Inqilab Logo

মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ০১ ভাদ্র ১৪২৯, ১৭ মুহাররম ১৪৪৪
শিরোনাম

ভারতে বর্ণবাদের শিকার আফ্রিকার ছাত্রদের কথা : আমরা ভীতিগ্রস্ত

প্রকাশের সময় : ১১ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক : ওডোল ইমানুয়েল অপিয়েমি নামের নাইজেরীয় যুবকটি প্রতিদিন যখন তার নয়াদিল্লীর বাসা ছেড়ে বের হন তখন ভয় ও ক্রোধের মিশ্র অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরে। তিনি অটোরিকশা নিলে কিংবা মেট্রোতে চড়লে, সব্জি কিনতে গেলে বা গাড়ি রাখার জন্য একটি জায়গা খোঁজার সময়ও এ অনুভূতি সাথী হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, আমি যখন মেট্রোতে চড়ি, লোকজন আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। এমনকি বয়স্ক লোকেরাও মনে করে যে আমার সাথে শরীরের স্পর্শ লাগলে তাদের রোগ হতে পারে। অধিকাংশ ভারতীয়ই আফ্রিকানদের সাথে এ আচরণ করে।
উন্নত শিক্ষালাভ ও কাজের সুযোগের আশায় লক্ষ লক্ষ আফ্রিকান ভারতে অবস্থান করছে। ভারতীয় সমাজের কঠোর শ্রেণিবিন্যাসের কারণে কালো চামড়া তাদের একেবারে নি¤œস্তরে স্থাপন করেছে। ভারতীয়রা আফ্রিকান নারীদের অবধারিতভাবে পতিতা ও পুরুষদের মাদক ব্যবসায়ী বলে গণ্য করে।
আফ্রিকানরা ভারতে প্রতিদিন যে অমর্যাদার শিকার হচ্ছে তা পুলিশ দেখত না, স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম সে কথা একবারেই বলত না। কিন্তু ২০ মে পরিস্থিতি পাল্টে যায় যখন নয়াদিল্লীতে অটো রিকশা ভাড়া করার মত তুচ্ছ ঘটনায় মাসুন্ডা কিটাডা ওলিভার নামে কঙ্গোর এক ছাত্রকে তিন ভারতীয় পিটিয়ে হত্যা করে।
এ হত্যার ঘটনায় দ্রুত ন্যায়বিচার চেয়ে নয়াদিল্লীর আফ্রিকান ছাত্র, কূটনীতিক ও ব্যবসা মালিকরা সমাবেশ করে। নয়াদিল্লীর আফ্রিকান মিশন প্রধানরা ভারতে বর্ণবাদ ও আফ্রো-ফোবিয়া মোকাবিলার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, দিল্লীতে বিরাজমান ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিরাপত্তা যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছে ততক্ষণ নতুন কোনো ছাত্র-ছাত্রীকে ভারতে না পাঠাতে স্ব স্ব সরকারকে সুপারিশ করা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই।
হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্বাভাবিক দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ঘটনায় জড়িত দু’জনকে পুলিশ সেদিনই গ্রেফতার করে এবং তৃতীয় জন পলাতক রয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ টুইট করেছেন যে তার মন্ত্রণালয় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তবে মন্ত্রণায় এটাও বলেছে যে আফ্রিকানদের সংক্রান্ত সকল অপরাধমূলক কাজই বর্ণবাদী ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত হবে না।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মোকাবেলার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সরকারের ব্যয়ে এবং দ্রুত সময়ে ভারত-আফ্রিকা এক শিল্প প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। নয়াদিল্লীতে আফ্রিকান ছাত্ররা এক প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করলেও আফ্রিকান ছাত্র গ্রুপগুলোর সাথে ভারত সরকারের এক সমঝোতার ফলে তা স্থগিত করা হয়।
পুলিশ ও সরকার নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আফ্রিকান প্রতিবেশীদের ব্যাপারে স্থানীয় অধিবাসীদের সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টায় ওয়ার্কশপ আয়োজনের চেষ্টা করছে।
অলিভারের মৃত্যু ছাড়াও তার আগে আরো বিভিন্ন ঘটনা ঘটে। গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণের বেঙ্গালুরুতে এক সুদানি ছাত্রের গাড়ির ধাক্কায় এক ভারতীয় মহিলা আহত হওয়ার পর উত্তেজিত জনতা তানজানিয়ার এক মহিলাকে মারধর করে ও নগ্ন করে ফেলে। ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে এক ভিডিওতে দেখা যায়, নয়াদিল্লী মেট্রো স্টেশনে একটি নিরাপত্তা বুথে তিন আফ্রিকানকে পেটানো হচ্ছে। তারা ভয়ে কাচ ঘেরা বুথের দেয়ালে উঠলে বিরাট এক জনতা কয়েক মিনিট তাদের খালি হাতে ও লাঠি দিয়ে পেটায়। তখন পুলিশ অনুপস্থিত ছিল।
স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে এ খবর প্রকাশিত হলেও শত শত সংবাদপত্র তা ছাপেনি।
ভারতে কুসংস্কার খোলাখুলি বিষয়। সংবাদপত্রের পাত্র-পাত্রী চাই কলামগুলোতে জাতিধর্মের ব্যাপারে কড়াকড়ি শর্ত আরোপ করা হয়। নয়াদিল্লীরও মুম্বাইয়ের বাড়িওয়ালারা বর্ণ-ধর্মে না মিললে বাড়িভাড়া দেন না।
উত্তরপূর্ব ভারতের লোকদের চেহারায় এশীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা নিয়মিতভাবে হয়রানির শিকার। তাদের রাস্তায় নাম ধরে ডাকা হয়।
তবে সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হয় আফ্রিকানরা। যে দেশের লোক উজ্জ্বল রঙের চামড়ার প্রতি দুর্বল এবং চামড়া উজ্জ্বল করার জন্য ওষুধ ব্যবহার করে , সেখানে কালো চামড়ার লোকেরা ভীতি ও ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের শিকার।
দরিদ্র এলাকা ছাড়া সর্বত্র বাড়িওয়ালারা আফ্রিকানদের প্রত্যাখ্যান করেন। আবর দরিদ্র এলাকায়ও তাদের কাছ থেকে বেশি বাড়িভাড়া নেয়া হয়। নয়াদিল্লীর ছাতারাপুর এলাকায় সিঙ্গল রুম ও বাথরুমবিশিষ্ট একটি বাসার স্বাভাবিক ভাড়া ৬ থেকে ৭ হাজার রুপি হলেও আফ্রিকানদের কাছ থেকে নেয়া হয় ১৫ হাজার রুপি।
অপরিচিতরা তাদের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখায় ও হাসে অথবা দলবেঁধে তাদের উপর হামলা চালায়। সম্প্রতি ছাতারাপুরে এক বর্ণগত সচেতনতামূলক অধিবেশনে ভারতীয় বাড়িওয়ালা ও তাদের আফ্রিকান ভাড়াটের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিষয়টি ধরা পড়ে।
দক্ষিণ সুদানের ২৩ বছর বয়স্কা এক ছাত্রী ন্যান্সি জোসেফ বলে, আমি ভীতিগ্রস্ত। এ ভয়ের কারণে বন্ধুরা রাতে আমার বাড়িতে আসে না। অটোরিকশা চালক আমাকে নিতে চায় না। তাকে দেখলে ভারতীয়রা জড়ো হয় আজেবাজে নাম ধরে ডাকে।
এডি কিং নামের এক নাইজেরীয় ছাত্র বলেন, দিল্লী আমার দেখা সবচেয়ে খারাপ শহর। আমি ক্লাসে সহপাঠিদের সাথে কথা বলতে পারি না। তারা আমার প্রশ্নের জবাব দেয় না। এমন ভান করে যে আমার কথা বোঝে না।
বাড়িওয়ালারা বলেন, আফ্রিকান ভাড়াটেরা সারাদিন মদ খায়, রাতে জোরে গান বাজায়। তারা ভালো নয়। এক বাড়িওয়ালা উমেদ সিং বলেন, তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিয়ার পান করে। আমরা সেখান দিয়ে যেতে ভয় পাই।
এই সচেতনতা অধিবেশন কাউকে সচেতন করতে পেরেছে কিনা তা পরিষ্কার নয়। পুলিশ দু’পক্ষকেই একে অপরকে বোঝার জন্য বলছে।
কিং বলেন, আগামী বছর পড়া শেষ করে তিনি দেশে চলে যাবেন। তিনি বলেন, আফ্রিকান লোকেরা ভারতীয়দের সাথে কাজ করতে পারবে না। এটাই সত্য।
বাসে উঠতে বা রাস্তায় আফ্রিকানদের শুনতে হয় যে কেউ তাকে হাবশি বলে ডাকছে। অপিয়েমি বলেন, সম্প্রতি তিনি গাড়ি পার্ক করতে গেলে শুনতে পান, একজন তাকে বাঁদর বলছে। তিনি বলেন, আমরা ভীতিগ্রস্ত। আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারব না। তারা ইট বা পাথর দিয়ে আমাদের মাথা ফাটিয়ে দেবে। সূত্র এপি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারতে বর্ণবাদের শিকার আফ্রিকার ছাত্রদের কথা : আমরা ভীতিগ্রস্ত
আরও পড়ুন