Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

সর্বনাশা মাদক

রফিকুল ইসলাম সেলিম : | প্রকাশের সময় : ১৮ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী চৌমুহনী থেকে ১৯ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় দুই মাদক ব্যবসায়ী। এর কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার রাতে নগরীর বাকলিয়া থেকে ২৬ হাজার ২০০ ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় আরও দুইজন। দুইটি অভিযান পরিচালনা করে এলিট বাহিনী র‌্যাব। কক্সবাজার থেকে চালান দুটি আনা হচ্ছিল চট্টগ্রামে।
র‌্যাব-পুলিশের হাতে প্রতিদিনই ধরা পড়ছে ইয়াবার চালান। সীমান্তে দায়িত্বরত বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অভিযানেও আটক হচ্ছে ইয়াবা। সীমান্তে নজরদারি ‘ক্রসফায়ার’ ও বন্দুকযুদ্ধে মাদক কারবারিদের বেঘোরে মৃত্যু, দলবেঁধে আত্মসমর্পণের পরও থামছে না ইয়াবার পাচার। সর্বনাশা ইয়াবার পাশাপাশি সীমান্ত হয়ে ফেনসিডিল, আফিম, হেরোইন, গাঁজাসহ আসছে হরেক মাদক। নেশার ভয়াল আগ্রাসনে ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ। মাদকাসক্তের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। পরিবার ও সমাজে বাড়ছে অস্থিরতা।

র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অভিযানে গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেড় বছরে ৬৩ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়। ভারতীয় ফেনসিডিল উদ্ধার হয়েছে ২৯ হাজার ৮০১ বোতল। বিদেশি মদ উদ্ধার হয় ৭ হাজার ৭৯৪ বোতল। একই সময়ে ১ হাজার ৬১৮ কেজি গাঁজা, সোয়া ৭ কেজি আফিম, ৩ কেজি হেরোইন উদ্ধার হয়। দেশি তৈরি চোলাই মদ উদ্ধার হয়েছে ১ কোটি ২৫ হাজার ১২৫ লিটার। মহানগর ও জেলা পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানেও প্রায় সমান সংখ্যক মাদকের চালান ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে আটক মাদকের প্রায় ১০ গুণ বেশি নিরাপদে পাচার হয়ে যায়।

মাদকের ভয়াল আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার পর মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবক’টি ইউনিট। প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলছে। অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় তিন শতাধিক মাদক কারবারি বন্দুকযুদ্ধ ও ক্রসফায়ারে কিংবা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে মারা গেছে। ইয়াবার প্রবেশপথ টেকনাফেই মারা পড়েছে অর্ধশত মাদক কারবারি। প্রতিনিয়তই সেখানে বন্দুকযুদ্ধ আর নিজেদের মধ্যে কথিত খুনোখুনিতে লাশ পড়ছে মাদক পাচারকারীদের। কক্সবাজারে ১০১ জন ইয়াবার কারবারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণও করেছে। অসংখ্য মাদক ব্যবসায়ী ধরা পড়েছে র‌্যাব-পুলিশের হাতে। এরপরও থামছে না ইয়াবার কারবার। মিয়ানমার থেকে সাগর, পাহাড় ও সড়ক পথে ইয়াবার চালান আসা অব্যাহত আছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মুখে পাচারকারীরা কৌশল আর রুট বদল করছে।
কক্সবাজার থেকে পাচারকালে প্রতিনিয়তই ইয়াবার চালান ধরা পড়ছে। নানান কৌশলে মাদক ব্যবসায়ীরা চালান নিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ইয়াবার চাহিদাও বাড়ছে। মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েছে পুলিশের সদস্যরাও। নগরীতে মাদকের চালানসহ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ধরাও পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ মাদক সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছে। আর এ কারণে পাচার থামছে না। নিত্যনতুন কৌশলে সর্বনাশা এ নেশার ট্যাবলেট পাচার করে আনছে মাদক কারবারিরা।

বাংলাদেশকে টার্গেট করে মিয়ানমার সীমান্তে অসংখ্য ইয়াবার কারখানা গড়ে উঠে। এসব কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবার পুরো চালান ঠেলে দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশে। শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট এসব চালান চলে যাচ্ছে নিরাপদ গন্তব্যে। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেপথ্যে নায়ক তথা গডফাদারদের পাকড়াও করা যায়নি। আর এ কারণে তাদের নেটওয়ার্কও অক্ষত থেকে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে টার্গেট করে গড়ে উঠা ইয়াবার কারখানা বন্ধে মিয়ানমারকে আহ্বান জানানো হয় একাধিকবার। তবে সে আহ্বানে কোন সাড়া দিচ্ছে না দেশটি।

সরকারি তরফে দাবি করা হয়, বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত তাদের সীমান্তে গড়ে উঠা ফেনসিডিলের অনেক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। আর এ কারণে দেশে ফেনসিডিলের আগ্রাসন কমে এসেছে। তবে বাস্তবতা হলো ফেনসিডিল পাচার এখনও অব্যাহত আছে। দেড় বছরে শুধু র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েছে ২৯ হাজার ৮০১ বোতল ফেনসিডিল। ফেনসিডিলের সাথে ভারত থেকে গাঁজা, মদ, আফিম ও হেরোইনও আসছে। দেশে তৈরি চোলাই মদের জোয়ারও ঠেকাতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী। দেড় বছরে র‌্যাবের হাতে এক কোটি লিটারের বেশি চালান আটক হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে এ মাদকের বিস্তার কত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

সম্প্রতি জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুলিশ সুপার নূরেআলম মিনা বলেন, মাদক ব্যবসায়ীর একটি শক্তিশালী গ্রুপ বোয়ালখালী উপজেলার কড়লডেঙ্গা পাহাড় হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার চোলাই মদ চট্টগ্রাম হয়ে বিভিন্ন স্থানে পচার করছে। পুলিশের অভিযানে কিছু কিছু মদ ব্যবসায়ী গ্রেফতার হলে জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা না পাওয়ায় রাঘব-বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্যদের গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছেনা। অভিযানের খবর পেয়ে তারা পালিয়ে যায়। এলাকার জনপ্রতিনিধিরা এগিয়ে আসলে চোলাই মদ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য রোধ করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারে মতো এ অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা অভিযোগ করছেন, জনপ্রতিনিধিদের অসহযোগিতায় মাদক কারবারিদের দমন করা যাচ্ছে না। কোন কোন এলাকায় খোদ জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেই মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মাদক

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ