Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ০৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৬ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

কবি ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্য এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রকাশের সময় : ১০ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মনিরুজ্জামান
ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সাল। খুলনা পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে বইমেলায় গেলাম। আমার কিছু প্রিয় লেখকের বই খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু সেরকম কোনো বই মিলছে না। হঠাৎ একটি বইয়ের প্রচ্ছদে চোখ পড়তেই দেখি আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদ এঁর নাম। নামটি আমার পূর্ব পরিচিত এবং তিনি আমার রুচিগ্রাহ্য একজন লেখক। কবিতায় তেমন কোনো কাজ না করলেও গদ্যে বিশেষ বৈদগ্ধের পরিচয় দিয়েছেন এবং খ্যাতিও অর্জন করেছেন বেশ। এছাড়া তাঁর আরেকটি স্বতন্ত্র পরিচয় আছে, তিনি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। কোনো এক সময়ে জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপকও ছিলেন। পঞ্চাশ কি ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। জাহানারা ইমাম তখন তাঁর ক্লাসমেট।
যাহোক, আবু সায়ীদকে আমার একজন প্রিয় লেখক হিসেবে জেনেছি। এবার বই প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বইটির নাম ‘উত্তর প্রজন্ম’। বইটির লেখক তিনি। তাই বিলম্ব না করেই বইটি কিনলাম। বাংলাদেশের কিছু কিছু কবি সম্পর্কে তার একটি মূল্যায়ণ বা আলোচনা এই বইতে লিপিবদ্ধ আছে। এর আগে তাঁর কবিতার আলোচনা বা বিশ্লেষণধর্মী কোনো বই আমি পড়িনি। তাই তাঁকে কবি বা কবিতার আলোচক হিসেবে ভাবতে আমি অভ্যস্ত হইনি। অর্থাৎ অ্যাস্থেটিক মানুষ হিসেবে তিনি আমার কাছে পরিচিত নন। তবুও এই বইটিতে কবিতার পরে তাঁর একটি আলোচনা পড়লাম। তিনি একটি মন্তব্য করেছেন, “ফররুখ আহমদ বড় কবি না হলেও কবি”। মন্তব্যটি আমার নিকট হালকা, দুর্বল, চিন্তাবোধসম্পন্ন একজন মানুষের বলে মনে হয়েছে। হ্যাঁ, একজন পাঠক বা সমালোচকের মত প্রকাশের বা মন্তব্য করার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। কিন্তু  যে বিষয়ের ওপর মন্তব্য করবেন, তার পশ্চাতে যুক্তি ও বাস্তবগ্রাহ্য বোধের বিভাস থাকা দরকার। আবু সায়ীদ সাহেবের মন্তব্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অনুপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছি। আমি বাংলা সাহিত্যের বেশকিছু বিদগ্ধ সমালোচকের কবিতা আলোচনা পড়েছি, তাঁদের লেখায় কোনাে কবি সম্পর্কে এমন মন্তব্য কখনও পড়িনি। ফররুখ আহমদের প্রতি আমার কৌতূহল কখনও তেমন একটা ছিল না। তবে তার ‘ডাহুক’ ও ‘লাশ’ কবিতার বিস্ময়কর মাধুর্য ও বিষয়বস্তুর কথা কখনো ভুলবো না। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের কবি হিসেবে ফররুখ আহমদ যে শক্তিশালী স্থান দখল করেছেন তা সকল আগ্রহী পাঠকের নিকট থেকে সহজেই জানা যায়। একসময় মোহিতলাল মজুমদার কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা নিয়ে উপহাস করে বলতেন, “জসীম উদ্দীন ধান খেতো”। সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক এর প্রতিবাদ করে মোহিতলাল মজুমদারকে বলেছিলেন, “আপনি জসীম উদ্দীনের কবিতা নিয়ে জসীম উদ্দীনকে ঠাট্টা করেন, ভবিষ্যতে আপনাকে নিয়ে এক লাইন লেখা হলে জসীম উদ্দীনকে নিয়ে লেখা হবে দশ লাইন”। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি বাস্তবে হয়েছেও তাই। কবি সমালোচক এজরা পাউন্ড বলেছিলেন, “একজন সমালোচক কবিকে উন্মোচন করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন। তাই কবির উচিত সমালোচককে ধন্যবাদ জানানো।” আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদ সাহেব সমালোচক হিসেবে এই ধন্যবাদের কতটা উপযুক্ত তা আমি জানি না।
আশির দশক হতে এ পর্যন্ত নবম শ্রেণি হতে ডিগ্রি পর্যন্ত বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে যে দশ থেকে পনের জন কবির কবিতা তাঁদের মধ্যে কবি ফররুখ্ আহ্মদ সমহিমায় উপস্থিত বা অন্যতম। এই তালিকা থেকে যদি ফররুখ আহমদকে বাদ দেয়া হয়, তাহলে বাংলা সাহিত্যে বড় কবি হিসেবে দু’তিনজনে নেমে এসে দাঁড়ায়। এই পরিসংখ্যানটা অবশ্যই কেউ মেনে নেবে না। বলা যায় আবু সায়ীদ সাহেব কবিতা বিচার ক্ষেত্রে অঢ়ঢ়ৎবপরধঃরাব জঁষব টা ব্যবহার করতে গিয়ে কিছুটা ভুল করে ফেলেছেন বৈকি। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের পর সম্ভবত ফররুখ্ আহ্মদই সবচেয়ে বেশি আলোচিত কবি ব্যক্তিত্ব। চল্লিশের দশক থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত সকলের মনে যে কবির নামটি বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তিনি কবি ফররুখ আহমদ। আবুল মিয়ার চায়ের দোকানের এককোণে ছোট্ট একটি জায়গায় বসে যেতেন। তাঁর কবিতা পড়ে তাঁর সাথে দেখা করতে আসতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সাহিত্যপ্রেমী ছাত্ররা। নজরুলের পরে এই ভাগ্যটা বাংলা সাহিত্যের আর কোনো কবির ভাগ্যে জুটেছে বলে আমার মনে হয় না। তাঁকে এবং তাঁর কবিতা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অর্ধশত সমালোচকের লেখা পড়ার ভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আবু হেনা মোস্তফা কামাল, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ আলী আহসান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহ্মদ ছফা, সৈয়দ মন্জুরুল ইসলাম অন্যতম। কবিতা বোঝার ক্ষেত্রে এঁরা বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির মানুষ। তাই কবি ফররুখ্ আহ্মদের কবিতার ওপর এঁদের মূল্যায়ন কতটা বস্তুনিষ্ঠ তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখেনা। আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, “তৎকালীন পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত প্রধান কবি-ফররুখ আহমদ।” কবি শামসুর রাহমান বলেন, যে কবিতা তিনি আমাদের উপহার দিয়ে গেলেন, তা তাঁর স্মৃতিকে চিরদিন পাঠকের মনে উজ্জ্বল করে রাখবে এবং এ প্রতিভাবান কবি’র প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছিলাম এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধে।” আহ্মদ ছফা বলেন, “ফররুখ্ আহ্মদ একজন বীর চরিত্রের মানুষ এবং একজন শক্তিমন্ত কবি।” সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, “তিনি শ্রেষ্ঠ কবি বলেই তাঁকে বিচার করতে হবে সমস্ত বাংলা সাহিত্যের পটভূমিতে।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অধ্যাপক সৈয়দ মন্জুরুল ইসলাম বলেন, “ফররুখ আহমদ শক্তিশালী কবি, অনুভূতিশীল কবি, শক্তিমান কবি। দেশ-কাল-ভূগোলের পরিপূর্ণ বিকাশ তাঁর কবিতায়- যাঁর নির্মাণ নিখুঁত, তাঁকে গ-ি ও স্থুল দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা নির্বুদ্ধিতা।”
আবু সায়ীদ সাহেবের মতো আমরা অনেকেই তাঁর কবিতা বিচার করতে গিয়ে এই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়ে ফেলি। আবার কখনো কখনো আত্মার কার্পণ্য আমাদেরকে ব্যক্তিরুচির সংকীর্ণতায় টেনে আনে। তখন মূল্যায়ন ক্ষেত্রে সঠিক বিচারটা করতে আমরা ব্যর্থ হই।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও এই সংকীর্ণতার শিকার হয়েছিলেন। একসময় মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, নিরোদ শ্রী চৌধুরী এবং পরবর্তীতে হুমায়ুন আজাদও নজরুলকে সংকীর্ণতার আদলে বিচার করেছেন। অথচ সাহিত্য জগতে এঁরা একপ্রকার নিষ্প্রভ হয়ে হারিয়ে গেছেন। অথচ নজরুল টিকে আছেন শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম আসনে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গত কয়েক দশক ধরে দেখা গেছে কোনো কবি বা লেখকের ব্যক্তিগত কোনো আদর্শ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে তাঁর সৃষ্টিকে খাটো বা অস্বীকার করা হয়েছে। আর এ কাজটা বেশি করেছেন অধিক প্রগতিশীল দাবিদার লেখকরা। কিন্তু এই পৃথিবীতে নিয়তির বড় সত্য হলোÑ কোনো ব্যক্তিগত বা ক্ষমতার প্রতাপ দিয়ে কোনো সৃষ্টিকে নিশ্চিহ্ন করা যায় না। বরং সেই সৃষ্টি আরো উজ্জ্বল হয়। তাই বলবো আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদ কবি ফররুখ আহমদকে খাটো করতে যেয়ে অধিকতর উজ্জ্বল করে ফেলেছেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন