Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

রাজপথেই খালেদা জিয়ার মুক্তি

বক্তৃতা-বিবৃতিতে জনগণ হতাশ : প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনায় নেতৃবৃন্দ

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:১৭ এএম, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বক্তৃতা, বিবৃতি দিয়ে, আদালতের ওপর নির্ভর করে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না। তাকে মুক্ত করতে হলে রাজপথে নামতে হবে বলে মনে করেন বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা বলেন, গণতন্ত্র ও বেগম জিয়ার মুক্তি একই সূত্রে গাঁথা। এজন্য আন্দোলন-সংগ্রামের বিকল্প নাই। কারণ গুম হওয়া গণতন্ত্র খুঁজে বের করতে হলে রাস্তায় প্রতিযোগিতা করতে হবে। ঘরে বসে প্রতিযোগিতা করলে আর শুধুমাত্র সুন্দর সুন্দর কথা বললে জনগণ আশ্বস্ত হবে না। জনগণ মুক্তির জন্য ছটফট করছে। হলের ভেতরে শ্লোগান দিয়ে, পোস্টার-ব্যানার লাগিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না। জাতীয় বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে রাজপথে নামতে হবে, তাকে (খালেদা জিয়া) কারাগার থেকে মুক্ত করতে হবে। এই লড়াই জনগণের অধিকারের লড়াই, গণতন্ত্রের লড়াই, পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের লড়াই, এই লড়াইয়ে জিততে হবে। গতকাল (রোববার) বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিএনপির সিনিয়র ও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা এসব কথা বলেন। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শুধু পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে, আর নিজেদের মধ্যে আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে জনগণ হতাশ হবে। এভাবে দেশনেত্রী বেগম জিয়া ও গণতন্ত্র কোনটিই মুক্ত হবে না। আর ষড়যন্ত্রকারীরা আরও আস্ফালন করবে। বড় বড় কথা বলবে। তিনি বলেন, এই সরকার মানুষ খুন, মানুষ গুম করতে পারদর্শী। ৭ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা ধর্ষিতা হচ্ছেন। স্কুল, কলেজ, রাস্তা-খাটে কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়। এই যখন দেশের অবস্থা তখন ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। বিএনপি ৪২ বছর অতিক্রম করার আগেই জনগণকে এ থেকে মুক্ত করতে হবে এবং জনগণের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের অপর নাম খালেদা জিয়া।
বিএনপির এই নেতা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। আর রোহিঙ্গারা লাখ লাখ লোক নিয়ে সভা করে সেটাতে বাধা দেয়া হয় না। রোহিঙ্গা ইস্যু জাতীয় ইস্যু, বাংলাদেশের সমস্যা। এটা চিরস্থায়ী হতে পারে না। দেশি বিদেশী সমস্ত শক্তি ও জাতীয় সমর্থন নিয়ে এটা সমাধান করতে হবে। কিন্তু এটা নিয়ে সরকার রাজনীতি করতে চায়। এই ইস্যুর পর আরো একটি ইস্যু আসবে। আরেক দেশ নাগরিকত্ব তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই নাগরিকত্ব থেকে যারা বাদ পড়বেন তাদেরকে ধাক্কা দেয়া হবে। সেটা কোনদিকে দিবে সেটা ভাববার বিষয়।
তিনি বলেন, কোনদিন কোন রাজনৈতিক নেতা বা নেত্রীর মুক্তি আদালতের ওপর নির্ভর করে না। যে আদালত ও বিচার কার্য্য চলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেখান থেকে ন্যায়বিচার পাবো কিভাবে? যদি ন্যায়বিচার পাবোই তাহলে কারাবন্দি হলো কেন? গয়েশ্বর বলেন, বিএনপি জনগণের দল, বিএনপির দায়িত্ব আছে। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, গণতন্ত্র মুক্ত করার ক্ষেত্রে জনগণের পাশে থাকা। জনগণকে ডাকলে জনগণ আসতে প্রস্তুত। আমাদের ডাকে সাড়া দিবে কিন্তু আমরা নামবো কিনা? সেটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভয়কে যদি জয় করতে না পারি, আর মৃত্যুকে যদি আলিঙ্গন করতে না পারি তাহলে গণতন্ত্র কখনো আলোর মুখ দেখবে না। খালেদা জিয়াও কখনো মুক্ত হবেন না।
অনুষ্ঠানের সভামঞ্চে স্থায়ী কমিটির সব নেতা সামনের সারিতে বসলেও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের আসন হয় পেছনের সারিতে। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনাতে যখন বিএনপি গঠিত হয় তখন আমরা ছিলাম জিয়াউর রহমানের সামনে। আর আজকে ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমাদের বক্তব্য শুনতে হচ্ছে পেছনে বসে।
জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, দলের ঐক্য বজায় রেখে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। এককভাবে কোনো দল আন্দোলন করে স্বৈরাচারকে পতন করাতে পারবে না। স্বৈরাচারকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হলে সেই অস্ত্র হলো জনগণের ঐক্য, এছাড়া কোনো বিকল্প নাই। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ৭৫ বছর বয়সেও কারাবাসের জন্য খালেদা জিয়ার মানসিক শক্তির প্রশংসা করেন আবদুর রব।
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সরকার কোনো ‘বিদেশী’ বন্ধু পাচ্ছে না মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দুই বছর চলে গেলো, দুই্ বার চেষ্টা করেছে একবারের জন্যে একজন রোহিঙ্গাকেও তারা ফেরত পাঠাতে পারেনি। তাদের সম্পূর্ণভাবে কূটনৈতিক ব্যর্থতা, আজকে তাদের বন্ধুও নেই। তারা (সরকার) বড় গলায় বলে যে, চীনের সঙ্গে তাদের নাকী বন্ধুত্ব সুউচ্চ পর্বতের মতো। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আরো বেশি। তাহলে কী হলো? ভারত কী অবস্থান নিয়েছে, চীন কী অবস্থান নিয়েছে? কেনো তাদেরকে এই সরকার বুঝাতে পারছে না, কেনো তাদেরকে পথে আনতে পারছে না। কারণ তাদের (সরকার) হাটুতে জোর নেই। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তারা গোলামী করছে। তারা আজকে বাংলাদেশের অধিকারগুলো, বাংলাদেশের স্বার্থ তারা জলাঞ্জলি দিচ্ছে।
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, আমি খবর নিয়েছি, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ, তিনি এখন হাটতে পারেন না, তার ব্লাড প্রেসার সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। এই অবস্থাও তিনি মাথানত করেননি। তিনি বার বার একই কথা বলছেন যে, এই অন্যায়ের বিচার হবে, অন্যায়কারীরা টিকবে না। জনগন নিশ্চয়ই উঠে দাঁড়াবে এবং জনগন গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনবে এবং যারা বন্দি হয়েছে তাদের ফিরিয়ে আনবে। আমাদের সেই কাজটি করতে হবে।
বিএনপির অন্যতম এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমাদের মধ্যে ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ভুলে গিয়ে আমরা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করি। জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এসময় তিনি বর্তমান নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন দেয়ার দাবি তুলে ধরেন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশে আজ ক্রান্তিকাল। বাংলাদেশ গণতন্ত্র নেই, আইননের শাসন নেই, বিচার বিভাগের স্বাধীন নেই। কোনো সমস্যার এই সরকার কোনো সমাধান করতে পারছে না। সেই প্রেক্ষাপটে আমরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছি। আজকে আমাদের ওয়াদাবদ্ধ হতে হবে যে, দেশে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে প্রথমে আমাদের গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের শ্লোগান হোক, স্বৈরাচার হটাও, দেশ বাঁচাও।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, আগে সবসময় নির্যাতিত-নিপীড়িত, ভুক্তভোগীরা আদালতে যেতেন, তাদের পক্ষে আদালত থাকতেন এবং তাদের অধিকার রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। আজকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সেই চর্চাটা পাল্টে গেছে। যার কারণে আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মী ও আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জেলখানায় এবং আমাদের অনেকেই জেলে যেতে হবে শিগগিরই। যদিও আমরা সেজন্য প্রস্তুত আছি। এসব করে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। সরকারের হস্তক্ষেপে বিচার বিভাগে খালেদা জিয়া সুবিচার পাচ্ছে না উল্লেখ করে তার মুক্তি রাজপথে আন্দোলনেই আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও সহ প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিমের পরিচালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবউন নবী খান সোহেল, মহানগর উত্তরের আহসানউল্লাহ হাসান, অঙ্গসংগঠনের সাইফুল ইসলাম নিরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, শফিউল বারী বাবু, মোস্তাফিজুর রহমান, হেলেন জেরিন খান, মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার।
এছাড়া ২০ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিশের মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোটের অ্যাডভোকেট এম এ রকীব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা নূর হোসেইন কাসেমী, এলডিডির রেদোয়ান আহমেদ, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, ডিএলের সাইফুদ্দিন মনি, পিপলস লীগের সৈয়দ মাহবুব হোসেন প্রমূখ।
এর আগে সকালে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে দলটির প্রতিষ্ঠানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ ও মুনাজাত করেন দলটির সিনিয়র নেতারা। #



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: বিএনপি


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ