Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

আড়তদাররা চামড়া বিক্রিতে সম্মত

বকেয়া আদায়ে ফের বৈঠক বৃহস্পতিবার কুচক্রী মহল সরকারকে বিপদে ফেলতে চায় : সালমান এফ রহমান

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৯ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম

সরকারের মধ্যস্থতায় ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে সম্মত হয়েছেন আড়তদাররা। তবে ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের যে বকেয়া পাওনা রয়েছে, সে বিষয়ে সমাধান বের করতে আগামী ২২ আগস্ট ফের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) সে বৈঠকে মধ্যস্থতা করবে।

গতকাল রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের উপস্থিতিতে চামড়া খাতের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত আসে।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত থেকেই চামড়া বিক্রি শুরু করা হবে। ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এফবিসিসিআইকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আগামী ২২ অগাস্ট এফবিসিসিআইর উদ্যোগে এ নিয়ে আলোচনা হবে দু’পক্ষের মধ্যে। সেখান থেকেই ফয়সালা করে দেবে।

বৈঠকে সরকার পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে সালমান এফ রহমান বলেন, একটি কুচক্রী মহল সরকারকে বিপদে ফেলতে চামড়া ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত করেছে। ফলে চামড়ার বিশাল দরপতন হয়েছে। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে প্রতি বছর কোরবানির সময় পাঁচ হাজার পিস চামড়া নষ্ট হলেও এবার এই কুচক্রী মহলের কারণে ১০ হাজার পিস চামড়া নষ্ট হয়েছে। তবে এটা বড় ধরনের কোনো ক্ষতি নয়। কাঁচা চামড়া রফতানি করা হবে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানিয়েছেন, অবস্থা বুঝেই রফতানির সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সরকার যদি এখনই রফতানি করার প্রয়োজন মনে করে, তবে রফতানি করবে। এ সময় চামড়া নিয়ে বিএনপি নেতাদের দেয়া বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন সালমান এফ রহমান। তিনি বলেন, রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে বিএনপি চামড়ার পেছনে পড়েছে।

সালমান এফ রহমান বলেন, আমরা আশাবাদী, খোলামেলা আলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান পাবো। আমি মনে করি, চামড়া শিল্প গার্মেন্টসের পর গুরুত্বপূর্ণ খাত। ভবিষ্যতে চামড়া শিল্পটা মেইন সেক্টর হিসেবে ডেভলপ করার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে বর্তমানে যে সমস্যা তা কিভাবে সমাধান করা যায় এবং ভবিষ্যতে কী করা যায় বা আবার সম্মুখীন না হই তার সাজেশন নেয়া হবে। সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বিদেশে থাকায় বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন উপস্থিত ছিলেন বৈঠকে। চামড়াকে গুরুত্বপূর্ণ খাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাত নিয়ে যেন ভবিষ্যতে কেউ বিশৃঙ্খলা না করতে পারে, সেজন্য টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনও সাংবাদিকদের জানান, তারা এখন থেকে ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করবেন। তবে কবে থেকে চামড়ার এই বাজার খুলছে, সেই সুনির্দিষ্ট তারিখ তিনিও জানাননি।

ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়া পরিশোধে এফবিসিসিআইর মধ্যস্থতার কথা জানান দেলোয়ার হোসেন। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২২ আগস্ট সংশ্লিষ্ট ফিনিস লেদার অ্যাসোসিয়েশন ও টানার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে আড়তদারদের পাওনা আদায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

জানা গেছে, মূল্য বিপর্যয়ের কারণে চামড়া খাতে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কোরবানির পশুর চামড়ার ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে। এমন দাবি করেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।

বিপুলসংখ্যক এ চামড়া রাস্তায় ফেলে, নদীতে ভাসিয়ে ও মাটির নিচে চাপা দেয়া হয়। কাঁচামাল হিসেবে এসব চামড়া ট্যানারিগুলোতে আসত। নষ্ট চামড়াগুলো যথাসময়ে কেনা সম্ভব হলে বিদেশে রফতানি করে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা আয় হতো। কিন্তু এবার তা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চামড়ার বাজারে এ বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে মাঠে নেমেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। চামড়া মাটিচাপা দেয়ার বিষয়গুলো তদন্ত শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও দমকল বাহিনী আলাদাভাবে তদন্তে নেমেছে। সৈয়দপুরে পশুর চামড়া মাটিচাপার ঘটনা সরেজমিন দেখতে গত বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে দমকল বাহিনীর তদন্ত কমিটি। আর ব্যাংকগুলো খতিয়ে দেখবে তাদের দেয়া ঋণের অর্থ ট্যানারি শিল্পের মালিকরা সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন কি না। কারণ, এ বছর ৭০০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ দেয়া হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ে তারল্য সঙ্কট থাকার কথা নয়।

জানা গেছে, দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদে। এ বছর কমপক্ষে এক কোটি ১৮ লাখ পশুর চামড়া কেনাবেচা হওয়ার কথা। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৫ লাখ ৮২ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া ৭২ লাখ। এ ছাড়া ছয় হাজার ৫৬৩টি অন্য পশু। পোস্তার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিএইচএসএমএর হিসাব মতে, ৩০ শতাংশ চামড়া এ বছর নষ্ট হয়েছে। এর অর্ধেকই গরুর চামড়া। একটি গরুর চামড়া (গড়ে ১৮ বর্গফুট) বিদেশে রফতানি করে আয় হয় সর্বনিম্ন ২১৬০ টাকা।

এবার নষ্ট হওয়া গরুর চামড়া থেকে রফতানি আয় কমবে প্রায় ৩৮৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া ছাগলের চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০০ টাকার বেশি রফতানি মূল্য রয়েছে। সে হিসাবে ছাগলের চামড়া থেকে আয় কমবে কমপক্ষে দেড়শ’ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, গরু-ছাগলের চামড়া নষ্ট হওয়ায় সব মিলে কমপক্ষে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার রফতানি আয় কমে যেতে পারে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি খাতে আয় ৯ হাজার ২৯১ কোটি টাকা (১০৯ দশমিক ৩০ কোটি মার্কিন ডলার)। ধারণা করা হচ্ছে, কাঁচামাল সঙ্কটের কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম বলেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এটি মাটিতে পুঁতে ফেলা, রাস্তায় বা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া গর্হিত কাজ। এ ধরনের কাজ যারা করেছেন, তারা ঠিক করেননি। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলছি। নিশ্চয়ই সামনে এ নিয়ে আর কোনো সমস্যা হবে না। কাঁচা চামড়া রফতানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমে ওয়েট ব্ল রফতানি এবং পরে লবণযুক্ত চামড়া রফতানির অনুমোদন দেয়া হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি হাজী মো. দেলোয়ার হোসেন ইনকিলাবকে জানান, আমাদের হিসাবে এবার কোরবানির ঈদে এক কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানির হওয়ার কথা। সে হিসাবে সমসংখ্যক চামড়া আড়তদারদের কাছে আসার কথা। কিন্তু ৩০ শতাংশ চামড়া কম আসছে। এসব চামড়া নানাভাবে নষ্ট করা হয়েছে। ফলে এবার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা আছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে টাকা নেই। যে কারণে চামড়া আড়ত পর্যন্ত আনার পরও অনেকে কিনতে পারেননি।

জানা গেছে, চামড়া দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি আয়ের খাত। ২০২১ সাল নাগাদ এ খাতে ৫০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু চামড়া রপ্তানি কমছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ১০২ কোটি ডলার আয় করে, যা আগের বছরের চেয়ে ছয় শতাংশ কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চামড়া খাতে রপ্তানি আয় ছিল ১২৩ কোটি ডলারের বেশি।

ট্যানারি মালিকেরা জানান, ২০১৭ সালের এপ্রিলে হঠাৎ হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর সাভারে উৎপাদনে যেতে অনেক সময় লেগে যায়। অনেক ট্যানারি এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। এ কারণে ভারত ও জাপানের অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছে। মাইজদী ট্যানারির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, এখন চীনারাই আমাদের একমাত্র ক্রেতা। তারাও সুযোগ নিয়ে দাম এত কম বলছে যে তাতে উৎপাদন খরচও ওঠে না। রপ্তানি না হওয়ায় কারখানায় চামড়ার স্তূপ জমে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত ঈদুল আজহার পর আমি ৪৫ হাজার চামড়া কিনেছিলাম, যার অর্ধেক এখনো রয়ে গেছে।

অন্যদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়ায় রপ্তানির পরিমাণ অনেকটাই কমেছে। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন, চামড়া শিল্পনগরীর দুর্বলতাকে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চামড়ায় রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিশ্চিত করতে হবে পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো- ইপিবি’র তথ্য মতে, জুতা ছাড়া চামড়া খাতের রপ্তানি কমার ধারাবাহিকতা বিদায়ী অর্থবছরেও দেখা যায়। এর মধ্যে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার রপ্তানি কমেছে আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি কমেছে ২৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। রপ্তানি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে যে ধরনের প্রণোদনা এবং অবকাঠামো সহায়তা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এই উৎপাদন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী না হলে বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যাবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন