Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

এখনও অস্থিতিশীল খোলাবাজার

ঈদের দীর্ঘ ছুটির প্রভাব ডলার মার্কেটে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২০ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম

ডলারের সঙ্কট প্রতিদিনই তীব্র হচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে দাম। কমে যাচ্ছে টাকার মান। এদিকে ঈদের আগে খোলাবাজারে ডলারের দাম যে চড়েছে তা ঈদের পরেই পড়েনি। এদিকে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ঠিক রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার লেনদেনের বিষয়ে বিভিন্ন সীমা বেঁধে দিলেও তার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নীতিমালা উপেক্ষা করে মূল্যের বাইরে গিয়ে ডলার বেচা-কেনা করছে ব্যাংকগুলো।

সূত্র মতে, ঈদের আগে দুই দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ১ থেকে দেড় টাকা। ঈদের পর গত ১৪ আগস্টও খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি করছে সাড়ে ৮৬ টাকা থেকে ৮৭ টাকায়। অথচ ঈদের এক সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল ৮৪ থেকে সাড়ে ৮৪ টাকা। তিন মাস আগেও ছিল ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। ফলে গত তিন মাসের ব্যবধানে ২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে ডলারের দাম। তবে খোলাবাজারে বাড়লেও গত তিন সপ্তাহ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের দাম সাড়ে ৮৪ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঈদের লম্বা ছুটি কাটাতে অনেকেই বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার চিকিৎসার জন্যও বিদেশে যাচ্ছেন। আর এ শ্রেণির মানুষ এখন নগদ ডলারের চাহিদা মেটাতে খোলাবাজারে বেশি ভিড় করছেন। এতে খোলাবাজারে ডলারের দাম একটু বেশি চড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঈদের আগে ডলারের চাহিদা বাড়ে। এতে বাজার অস্থির হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে। মে মাসে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো সূত্রে জানা যায়, এবার অন্তত ছয় লাখ বাংলাদেশি ঈদের ছুটিতে দেশের বাইরে গেছেন। এত বেশিসংখ্যক লোক বিদেশে যাওয়ার পেছনে দীর্ঘ ঈদের ছুটিই অন্যতম কারণ। এ ছাড়া চিকিৎসার জন্য অনেকে বিদেশে গেছেন বলে জানা গেছে।

আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের দাম ৮৪ টাকা থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে রয়েছে। তবে ঈদুল আজহাকেন্দ্রীক পণ্য আমদানি এবং সরকারি পর্যায়ে এলএনজি ও জ্বালানিসহ কয়েকটি পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে কয়েক দিন ধরে ডলার সঙ্কটে আছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। বাধ্য হয়েই তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনছে। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য প্রবাহে চাপ পড়ছে। এবারও ঈদের আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিনই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ওয়েলকাম মানি এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের পরিচালক আনোয়ার হোসেন আনু ইনকিলাবকে বলেন, ডলারের দাম আমদানি-রফতানির উপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে ঈদ কেন্দ্রিক মানুষের দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তাই বাড়ছে ডলারের দাম।

দোহার মানি এক্সচেঞ্জের স্বত্ত্বাধিকারী মুরাদ হোসেন জানান, ঈদের আগে ৮৭ টাকা দরে ডলার বিক্রি করা হয়েছে। গতকাল সোমবারও তিনি ৮৫ দশমিক ৮০ পয়সায় ডলার বিক্রি করেছেন। ঈদের বন্ধে মানুষ বেশি বিদেশে ভ্রমণ করেছে। তাই ডলারের চাহিদা বেড়েছে। আর এ কারণেই বেড়েছে ডলারের দাম। এদিকে গতকালও অনেক মানি এক্সচেঞ্জ ৮৬ টাকায় ডলার বিক্রি করেছেন।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, ব্যাংক টু ব্যাংক সাড়ে ৮৪ টাকা দরে ডলার বিক্রি করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত দু’মাসে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা নেই। এছাড়া আমদানি কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহও বেড়েছে। তাই ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণ নেই। তবে এক শ্রেণির মানুষ এখন নগদ ডলারের চাহিদা মেটাতে খোলাবাজারে ভিড় করছেন। এতে খোলাবাজারে ডলারের দাম বাড়তে পারে। তাই খোলাবাজরের দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে উল্লেখ করেন সিরাজুল ইসলাম।

সূত্র মতে, গত অর্থবছরে ডলারের জোগান দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করেছিল। জানা যায়, বাজারব্যবস্থার ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেয়া হয় ২০০৩ সালে। এরপর ডলারের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারতি হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বাংলাদেশে পেছন থেকে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সঙ্কটকালীন সময়ে সরবরাহ বাড়িয়ে ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়। এতে অর্থনীতিতে এক ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ডলারের দাম চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এতে দাম হয়তো কখনো বাড়বে কিংবা কমবে। কিন্তু সামান্য ওঠানামা করতেই পারে। এতে প্রবাসীরা সুবিধা পাবে। রফতানিকারকরা লাভবান হবে। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমবে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কর্মকান্ড বাড়বে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে।

সম্প্রতি আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয় না বাড়ায় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘ মন্দাভাব থাকার পর গত অর্থবছর থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। জানা গেছে, কোরবানির ঈদে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বেশি অর্থ দেশে পাঠানোয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই সূচক বেড়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, এছাড়া বাজেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়ায় রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে সুখবর নিয়ে শুরু হয়েছিল নতুন অর্থবছর। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১৬০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। রেমিট্যান্সের ওই অংক ছিল মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আর গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে ২১ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। জুলাই মাসের ধারাবাহিকতায় আগস্ট মাসের শুরুতেও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ১২ আগস্ট কোরবানির ঈদ উদযাপিত হয়। তার আগে ৯ অগাস্ট পর্যন্ত রেমিট্যান্সের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, ১ অগাস্ট থেকে ৯ অগাস্ট পর্যন্ত ৭১ কোটি ৬২ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে।

রোজার ঈদে প্রবাসীরা দেশে বেশি অর্থ পাঠানোয় মে মাসে ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্সে আসে; যা ছিল মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তার আগে এক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে, ১৫৯ কোটি ৭২ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ রেমিট্যান্স বেশি পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ডলার

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
২৫ জানুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ