালমনিরহাট এবং বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় বন্যার আঘাত হানতে পারে।

গতকাল শনিবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তদসংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, তদসংলগ্ন ভারতের মেঘালয় এবং গাঙ্গীয় পশ্চিমবঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। যার ফলে সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, মনু, খোয়াই, তিস্তা, ধরলা. দুধকুমার ও জাদুকাটা নদীগুলোর পানি সমতল আগামী ২৪ ঘণ্টায় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীগুলোর পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে এবং গঙ্গা-পদ্মা নদীগুলোর পানি সমতল স্থিতিশীল থাকতে পারে। গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯টি স্থানে ও ৫০টি স্থানে নদীর সমতল হ্রাস পেয়েছে। কোনো স্থানের বিপদসীমার কোনো তথ্য নেই।

প্রবল বর্ষণে তলিয়ে গেছে খুলনা মহানগরীর অধিকাংশ এলাকা। মুষলধারে বৃষ্টির কারণে খুলনাবাসীকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। শুক্রবার দিবাগত গভীর রাত থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে মুষলধারে বৃষ্টি। এরপর থেমে থেমে চলা বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয় পড়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে অতিবর্ষণে খুলনাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ অবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। খুলনা আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, শুক্রবার রাত ৩টা থেকে খুলনায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়, যা শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এ সময় ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা এ বছরের সর্বোচ্চ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় খুলনাঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে। খুলনায় এ বৃষ্টিপাত বছরের সর্বোচ্চ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় রাস্তায় সাধারণ মানুষের আনাগোনা খুবই কম। সকালের দিকে অফিসগামী মানুষের চলাফেরা বেশি থাকলেও বেলা গড়াতেই মানুষের আনাগোনা কমতে থাকে। পেশার তাগিদে বা জরুরি কাজে যারা বের হয়েছেন, জলাবদ্ধতার কারণে রিকশা বা ইজিবাইক না পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

বৃষ্টিতে মহানগরীর শান্তিধাম মোড়, রয়্যাল মোড়, বাইতিপাড়া, তালতলা, মডার্ন ফার্নিচার মোড়, পিকচার প্যালেস মোড়, পিটিআই মোড়, সাতরাস্তার মোড়, শামসুর রহমান রোড, আহসান আহমেদ রোড, দোলখোলা, নিরালা, বাগমারা, মিস্ত্রিপাড়া, ময়লাপোতা, শিববাড়ি মোড়, বড় বাজার, মির্জাপুর রোড, খানজাহান আলী রোড, খালিশপুর মেঘার মোড়, দৌলতপুর, নতুন বাজার, পশ্চিম রূপসা, রূপসা স্ট্যান্ড রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, বাবুখান রোড, লবণচরা বান্দা বাজারসহ প্রায় সব এলাকার রাস্তায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এসব এলাকার অনেক ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। নিম্নাঞ্চলের বস্তিঘরগুলোতে দেখা গেছে হাঁটুপানি। অনেক এলাকার ভবনের নিচতলা পানিতে ডুবে গেছে। বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ রহমান বলেন, সকাল থেকে খালিশপুর এলাকা যানবাহন শূন্য। অফিসে যেতে ভীষণ বেগ পেতে হয়েছে।

পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার বাসিন্দা জুয়েল মিয়া বলেন, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা সবই এখন খুলনা। পানিতে সবাই গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে। খুলনার পূর্ব বানিয়া খামারের বি কে মেইন রোডে হাঁটুপানি জমে আছে। আশপাশের প্রায় সব ঘরবাড়ির নিচতলা পানিতে তলিয়ে আছে। পানি উত্তোলনের পাম্প মেশিন তলিয়ে আছে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অধিকাংশ পরিবারে রান্নার অভাবে সদস্যরা সকাল থেকে না খাওয়া। দোকান সব বন্ধ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচ্ছেন না।

এ দিকে গতকাল শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত একটানা ৬ ঘণ্টার বিরামহীন বর্ষণে উপক‚লীয় বাগেরহাট জেলার তিনটি পৌরসভা ও ৯টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ জেলায় গড় ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের ফলে তিনটি পৌরসভা ও ৯টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বাগেরহাট পৌরসভার খারদ্বার, বাসাবাটি, হাড়িখালী, নাগের বাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া পৌরসভার সামনের সড়ক, শালতলা মোড়, মিঠাপুকুর পাড়ের সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বাগেরহাট সদর, মংলা, রামপাল, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার বেশ কিছু রাস্তাঘাট, মৎস্য ঘের ও সবজির ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুপুরে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিরা আরও চিন্তিত হয়ে পড়ছেন। জেলার প্রায় ২৫০ মৎস্য খামার তলিয়ে গেছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাগেরহাট কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আফতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাগেরহাটে বছরের সর্বোচ্চ ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে কিছু পানের বরজ ও সবজি ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। তবে দ্রুত পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমে যাবে। বাগেরহাট পৌরসভার প্যানেল মেয়র তালুকদার আব্দুল বাকী জানান, পৌরসভার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য জরিপ শুরু করা হয়েছে। আশা করছি, এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আগামীতে পৌরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে। বাগেরহাট সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ এস এম রাসেল জানান, বৃষ্টির পানিতে ২৫০টির বেশি মৎস্য খামার তলিয়ে গেছে। এ বৃষ্টি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে সহস্রাধিক মৎস্য ঘের তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুটি, গুজিমারী, শ্যামপুর, নয়াপাড়া, গাবুরজান ও বাবুচরের বাসিন্দারা এবার ঈদের নামাজ পড়েছেন উঁচু জমিতে। ঈদের দিন কেউ কেউ হাঁস-মুরগি ধরে জবাই করে, সেটাই তাদের কাছে কোরবানি। গুজিমারীচরের ছাদেকুল বলেন, এখানে ঈদের নামাজের মাঠ বলতে এক টুকরো শুকনো জমিতে নামাজ পড়ি। এরপর যে যার মতো কাজে বেরিয়ে পড়ে। অন্যান্য দিনের চেয়ে ঈদের দিনের পার্থক্য শুধু ওই সকালের নামাজটুকুই।

গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশের উত্তরাঞ্চল এবং সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচু এলাকায় বন্যা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চল পেরিয়ে মধ্যাঞ্চলেও বন্যা শুরু হয়। এবারের বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলো হচ্ছে- সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, নাটোর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পাবনা, দিনাজপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, নওগাঁ, টাঙ্গাইল ও মানিকগঞ্জ।

গত ১ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত বন্যাদুর্গত বিভিন্ন জেলায় ২৮ হাজার ৬৫০ মে. টন চাল, ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১ লাখ ১৮ হাজার কার্টুন শুকনা খাবার, ৮ হাজার ৫০০ সেট তাঁবু, ৫৪ হাজার ৭০০ বান্ডিল ঢেউটিন, গৃহ নির্মাণে ১৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা, শিশুখাদ্য ক্রয়ে ১৮ লাখ টাকা এবং গো-খাদ্য ক্রয়ে ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ