Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

সড়কে আর কত প্রাণ যাবে?

প্রকাশের সময় : ১৮ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামে যেন ধারাবাহিক হত্যাকা- চলছে। একটির রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক-মহাসড়কে এই মৃত্যুর মিছিল ঠেকানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও তদারকির অভাবে দুর্ঘটনা এখন অনেকটা মহামারী আকার ধারণ করেছে। মাত্র গত সপ্তাহে চার ঘণ্টার ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু সেতুতে আটটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক সংঘটিত এসব দুর্ঘটনায় মন্ত্রীপুত্রসহ ৭ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো শতাধিক। ঐদিন সারাদেশে আরো ৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় আরো ১০ জন নিহত ২ জন আহত হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে দুই শিশু শিক্ষার্থীর রক্তে। ঘাতক বাস কেড়ে নিয়েছে তাদের প্রাণ। প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সকালে মৎস্য ভবনের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময়ে বাসচাপায় প্রাণ হারায় সাবিহা আক্তার সোনালী। সোনালীর মৃত্যুর প্রতিবাদে সহপাঠীদের সড়ক অবরোধ তুলতে না তুলতেই একইভাবে নিহত হয়েছে আরেক শিক্ষার্থী খাদিজা সুলতানা মিতু। সোনালী জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ পেয়েছিল। সুলতানা সর্বশেষ প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু ২০১৫ সালেই সাড়ে ৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ইতোপূর্বে যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, ২০১৫ সালে সারাদেশে ৬ হাজার ৫৮১টি ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ২১ হাজার ৮৫৫ জন। অবশ্য পুলিশ সদর দফতর বলছে, উল্লেখিত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৪৩২ জন। আহত হয়েছে ১৮৮৩ জন। আর এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ২৩৯১টি। বাস্তবত দেখা যাচ্ছে, আলোচনা-নির্দেশনা-ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল।
গত কিছুদিনে প্রকাশিত রিপোর্ট এবং বাস্তবতার আলোকে বলা যায়, খোদ রাজধানীতে যেসব পরিবহন গণপরিবহনের নামে চলাচল করছে এগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো নামানো, রাস্তা দখল করে রাখা, যাত্রীদের সাথে দুর্ব্যবহার নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বাস-কোচ, মিনিবাস, লেগুনা, হিউম্যান হলার, সিএনজি কোন পরিবহনই নিয়ম মানছে না। ভুয়া চালক ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা আরো বেড়েছে। সেই সাথে যাত্রী সচেতনতার অভাবও মারাত্মকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাথার উপরে ওভার ব্রীজ এবং রাস্তা পারাপারে নির্দিষ্ট স্থান থাকলেও যত্রতত্রভাবে পথচারীরা যাতায়াত করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ সড়কের ফুটপাত হকারদের দখলে। ভিআইপিদের উল্টোদিক দিয়ে যাতায়াত অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ মানুষ এবং গণপরিবহন যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিগনালে আটকে থাকছে সেখানে ভিআইপিদের গাড়ির উল্টো যাত্রা সড়ক অব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট উদাহরণ। এই অনিয়মও অন্য চালকদের বেপরোয়া করে তুলছে। সহজভাবে বললে একথাই সঙ্গত যে, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য বিদ্যমান তার সাথে প্রভাবশালীরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এক শ্রেণীর পুলিশের পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত থাকাও নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ। এ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে গবেষণা কম হয়নি। এমনকি সর্বোচ্চ আদালতও সম্প্রতি দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এতসবের পরেও যাদের হুঁশ হওয়া প্রয়োজন বা জরুরি তাদের যেন কোন বিচলন নেই। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারিভাবেও নানা কারণের কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা যেসব কারণ চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, চালকের অদক্ষতা, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, পুরাতন ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা, বিকল্প যানবাহনের সুবিধা না থাকা। এছাড়াও জাতীয় সড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, পা চালিত রিকশা, ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন যা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও অবাধে চলাচল করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এটা বারবার বলা হচ্ছে, সচেতনতা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সম্ভবত যাদের সচেতনতার কথা বলা হচ্ছে, তাদের কান পর্যন্ত এ কথা পৌঁচছে না। তারা কথা শোনার কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অপ্রিয় হলেও সত্যি, সচেতনতা সৃষ্টিতে যে যার সার্বক্ষণিক ভূমিকা রাখার প্রয়োজন, সেই পুলিশ বাহিনী বিশেষ সময় ছাড়া অসচেতনই থাকছে। প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করলে মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব। গত শনিবারের দুর্ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের একজনকে জনতা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। পুলিশী ভাষ্যমতে, অন্যজনকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দুর্ঘটনার পর দু’একদিন এনিয়ে কথাবার্তা হলেও কিছুদিন পর সবকিছু চাপা পড়ে যায়। এর ফলে এ ধরনের হত্যাকা- বন্ধ হবার পরিবর্তে বেড়েই যাচ্ছে। দ্রুতবিচার ও উপযুক্ত শাস্তির সড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন। অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও উদাহরণযোগ্য সাজার ব্যবস্থা করা জরুরি। সাথে সাথে পথচারীদেরও সতর্ক হতে হবে। সড়ককে মৃত্যু ফাঁদ থেকে রক্ষায় সংশ্লিøষ্টরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন, এটাই কাম্য।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ