Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

বরকতময় মহররমের শিক্ষা

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৫:৫২ পিএম

হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম। ইসলামের তাৎপর্যপূর্ণ মাসগুলোর মধ্যে মহররম অন্যতম। মাসটি মুসলমানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘মহররম’ শব্দের অর্থ পবিত্র, সম্মানিত। কুরআনে কারীমে এ মাসকে হারাম বা সম্মানিত মাস হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ মাসের এক দিকে যেমন রয়েছে ফজিলত, তেমনি অন্য দিকেও রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
মহররম মাস ফজিলতপূর্ণ বিধায় কুরআনে কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জেনে রাখো! এই চারটি মাস বড় ফজিলত ও বরকতপূর্ণ। তোমরা এই মাসগুলোতে গুনাহের কাজ করে নিজেদের ওপর জুলুম করো না’ (সূরা তাওবা)। উল্লিখিত চার মাস বলতে মহররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ মাসকে বুঝানো হয়েছে। তার মধ্যে সর্বপ্রথম হলো মহররম মাস। আল্লামা জাসসাছ বলেন, ‘এই চার মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলোÑ যারা এ মাসগুলোতে ইবাদত-বন্দেগি করবে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে বাকি আট মাস ইবাদত করার শক্তি-সামর্থ্য বাড়িয়ে দেবেন। এমনিভাবে যারা এ চার মাস গুনাহ থেকে বেচে থাকার চেষ্টা করবে, তাদের জন্য অবশিষ্ট আট মাস গুনাহ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়ে যাবে’ (আহকামুল কুরআন)।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা ফরজ ছিলো। দ্বিতীয় হিজরি সনে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার বিধান নাজিল হলে আশুরার রোজা নফল হিসেবে বিবেচিত হয়। আশুরা দিবসে রোজা পালনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। এই দিনে রোজা রাখলে পূর্বের ১ বছরের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ।’ (মুসলিম)
১০ মহররমের রোজার গুরুত্বের বিষয়ে অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ‘নবী করিম সা: যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন মদিনার ইহুদিদের ১০ মহররম রোজা রাখতে দেখে তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এ দিন রোজা রাখো কেন?’ উত্তরে তারা বলল, এ দিনটি অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানিত। কেননা, এই দিনে আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলদের তাদের শত্রু ফেরাউন থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। এ কারণে আমরা রোজার মাধ্যমে ঈদ বা খুশি পালন করি। যেন তার স্মরণ সবসময় বিদ্যমান থাকে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, ‘হজরত মূসা আ:-এর বিজয় দিবসের প্রশংসায় রোজা পালনে আমরা তোমাদের থেকে বেশি অধিকারী।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা: নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবায়ে কেরাম রা:-কে রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন’ (সহিহ বোখারি)।
মহররমের রোজার গুরুত্ব অত্যধিক থাকায় রাসূলুল্লাহ সা: ১০ মহররম রোজা রাখতেন। ইহুদি ও নাসারারা শুধু ১০ মহররম একদিন রোজা রাখত। তাই রাসূলুল্লাহ সা: তাদের অনুসরণ না করে ওই দিনসহ তার আগের অথবা পরের দিন রোজা পালন করেছেন। অতএব সুন্নত আমল হলোÑ ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা পালন করা। হাদিসে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিন রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিপরীত করো। তোমরা আশুরার সাথে তার আগে একদিন বা পরে একদিন রোজা পালন করো’ (সুনানে তিরমিজি)।
হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা (রা:) বলেন, ‘জাহেলিয়াতের যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা পালন করত। রাসূলুল্লাহ (সা:)ও তা পালন করতেন। মদিনায় হিজরতের পরও তিনি পালন করেছেন এবং লোকদেরকে তা পালন করতে বলেছেন।’ কিন্তু দ্বিতীয় হিজরিতে যখন রমজান মাসের রোজা ফরজ হলো, তখন তিনি বললেন, যার ইচ্ছা আশুরার রোজা পালন করতে পারো এবং যার ইচ্ছা তা পরিত্যাগ করতে পারো’ (সহিহ বোখারি)।
আশুরার দিনে আরেকটি আমল হলোÑ নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য যথাসম্ভব ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা। যার কারণে তার পরিবারের জন্য আল্লাহ তায়ালা সারা বছর উত্তম খানাপিনার ব্যবস্থা করে দেবেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিতÑ নবী করিম (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সারা বছর ভালো খাবার দান করবেন’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)। হাদিসটির একাধিক সনদ রয়েছে। যার সবকটি দুর্বল। তবে সমষ্টিগত বিচারে হাদিসটি আমলযোগ্য।
আশুরার দিন উল্লিখিত আমল ছাড়া যেহেতু অন্য কোনো আমল পাওয়া যায় না, তাই আমাদের দেশে আশুরার দিনে যেসব রেওয়াজ বা রুসম রয়েছে, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে খিচুড়ি পাকানো, শিয়াদের আবিষ্কৃত তাজিয়া বানানো, ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো, হায় হাসান-হায় হুসাইন! বলে মাতম করা, ছুরি মেরে নিজেকে রক্তাক্ত করা, বুক চাপড়ানো, শোকের পোশাক পরা ইত্যাদি। এসব করা যেমন নাজায়েজ, তেমনি এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাও নাজায়েজ।
মুহাররমের ১০ তারিখে ঐতিহাসিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্মৃতিবহ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে আশুরার দিন বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে সমৃদ্ধ হলেও সর্বশেষ কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতই এ দিনের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মহরম
আরও পড়ুন