Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

২১ আগস্টের জন্য বিএনপি হলে পিলখানাসহ ১০ বছরের ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী -রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২২ আগস্ট, ২০১৯, ১:০২ পিএম

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, যেকোন সরকারের আমলে কখনও কখনও অনাকাক্সিক্ষত এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার জন্য সেই সরকার দায়ী হতে পারে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহুমূখী চক্রান্তকারীদের এজেন্টরা দেশে-দেশে নানা নাশকতা করেছে। ২১ আগস্টের জন্য যদি বিএনপি সরকার দায়ী হয়, তাহলে পিলখানা হত্যাকা-সহ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে যত হত্যাকা-, বোমা হামলা হয়েছে তার জন্য কেন আওয়ামী লীগ সরকার দায়ী হবে না? বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জামায়াত জোটের মদদ ছাড়া দিনে-দুপুরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। ২১ আগস্টের ঘটনায় খালেদা জিয়ার সহযোগিতা থাকলেও তাকে আসামি করা হয়নি। তিনি তো প্রধানমন্ত্রী ছিলেন-তার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব ছিল।’

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি সরকারের সময়ে ঘটনার জন্য যদি বিএনপি দায়ী হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পিলখানায় সেনা সদস্যদের হত্যাকা-, মুক্তচিন্তার ব্লগার, যাজক-পুরোহিত-ইমাম-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-লালন সাধকদের হত্যাকা-ের জন্য কেন আওয়ামী সরকার দায়ী হবে না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীনই তো যশোরের উদীচির অনুষ্ঠানে, খুলনার কাদিয়ানী মসজিদে, ঢাকায় সিপিবি’র সমাবেশে, রমনায় ছায়ানটের অনুষ্ঠানে, গোপালগঞ্জে ক্যাথলিক গীর্জায়, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ অফিসে, বাগেরহাটের কলেজ মাঠে আক্রমণ ও বোমা হামলা হয়েছে এবং গোপালগঞ্জে দুটি শক্তিশালী তাজা বোমা উদ্ধার হয়েছে। তাহলে কি এর দায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী সরকারের ওপর বর্তায় না? এসব ঘটনাতো তাদের আমলেই হয়েছে।

তিনি বলেন, গুম-খুন ও বিচার বহির্ভূত হত্যা-ের ঘটনা তো বোঝাই যায় যে, এগুলির সাথে কারা জড়িত। কিন্তু এই ২১ আগস্টের বিচারাধীন মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী ও নেতারা নির্বিঘেœ এবং ক্রমাগত এমন বক্তব্য রেখে যাচ্ছেন যা মামলার রায়কে প্রভাবিত করে আসছে।

কিছু গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে অভিযোগ করে রিজভী বলেন, কেবল প্রধানমন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই নন, আমরা বিস্মিত হয়েছি, দুই-একটি পত্রিকা এবং সরকারি নেতাদের মালিকানাধীন টেলিভিশনে ইনিয়ে বিনিয়ে বেসামাল ভাষায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের ওপর দোষ চাপাতে অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য, প্রকৃত ঘটনা এভাবে মিথ্যাচার আর অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণের কাছে বিশ্বাসযাগ্য করা যাবে না।

বিএনপির এই নেতা বলেন, প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগ একুশে আগস্ট বোমা হামলা মামলা নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনীতি করছে। মূলত: ২১ আগস্টের ঘটনা ছিল গভীর নীল নকশার অংশ, যে নীল নকশার সাথে ক্ষমতাসীনরা জড়িত কি না তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই মামলার সামগ্রিক সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতো। কিন্তু তা না করে সুপরিকল্পিত নীলনকশা অনুয়ায়ী এই ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক কায়দায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করে আসছে আওয়ামী লীগ। তার বড় প্রমাণ কথিত সম্পূরক চার্জশীটের নামে এই মামলায় তারেক রহমানকে জড়িয়ে ফরমায়েশী রায়ে সাজা দেয়া। যা ছিল সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, গভীর ষড়যন্ত্রমূলক ও দীর্ঘদিনের মাস্টারপ্ল্যানের ফসল।

২১ আগস্টের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, গ্রেনেড হামলায় হতাহতের ঘটনা মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক। আইভি রহমানসহ অনেক নারী-পুরুষের জীবননাশ ও আহত হওয়ার নৃশংস ঘটনায় আমরা তখনও নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছি-এখনও জানাই।

চার্জশিটে তারেক রহমানের নাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে অভিযোগ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের সময়ও মামলার চার্জশিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ছিল না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাদের একান্ত অনুগত, বিশ্বস্ত ও দলীয় লোক আব্দুল কাহার আকন্দকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয় শুধুমাত্র বিএনপি নেতাদেরকে বিপদাপন্ন করার জন্য। তার আগেই কাহার আকন্দ পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে অবসরে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন, এমনকি ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে নৌকার পক্ষে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও প্রতিহিংসা পূরণের জন্য তাকে পুলিশ বিভাগে ফের নিয়োগ দিয়ে এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা করা হয় ২০০৯ সালে। দলীয় চেতনার তদন্ত কর্মকর্তা কাহার আকন্দকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল এ মামলায় তারেক রহমানকে জড়ানো। পরে ২০১১ সালে তারেক রহমানের নাম সম্পূরক চার্জশিটে অন্তর্ভূক্ত করে শেখ হাসিনার মনোবাসনা পূরণ করা হয়। পূর্ব পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে চার্জশিটে তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য একটাই- তারেক রহমানকে এই মামলায় ফরমায়েশী রায়ে তাঁকে সাজা দেয়া। তারেক রহমানসহ বিএনপি সরকারকে জড়িত করার ক্ষমতাসীনদের সুস্পষ্ট নীলনকশা নিয়ে পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই-যা দু:খজনক।

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ১/১১ এর পর ১৬৪ ধারায় মুফতি হান্নানের জবানবন্দিতে তারেক রহমানের নাম ছিল না। শুধু এ মামলায় তারেক রহমানের নাম বলানোর জন্য অন্য মামলায় ৪১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক ও নির্মম নির্যাতন করা হয় মুফতি হান্নানকে। তার হাত-পায়ের নখ পর্যন্ত উৎপাটন করে ফেলা হয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই এ ধরনের নজির নেই। ৪১০ দিন রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে মুফতি হান্নানকে দিয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের নাম বলতে ও তথাকথিত স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেন কাহার আকন্দ-যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। একই ব্যক্তির একই মামলায় দুই বার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির নজিরও নেই।’পরবর্তী সময়ে আদালতে আবেদন করে মুফতি হান্নান তার তথাকথিত স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যও প্রত্যাহার করে নেন এবং তার ওপর বর্বোরচিত নির্যাতনের বিবরণ দেয়।

সমাবেশস্থল নিয়ে আওয়ামী লীগ লুকোচুরি করেছে অভিযোগ করে বিএনপির অন্যতম এই শীর্ষ নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সমাবেশ শুরুর দুই ঘণ্টা আগেও জানত না সমাবেশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে হবে। সেখানে মুফতি হান্নান কিভাবে দুই দিন আগেই জেনেছিলেন সমাবেশ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে হবে? কার সিদ্ধান্তে সমাবেশস্থল মুক্তাঙ্গন থেকে রাতারাতি সরিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে নেওয়া হয়েছিল? মুফতি হান্নান তার স্বীকারোক্তিতে বলেছিলেন, মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের সভার কথাটি তিনি জানতেন। আবার স্বীকারোক্তিতে বলেছেন-বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছে এবং সে জন্য তিনি তার বাড্ডার বাসা থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দিকে রওয়ানা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, মুফতি হান্নান মুক্তাঙ্গনে সভার কথা জেনে কেন শুরু থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছিল? মুফতি হান্নান সভার স্থান পরিবর্তনের সংবাদ পেয়েছিল তাহলে কে তাকে এ সংবাদটি দিয়েছিল? মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তিতে গ্রেনেড নিক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বন্দুক ব্যবহারের কথা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় ও সিকিউরিটি অফিসার নাজিব আহমেদ বলেন, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বুলেটপ্রুফ গাড়িতে অসংখ্য গুলি করা হয়েছে। এ বন্দুক ও গুলি এলো কোথা থেকে?’

রিজভী বলেন, ২০০৮ সালের ১১ জুন বর্তমান আইজিপি ও তৎকালীন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি জাবেদ পাটোয়ারীর তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় গ্রেনেড হামলা চালায় হরকাতুল জিহাদ। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে কোথাও তারেক রহমান বা বিএনপির নাম ছিল না। এই ঘটনার তদন্ত করতে তৎকালীন বিএনপি সরকার মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইকে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এফবিআইকে তদন্ত কাজে কোনো প্রকার সহায়তা করা হয়নি। এমনকি শেখ হাসিনাকে বহনকারী গাড়িটিও দেখতে দেওয়া হয়নি। কেন তারা সুষ্ঠু তদন্ত করতে দিলো না-এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। এরকম অনেক প্রশ্নের কোন সমাধান হয়নি আজো। এই প্রশ্নগুলোর সমাধান হলেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য।



 

Show all comments
  • Sohrab hosain valuka ২২ আগস্ট, ২০১৯, ১:১৯ পিএম says : 0
    এফ বি আই এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হবে। তাতে প্রমাণ হবে 21 আগস্টের হত্যাকান্ড এবং পিলখানা হত্যাকান্ডের আসল অপরাধী কারা।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রিজভী


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ