Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

ডেঙ্গু চিকিৎসায় স্যালাইন সঙ্কট

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ২৯ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০১ এএম

সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় আইভি ফ্লুইডের (স্যালাইন) মাত্র পাঁচ শতাংশ সরবরাহ করছে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ)। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইরের থেকে কয়েকগুণ বেশি দামে স্যালাইন কিনতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এতে মোটা অঙ্কের অর্থের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। যদিও চাহিদার পুরোটাই এই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করার কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের দাবি-সক্ষমতার অভাবেই মূলত চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। তবে সংশ্লি­ষ্টদের অভিযোগ, পুরো চাহিদা মিটাতে না পারলেও স্যালাইন উৎপাদন প্রতিদিন আরও কয়েক হাজার ব্যাগ বাড়ানো সম্ভব। ‘রহস্যজনক’ কারণে এটি করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ডেঙ্গু রোগীকে সুস্থ করে তুলতে দিনে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ ব্যাগ স্যালাইনের প্রয়োজন হয়। এটি নিশ্চিত করতে না পারলে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে রোগী।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ১ হাজার ১৫৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যা গত ২৪ ঘণ্টার (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) তুলনায় ১৪২ জন কম। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

স্যালাইন সরবরাহ প্রসঙ্গে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফার্মাসিষ্টি মো. আমিনুল বলেন, বর্তমানে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যাগ আইভিফ্লুইড প্রয়োজন হয়। কিছুদিন আগে যখন রোগীর চাপ আরও বেশি ছিল তখন দিনে ৬ থেকে ৭ হাজার ব্যাগ আইভিফ্লুইড লাগতো। তিনি বলেন, ঈদের পরে আইপিএইচ থেকে আমরা কোন আইভিফ্লুইড সংগ্রহ করিনি। কিন্তু ঈদের আগে আমরা যে পরিমাণ আইভিফ্লুইড চাইতাম আইপিএইচ থেকে সর্বোচ্চ তার ২০ শতাংশ সরবরাহও করা হতো। আমিনুল আরও বলেন, রোগীদের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ফ্লুইড প্রয়োজন হয় যেমন- নরমাল স্যালাইন, ডিএনএস, হার্ডসন, প্লাজমাসল ইত্যাদি। কিন্তু আইপিএইচ সব ধরনের স্যালাইন একইসঙ্গে সরবরাহ করতে পারে না।
রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিন উদ্দিন খান বলেন, তাদেরও বাইরে থেকে আইভিফ্লুইড কিনতে হচ্ছে। কারণ চাহিদা অনুযায়ী আইপিএইচ ফ্লুইড সরবরাহ করতে পারছে না। গড়ে কি পরিমাণ ফ্লুইড লাগছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি ফ্লুইড লাগছে। রোগী বাড়লে ফ্লুইড বেশি লাগে আবার রোগী কমলে এটার চাহিদাও কমে।

সোহরাওয়ার্দী ও মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানায়, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরুর পর হাসপাতাল থেকে অতিরিক্ত চাহিদা দেয়া হলেও আইপিএইচ তার খুব সামান্যই সরবরাহ করতো পারতো। এতে রোগীর চিকিৎসা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে রোগীর স্বজনদের মধ্যেমে হাসপাতালের বাইরে থেকে স্যালাইন কিনিয়ে আনা হতো। একপর্যায়ে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নির্বিঘœ করতে ফ্লুইড কেনার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতালগুলো। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আইপিএইচ-এর এনওসি ছাড়া বাইরে থেকে স্যালাইন কেনা যাবে না। তাই তাদের কাছে এনওসি চাওয়া হয়। কিন্তু এনওসি দিতেও গড়িমসি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় ফ্লুইডের চাহিদাও অনেক বেড়েছে। তবে আইপিএইচ-এর উৎপাদন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দৈনিক চাহিদার প্রায় সমান। অথচ রাজধানীতেই ১২টি প্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া সারাদেশে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। সেখানেও ফ্লুইডের প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ছাড়াও অন্যান্য রোগী সেবা নেন, যাদের স্যালাইন প্রয়োজন হয়।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সুলতান মো. শামসুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ার পর হাসপাতালগুলো থেকে যে চাহিদা এসছে, আমরা তার ৫ শতাংশ সরবরাহ করতে পারছি। এমনকি স্বাভাবিক সময়েও আমাদের পক্ষে প্রয়োজন অনুযায়ী আইভিফ্লুইড উৎপাদন ও সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আইভিফ্লুইড উৎপাদন মেশিনটি অনেক পুরানো। এটির উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া মেশিনে অনেক ত্রæটি সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। এমনকি ছুটির দিনে উৎপাদন অব্যহত রাখা হয়েছে। এনওসির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা আবেদন করেছে তাদের সবাইকে এনওসি দেয়া হয়েছে। হয়তো যাচাই-বাছাই করতে কিছুটা সময় লেগেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আইভিফ্লুইড বিভাগের প্রতিদিন গড় উৎপাদন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্টভবে জানাতে না পারলেও ৫ থেকে ৬ হাজার ব্যাগ উৎপাদন হয় বলে জানান।

তবে আইপিএইচ’র সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেশিনের সক্ষমতা মাসে তিন লাখ। সেখানে মাসে উৎপাদন হচ্ছে এক থেকে দেড় লাখ। সরকারি এই প্রতিষ্ঠান ৫০০ মিলি স্যালাইন হাসপাতালে বিক্রি করে ২১ টাকা ৫০ পয়সা। আর বাজার থেকে একই স্যালাইন কিনে হাসপাতালে সরবরাহ করতে হচ্ছে ৬০ টাকা থেকে ৯০ টাকা। আর আইপিএইচ’র উৎপাদিত ১০০০ মিলি স্যালাইনের মূল্য ৫৪ টাকা। এটি বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে ১২০ টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমাজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ১১৫৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ঢাকায় ৫৫১ জন এবং ঢাকার বাইরে ৬০৬ জন। গত এক জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬৭ হাজার ২২১ জন। এরমধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ৬১ হাজার ৮২২ জন। যা মোট আক্রান্ত রোগীর ৯২ শতাংশ। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ২২২ জন। এরমধ্যে ঢাকার ৪১টি সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৮৮২ জন এবং ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৩৪০ জন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ডেঙ্গু

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ