Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

চিকিৎসক সহ জনবল সংকটে বিপর্যয়ের কবলে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ সরকারী হাসপাতাল

৫শ থেকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত হলেও জনবল মঞ্জুরি বাড়েনি

বরিশাল ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ১৯ আগস্ট, ২০১৯, ২:০১ পিএম

বরিশাল শের এ বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চিকিৎসক সহ সার্বিক জনবল মঞ্জুরিবিহীন অবস্থায় ৫শ শয্যা থেকে কাগজপত্রে ১হাজারে উন্নীত করা হলেও পুরনো মঞ্জুরীকৃত পদেরও ৫৫ভাগ শূন্য। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ এ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানটির ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত রোগী সহ সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থাই মুখ থুবড়ে পড়ছে। ৫শ শয্যার চিকিৎসা সুবিধা সহ অবকাঠামোর এ হাসপাতালটি বছর দুয়েক আগে ১হাজার শয্যায় উন্নীত করা হলেও এখানে এখন প্রতিদিন গড়ে রোগী থাকছে প্রায় ১হাজার ৭শ। অথচ চিকিৎসক সহ সার্বিক জনবল মঞ্জুরি রয়েছে ৫শ শয্যার। আর সে জনবলেরও অর্ধেকের বেশী শূন্য। তবে চিকিৎসক সংকটে সময়মত চিকিৎসা না পাবার কারণেও এ হাসপাতালে অনেক রোগীকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে হাসপাতালটিতে মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ অব্যাহত থাকছে। 

বর্তমান ভবনে ৫শ শয্যার শের এ বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চালু করা হয় ১৯৭৮ সালে। সে থেকে এ চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানটি বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলা ছাড়াও মাদারিপুর, শরিয়তপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার সাধারন মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু এখানে চিকিৎসক সংকট এখন একটি বাস্তব মানবিক সংকট সৃষ্টি করছে। ৫শ শয্যার হাসপাতালটিতে সব সময়ই একহাজার থেকে ১২শ রোগীর চিকিৎসা সেবা দিতে হাসপাতাল প্রশাসন হীমসিম খাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় বছর দুয়েক আগে হাসপাতালটিকে ১হাজার শয্যায় উন্নীতকরনের ঘোষনা আসে।

কিন্তু কোন ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চিকিৎসক সহ সার্বিক জনবল মঞ্জুরি বৃদ্ধি না করেই শয্যা সংখ্যা দ্বিগুন করায় হাসপাতাল প্রশাসন এখন চরম সকটে। এমনকি গত জুলাই থেকে ক্রমাগত ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলেও সে জন্য আলাদা ওয়ার্ড দুরের কথা, ভিন্ন কোন চিকিৎসক পর্যন্ত দিতে পারেন নি হাসপাতাল প্রশাসন। জুলাই মাস থেকে আগষ্টের মধ্যভাগ পর্যন্ত হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ডের মাঝের উন্মূক্ত করিডোরের মেঝেতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা চলে। এমনকি একই স্থানে নারী-পুরুষ ও শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হয়। যেখানে কোন শৌচাগার ও ফ্যান পর্যন্ত ছিলনা। উপরন্তু চিকিৎসক সংকটে রোগীদের দূর্ভোগ সব সীমা অতিক্রম করে।
তবে হাসপাতাল প্রশাসন সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দিয়েছেন। সোমবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৩শ ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত রোগী এ হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে ১ হাজার ৯১জন চিকিৎসা নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রায় ২শ।

কিন্তু মারাত্মক চিকিৎসক সংকটে বরিশাল শের এ বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা ব্যাবস্থা টিকিয়ে রাখাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ১হাজার শয্যার এ হাসপাতালটির ৫শ শয্যার বিপরিতে নিজস্ব চিকিৎসকের মঞ্জুরিকৃত পদ ২২৪জন। কিন্তু সোমবার পর্যন্ত ছিলেন মাত্র ৯৯। ১২৫টি পদে কোন চিকিৎসক নেই। এমনকি জরুরী বিভাগের চিকিৎসক থেকে শুরু করে ওয়ার্ডগুলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেজিষ্ট্রার, সহকারী রেজিষ্ট্রার এবং অস্ত্রপচারের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘এ্যানেসথেসিওলজিস্ট’এর পদে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। হাসপাতালটির দুজন সহকারী পরিচালকের ১টি পদ শূণ্য। হাসপাতালটির একমাত্র সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ও ডেন্টালের জুনিয়র কনসালটেন্ট-এর পদ দুটিও শূণ্য। ৮টি আবাসিক চিকিৎসক ও সার্জনের দুটি পদে কোন চিকিৎসক নেই। বিভিন্ন ওয়ার্ডের ৩৩জন রেজিষ্ট্রার-এর ১৮টি ও ৬৬জন সহকারী রেজিষ্ট্রার-এর ৪৮টি পদেই কোন চিকিৎসক নেই। ১০টি এ্যানেসথেসিওলজিস্ট-এর বিপরিতে আছেন ৬জন। যার মধ্যে গড়ে একজন বিভিন্ন কারনে ছুটিতে থাকেন। ফলে এ বিশাল হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটারগুলো সব সময় কার্যকর থাকছেনা। অথচ অস্ত্রপচারের জন্য ওয়ার্ডগুলোতে দিনের পর দিন রোগীদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছেনা।
১হাজার শয্যার এ হাসপাতালটির জরুরী বিভাগের জন্য মাত্র ১০টি ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসারের পদ থাকলেও শূণ্য ২টি। এছাড়া হাসপাতালটির বহির বিভাগের জন্য মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন, মেডিকেলাফিসার-বিটিসি, রেডিওলজিস্ট, রেডিওথেরাপিস্ট, মেডিকেল অফিসারÑরক্ত ও ডেন্টালের ৪৬টি পদের বিপরিতে মাত্র ২৫জন কর্মরত আছেন। ২১টি পদ শূণ্য। গোটা হাসপাতালটির একমাত্র সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট পদে কোন জনবল না থাকার মধ্যেই ৪টি ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট পদের বিপরিতে আছেন মাত্র ১জন। ফলে বিশাল এহাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের প্যাথলজিক্যাল পরিক্ষা-নিরিক্ষার বিষয়টি এখন বাইরের ওপরই নির্ভরশীল। এছাড়াও ইনডোর মেডিকেল অফিসার-এর ২০টি পদে আছেন মাত্র ৯জন, ১১টি পদ শূণ্য। নবসৃষ্ট ২০টি মেডিকেল অফিসার পদের ১৪টি শূণ্য।

চিকিৎসক পদের এ বেহাল অবস্থার মধ্যে হাসপাতালটির নার্সিং কর্মকর্তাদের ৮০৬টি মঞ্জুরীকৃত পদের ৩৭টি শূণ্য। হাসপাতাল প্রশাসনের ১২৪টি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী পদের ৪২টি ও ৪২৬টি ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী পদেরও ১১৯টিতে কোন জনবল নেই। ৮টি জমাদার পদের সবগুলো, ২২৪টি অফিস সহায়কের ৬৪টি, ১৩৫ পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ৩০টি, ৪টি ওয়ার্ড বয়ের ২টি ছাড়াও বাবুর্চি ও নিরাপত্তা প্রহরীরও বিপুল সংখ্যক পদে কোন জনবল নেই।

ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহত এ সরকারী চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রমই অনেকটা অচলবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছে। উপরন্তু ১হাজার শয্যার হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ১৭শ রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় ওষুধ ও পথ্যের হাহাকার চলছেই। কিন্তু এসব কিছুর পরেও চিকিৎসক সংকটে গোটা হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমই সচল রাখা দায় হয়ে উঠেছে।

এসব বিষয়ে শের এ বাংআ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ মোঃ বাকির হোসেন-এর সাথে আলাপ কর হলে তিনি জানান, ‘আমরা নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসক সহ জনবল সংকটের বিষয়টি অবহিত করে চলেছি। অধিদপ্তর থেকেও মন্ত্রনালয়ের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছ। তবে সারা দেশেই চিকৎসক সংকট থাকায় হঠাৎ করেই সব কিছু ঠিক হয়ে যাবেনা। তারপরেও রোগীদের জন্য সর্বাধিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে পরিচালক জানান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ