Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০৯ ভাদ্র ১৪২৬, ২২ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার ও স্বরূপ

প্রকাশের সময় : ১২ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ড. এ এইচ এম মোস্তাইন বিল্লাহ

॥ ছয় ॥
তাদের (কোলকাতার সম্মানিত জনগোষ্ঠীর) আট হাজার লোকের স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবাদলিপি সরকার বরাবর পেশ করে। বাস্তবে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুদান ও শিক্ষার্থীদের স্টাইপেন্ড বন্ধ করার আদেশটি কার্যকর সম্ভব হয়নি। যদিও তা বাতিল করা হয়নি। পরবর্তীতে অফসরহরংঃৎধঃরড়হ ড়ভ খড়ৎফ অঁপশষধহফ তা আংশিক পরিবর্তন করে, তাকে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থীদের ও হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থীদের আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করা হযেছিল। ফলে, স্কলারশীপ বাতিল করার প্রভাবের আংশিক ক্ষতিপূরণ সম্ভব হয়ে ছিল। এ নিদের্শনামার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় কলেজগুলোর কার্যক্রম আর কোন অভিযোগ ছাড়াই যথারীতি চলতে থাকে (ঐরংঃড়ৎু ড়ভ বফঁপধঃরড়হ রহ ওহফরধ. পৃ : ৮৯)।
মুসলমানদের চাপের মুখে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা
ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের শাসনাধীন অঞ্চলে মিশনারীজগুলো কর্মকা- ও নিয়ন্ত্রণ করতো (আলী ১৯৬৫; রিয়াজ ২০১০: পৃ:৭৭)। মিশনারীজদের যে কোন কর্মকা-ের জন্য কোম্পানীর অনুমতি নিতে হতো, তাছাড়া তাদের নানাবিধ কর্মকা-কে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী নিরুৎসাহিত করত। নিঃসন্দেহে কোম্পানীর এ ধরনের নীতির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল:-
‘অভৎধরফ ড়ভ ঃযব ৎবধপঃরড়হ ঃযধঃ সবফফষরহম রহ ঃযব ৎবষরমরড়ঁং নবষরবভং ড়ভ রঃং ওহফরধহ ংঁনলবপঃং সরমযঃ ঢ়ৎড়াড়শব, ঃযব ঊধংঃ ওহফরধ ঈড়সঢ়ধহু সধফব রঃ পষবধৎ ঃড় ঃযবংব ংঁনলবপঃং ধং বিষষ ধং ঃড় রঃং ড়হি ইৎরঃরংয ড়ভভরপরধষং ঃযধঃ রঃ ধিং হড়ঃ রহ ওহফরধ ঃড় পযধষষবহমব ড়ৎ ঁহফবৎসরহব বীরংঃরহম ৎবষরমরড়ঁং নবষরবভং’ (ঝবঃয ২০০৭ : ঢ়২৭-২৮. জরধু, ২০১০:ঢ়১৭)
মিশনারীজগুলো পরবর্তী পর্যায়ে ইস্ট ইন্ডিয়ার সংরক্ষণশীল শিক্ষানীতিকে বিশেষ করে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি এবং মাতৃ ভাষা চর্চায় প্রভাব সৃষ্টি করে ছিল। তাছাড়া মিশনারীজদের কর্মকা- একপর্যায়ে হিন্দু মসলিম উভয় সম্প্রদায়কেই বৃটিশবিরোধী করে তুলেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ধর্মীয় নিরপেক্ষতার কথা বললেও মুসলিম শক্তির কাছে অনেকটা হার মানতে হয়েছিল। যেমন তারা ওয়ারেন- হেস্টিংস বাংলার গভর্নর জেনারেলের আমলে ১৭৮০ সালে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে।
হেস্টিংস তাঁর এক বক্তব্যে এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছিলেন যে রাজনৈতিক বিবেচনায়ই আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে।
“ঞযব সধফৎধংংধয ধিং বংঃধনষরংযবফ ঃড় পড়হপরষরধঃব ঃযব গধযড়সবফধহং ড়ভ ঈধষপঁঃঃধ ৃ ঃড় য়ঁধষরভু ঃযব ংড়হং ড়ভ গধযড়সবফধহ মবহঃষবসবহ ভড়ৎ ৎবংঢ়ড়হংরনষব ধহফ ষঁপৎধঃরাব ড়ভভরপবং রহ ঃযব ংঃধঃব, ধহফ ঃড় ঢ়ৎড়ফঁপব পড়সঢ়বঃবহঃ ড়ভভরপবৎং ভড়ৎ ঈড়ঁৎঃং ড়ভ ঔঁংঃরপব ঃড় যিরপয ংঃঁফবহঃং ড়ভ ঃযব গধফৎধংংধয ড়হ ঃযব ঢ়ৎড়ফঁপঃরড়হ ড়ভ পবৎঃরভরপধঃবং ড়ভ য়ঁধষরভরপধঃরড়হ বিৎব ঃড় নব ফৎধভঃবফ ধং াধপধহপরবং ড়পপঁৎৎবফ. (ছঁড়ঃবফ রহ ঘধরশ ধহফ ঘঁৎঁষষধয, ২০০০: ৩০ ধহফ জরধু, ২০১০ : ৭৭)
আলীয়া মাদ্রাসার পূর্বের পদক্ষেপ ছিল হিন্দু ও মুসলমানদের ভিন্ন ভিন্ন আইন প্রবর্তন করা। ১৭৭২ সালে ওয়ারেনহেস্টিংস ও উইলিয়াম জোন্স সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, মুসলমানদের কোর’আনী আইন আর হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য শাস্ত্রীয় আইন প্রযোজ্য হবে (য়ঁড়ঃবফ রহ জঁফড়ষঢ়য ধহফ জঁফড়ষঢ়য, ২০০১: ৩৩–৩৬ ধহফ ২০১০ : ৭৭)। কলকাতা আলীয় মাদ্রাসা “দরসে নিজামী” পাঠ্যসূচি প্রবর্তন করে যা ১৭৯০ সাল পর্যন্ত কার্যকরি ছিল। পরবর্তীতে ১৭৯১ সালে প্রথম প্রিন্সিপাল পরিবর্তনের মাধ্যমে এ পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। একই সালে কোম্পানী সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করে কলকাতায়। এই গুলি নিঃসন্দেহে অত্যাবশীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরই অংশ ছিল।
ইংরেজদের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ইংলিশ মেডিয়ামে চালু করা এবং ইউরোপীয় জ্ঞান বিজ্ঞান সম্প্রসারণ করা। এ উদ্দেশ্যে সনদ (ঈযধৎঃবৎ) ও নবায়ন করা হয়েছিল ১৮১৩ সালে। এ জন্যে ইতোপূর্বে ১৭৯২ সালে এৎধহঃ’ং ংঃঁফু করেছিল। আর এৎধহঃ’ং ংঃঁফু সুপারিশে ও ছিল শিক্ষার মাধ্যম হবে ইংরেজি, তাতে সাধারণের মধ্যে স্থানীয় এলিটরা এগিয়ে যাবে এবং ফার্সীর স্থলে ইংরেজি ভাষা হবে দাপ্তরিক ভাষা (এধৎম, ২০০৩; বিয়াজ ২০১০ : পৃ ৭৮)
১৮৩৫ সালের বৃটিশ শাসকদের পাশ্চাত্য এবং ইংরেজি দাপ্তরিক ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী। এই নীতি-প্রবর্তনের তাৎক্ষণিক পরিণাম ছিল মাদ্রাসা শিক্ষা ও অন্যান্য সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি সহায়তা পরিত্যাগ/বন্ধ করে দেয়া, এই নীতিতে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছিল; (ক) ফার্সি স্থলে ইংরেজিকে উচ্চ আদালতের দাপ্তরিক ভাষা (১৮৩৫ সালের আইন) এবং (খ) ১৮৩৭ সালের আইন মধ্যমে ও নি¤œ আদালতে আঞ্চলিক ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রবর্তন করা। এই দুটি সিদ্ধান্তের ফলে মাদ্রাসায় ফার্সি ভাষায় শিক্ষিতদের চাকুরীর সুযোগ সংকোচিত হয়ে যায়। ১৮৪৪ সালে তখন গভর্নর জেনারেল হেনরি হাডির্ং যখন ঘোষণা দিয়েছিল যে, একমাত্র পাশ্চাত্য জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিতরাই সরকারি চাকরির যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এর ফলে ফার্সি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং মাদ্রাসার শিক্ষিত যুবকদের চাকুরীর প্রাপ্তির যোগ্যতা শূন্যে দাঁড়ায়।
১৮৫৩ সালে ঊধংঃ ওহফরধ ঈড়সঢ়ধহু ঈযধৎঃবৎ নবায়ন উপলক্ষ্যে বৃটিশ পার্লামেন্ট প্রথমবারের মত ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা একটি তদন্ত অনুষ্ঠান করে। ফলে ডড়ড়ফ’ং উবংঢ়ধঃবফ ১৮৫৪ সৃষ্টি হয়, যা ঈযধৎষবং ডড়ড়ফ “ঞযব ইড়ধৎফ ড়ভ ঈড়হঃৎড়ষ ভড়ৎ ওহফরধ”-এর সভাপতির নামানুসারে হয়ে ছিল। ডড়ড়ফ’ং উবংঢ়ধঃবফ অতিদ্রুত বাস্তবায়ন করা হল। শিক্ষা ব্যবস্থা পাশ্চাত্য করণ একটি “পাবলিক এজেন্ডা” হিসেবে বিবেচিত করা হল। ইংরেজি শিক্ষা প্রসার ও সম্প্রসারিত হতে থাকলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামো পরিবর্তন হয়ে গেল। এর ফলে স্থানীয় সাধারণ প্রতিষ্ঠান, বিশষত মাদ্রাসা শিক্ষা মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুদান প্রাপ্তির অযোগ্য হয়ে গেল। পাঠ্যসূচিতে যা পরিবর্তন আনা হয়ে ছিল তা হল:
“ৎবয়ঁরৎবফ ধফড়ঢ়ঃরড়হ ড়ভ ধ পঁৎৎরপঁষঁস ভড়পঁংবফ ড়হ সধঃয, ংপরবহপব, ধহফ ষধহমঁধমব, ধহফ ৎবসড়াধষ ড়ভ ধষষ ৎবভবৎবহপব ঃড় ৎবষরমরড়হ ঃড় ধ ফরংপৎবঃব ‘ৎবষরমরড়হ’ পষধংং. ওঃ ধষংড় ৎবয়ঁরৎবফ ঃযধঃ বফঁপধঃড়ৎং ৎবপবরাব ভড়ৎসধষ ঃবধপযবৎ ঃৎধরহরহম, যিরপয মৎধফঁধষষু ংযরভঃবফ ঃবধপযরহম ভৎড়স ৎবংঢ়বপঃবফ ষড়পধষ ভরমঁৎবং, ড়ভঃবহ ৎবষরমরড়ঁং ধঁঃযড়ৎরঃরবং যিড় ফরফ হড়ঃ ঃবধপয ধং ধ ঢ়ৎরসধৎু ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ, ঃড় ভঁষষ-ঃরসব বফঁপধঃড়ৎং রিঃয ঃবধপযরহম পবৎঃরভরপধঃবং রংংঁবফ নু পড়ষড়হরধষ ধঁঃযড়ৎরঃরবং.” (খধহমড়যৎ, ২০০৫: ১৬২; জরধু ২০১০ : ৭৯)।
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে শিক্ষাব্যবস্থা পাশ্চাত্যকরণ
এৎধহঃ’ং রহ ধরফ-এ পলিসি চালু করার প্রাথমিক পর্যায়ে বেশী সুবিধা পেয়েছিল মিশনারী স্কুলগুলো, কারণ তারা দ্রুত ইংরেজ শাসকদের ইংরেজি ভাষা ও ইউরোপীয় শিক্ষা গ্রহণে অগ্রগামী হয়েছিল। এর ফলে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে পড়ে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। তাছাড়া এর প্রভাব পড়েছিল স্থানীয় সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায়ও, যেমন বেঙ্গল পাঠশালায়। কেননা মিশনারী স্কুল ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ নিয়ে কাজ করছিল। আর তাদের লক্ষ্য ছিল ধর্মান্তরিত করা (ঝবঃয ২০০৭; বিয়াজ ২০১০ : ৭৯)।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন