Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

গডফাদার: ব্যাকগ্রাউন্ড ও ব্যাপকতা

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

ইংরেজি শব্দ গড (GOD) থেকে “গডফাদার” শব্দের উৎপত্তি ধারনা করা হলেও ইংরেজী শব্দের বাংলা শদার্থ অভিধানে (বাংলা একাডেমী প্রণীত) গড্ফাদার (GOD FATHER) শব্দের বাংলা শব্দার্থ খুজে পাওয়া যায় না। উক্ত অভিধানে GOD শব্দার্থ করা হয়েছে দেবতা, উপাস্য বিগ্রহ, কামদেব, সমুদ্রদেবতা, অসাধারণ বা অপরূপ কোন কিছু শব্দার্থে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ, বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের স্রষ্টা, পরমেশ্বর প্রভৃতি। মোটা দাগে গডফাদার বলতে “সৃষ্টি কর্তার পিতা” শব্দার্থ হতে পারতো, কিন্তু ইহা একটি অস্বাভাবিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটি জঘন্য অপরাধসহ জঘন্য প্রভৃত্তিমূলক কথা। তারপরও সময়ের ব্যবধানে সমাজে সৃষ্ট একশ্রেণীর মানব যখন দানবে পরিণত হয় তখন অভিধানে না পাওয়া গেলেও “সময়” ও “সমাজ” যথাপোযুক্ত পরিচিতির একটি নাম খুঁজে বের করে, যা প্রচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ে। যেমন “হাইজ্যাক” শব্দটি ২০০ শত বছরের পুরাতন অভিধানে পাওয়া যাবে না। কারণ তখন হাইজ্যাকের মত ঘটনা ঘটে নাই। এ শব্দটিও মিডিয়ার সৃষ্টি যা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত। অনুরূপ “গায়েবী মামলা” শব্দটি ফৌজদারী কার্যবিধি, দন্ডবিধি বা কোন আইন বইয়ের কোথাও নাই। তারপরও শেখ হাসিনা সরকার আমলে ৩০ ডিসেম্বর/২০১৮ ইং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একই সনের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে গায়েব থেকে সৃষ্টি করা মামলার ব্যাপকতা এতোই বৃদ্ধি পেয়েছে যা মিডিয়ার গর্ভ থেকেই “গায়েবী” শব্দটির উৎপত্তি, কোন অভিধান থেকে নয়। তবে “হাইজ্যাক” শব্দটির মত “গায়েবী মামলা” শব্দটি হয়তো অভিধানে একদিন স্থান পাবে, স্থান দখল করে নিবে ইতিহাসের পাতায়, তবে কোন পট পরিবর্তনের আগে নহে, যেমনটি চলে আসছে আমাদের সমাজে, বিশেষ করে বুদ্দিজীবীদের মনমস্তিষ্কে।

Justice L.P. Singh এবং P.K. Magumder কর্তৃক প্রনীত Judicial Dictionary-তে “God Father” শব্দটি পাওয়া যায় না, তবে Gangster সম্পর্কে (পৃষ্ঠা-৭২৪) বলা হয়েছে যে, “A member, particularly in the U.S., of an organization devoted to profit from such ac-tivities as extortion, gambling, drugs, and prostitution. He may be an organizer who plans the gang’s operations or a par-ticipant. The worst recorded period of gangsterism was in the U.S., particularly New York and Chicago during the Prohibition era, when gangsters engaged openly and violently in struggles for the control of the making and sistribution of illicit liquor. Murders were com-monplace.”

উক্ত অভিধানে ‘Goonda’ শব্দের (পৃষ্ঠা-৭৩৫) ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, “Goonda is a Hindi word and in the Hindi-Malayalam Dictionary, the meaning of the word is given as ‘Themmadi’ which means a vagabond. The meaning of the word ‘Goonda’ can be gathered from the definition of the term ‘goonda’ in the C.P. & Berar Goondas Act, 1946, Section 2 of the Act, defines a Goonda as meaning a holigan rough or a vagabond and as including a person who is dangerous to public peace of tranquillity.””

মোহাম্মদ সাইফুল আলম প্রণীত Law Dictionary-তে God Father এর শব্দার্থ করা হয়েছে “ধর্ম পিতা”।
Oxford Dictionary (1999 Edition পৃষ্ঠা-৫১০) “God Father” শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, “A very powerful man in a criminal organization (the Mafia)। অপরাধ জগতে মাফিয়া, দি মব (MOB), সিন্ডিকেট শব্দগুলি ব্যাপকভাবে পরিচিতি। ১৯৬৯ ইং সনে The God Father নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরই বিশ্বব্যাপী এ শব্দটি পরিচিত লাভ করে এবং বইটি ১৫ মিলিয়ন কপি তৎসময়ে বিক্রী হয়। ১৯৭২ ইং সনে এ শিরোনামে একটি মুভিজ (সিনেমা) প্রদর্শিত হয় যা ২০০ মিলিয়ন মানুষ ছবিটি উপভোগ করে। পরবর্তীতে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে HBO টেলিভিশন ““The Sopranos ” শিরোনামে সিরিজ সিরিয়াল প্রদর্শনের পর গডফাদার কি এবং কি কি যোগ্যতা অর্জন করলে একজন মানব দানবে পরিনত হলে এ উপাধি প্রাপ্ত হয় সে সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টি গোচর শুরু হয়। Oxford Dictionary এর ভাষ্য মতে, অপরাধ জগতের অতিক্ষমতাবান ব্যক্তিকেই গড ফাদার। ফলে বিষয়টি সহজেই অনুমেয় যে ব্যক্তি অপরাধ করেও ধরা ছোয়ার বাহিরে বা “আইন” যার বিরুদ্ধে কার্যকর হয় না সে ব্যক্তিই গড ফাদার।

আইন কি? আইন কেন করা হয়? আইনের রকম ধরন ও এর কার্যকরিতা নিয়ে অনেক কথা থাকলেও যে আইন সকলের জন্য সমভাবে কার্যকর নহে তা নিশ্চয় সর্বজনীন আইন নহে। আইন সম্পর্কে প্রখ্যাত কবি W.H. Auden বলেছেন যে, “The law is the law” (সূত্র: James Holland এবং Julian Webb প্রনীত Legal Rules পৃষ্ঠা-১)।

আইন দার্শনিকগণ “আইন” সম্পর্কে এমনও মতামত দিয়েছেন যে, “Law is a tool of oppression used by the ruling class to advance its own interest” অর্থাৎ আইন হলো ক্ষমতাসীনদের একটি অস্ত্র যা তাদের সুবিধা ও স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা হয়।

ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট আইনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন অনুশীলনের পর সমাজ থেকে By way of convention একটি প্রথাগত আইন সৃষ্টি হয় যা অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট আইনের চেয়ে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য, কিন্তু সামাজিক আইন ভঙ্গ করলে সমাজ কর্তৃক তিরষ্কৃত হতে হয়, জেল জরিমানা বা শাস্তির কোন বিধান নাই। ফলে সামাজিক প্রথাগত আইন যাহাই হউক না কেন ক্ষমতাসীনদের আইনের নিকট সামাজিক প্রথাগুলি অসহায় এবং কোথাও কোথাও বিলুপ্তির পথে। ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট আইন সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন করা যায়, যা সমাজ কর্তৃক গৃহিত আইনে তা করা যায় না, তবে অনুশীলনের অভাবে দিনে দিনে বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক, জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা, শহর, থানা, ওয়ার্ড, গ্রাম পর্যায়ে গড্ফাদার সৃষ্টি হয়েছে এবং মোটা দাগে বলতে হয় যে, “আইন” যাকে স্পর্শ করে না সে ব্যক্তিই “গড ফাদার” হতে পারে, তবে এ জন্য প্রয়োজন ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়া, পিছনে ভাগবাটোয়ারার একটি ভদ্রোচিত চুক্তি (Gentelemen aggrement) থাকে বিধায় কোন কর্ণার থেকে কোন কথা উঠে না, তবে নিরবে নিবৃতে নির্যাতিত নিষ্পেষিত হয় জনগণ এবং ভেঙ্গে পড়ে সামাজিক কাঠামো এবং এর থেকেই সৃষ্টি হয় সামাজিক বিপর্যয়। দীর্ঘদিন পরে হলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বোধদয় হয়েছে যে, রাজধানী সহ প্রতি জেলায় বখাটে যুবক শ্রেণীতে বিভিন্ন Gang সৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন দেয়ালে নিজ নিজ সংগঠনের নাম লিখে তা আত্মপ্রকাশ করছে। অভিযান চালিয়ে ঢাকা, রাজশাহী সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন Gang এর সদস্যদের গ্রেফতার করেছে। র‌্যাব ও পুলিশের ভাষ্য মতে নিজ নিজ এলাকার প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তারা চাঁদাবাজী, মাদক সহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে যার ফলশ্রুতিতে খুন সহ অনেক বড় আকারে অপরাধে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে।

Gang-দের গ্রেফতার এবং তাদের প্রতিরোধ করার প্রবণতার পাশাপাশি Gang যাতে সৃষ্টি হতে না পারে এ জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। প্রভাব বিস্তারের আকাক্সক্ষা থেকেই গডফাদারের সৃষ্টি এবং গডফাদার তার প্রভাবকে স্থায়ী ও মজবুত করার জন্য গ্যাং সৃষ্টি করে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ক্ষমতাসীনদের প্রতিরোধ করা সমাজের প্রথাগত নিয়ম কানুন দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতার ছত্রছায়া না থাকলে প্রভাব বিস্তার সম্ভব নয়। পুলিশ যাকে সালাম দেয়, যার অপরাধ পুলিশের দৃষ্টিগোচর হয় না সে ব্যক্তিই মানব থেকে দানবে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে আকাশ সংস্কৃতির Advanture এবং Heroism ভূমিকা প্রতিনিয়ত ঘরে ঘরে প্রদর্শিত হওয়ায় গ্রামে গঞ্জের বখাটেরা ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকেই গডফাদার হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং বাস্তবে হচ্ছেও তাই।

সরকারের দু মুখো নীতি গড্ফাদার বা গ্যাংস্টার হওয়ার প্রবণতাকে বন্ধ করতে পারবে না, বরং উৎসাহিত করছে। ভিলেন প্রভাব সম্পন্ন সিনেমা সহ দেশি বিদেশি প্রতিটি চ্যানেলে গডফাদারদের সন্ত্রাসী চরিত্র যুব কিশোরদের নিকট খুবই আকর্ষণীয়। এ সব আকর্ষণীয় দৃশ্যের প্রতি যুব সমাজ আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে বিধায় পাড়ায় মহল্লায় এখন গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে যা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে গডফাদার। রাষ্ট্রীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গড্ফাদারদের একই উদ্দেশ্য, যথা অর্থ, প্রভাব ও প্রতিপত্তি, আদর্শিক কোন চিন্তা চেতনা তাদের মাথায় থাকে না।

পৃথিবীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যত বড় বড় অপরাধ রয়েছে তার সবগুলোও সংগঠিত হচ্ছে গড ফাদারদের দ্বারা, যারা সর্বক্ষেত্রে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে অথবা আইন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের স্পর্শ করতে পারে না, প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত অনেক ব্যক্তি স্বয়ং বা প্রতক্ষ্য অথবা পরোক্ষ সহযোগিতার মাধ্যমে গডফাদার ইজমকে সহযোগিতা করছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় কনভেনশনের মাধ্যমে প্রোটকল স্বাক্ষরের পরেও জাতিসংঘ এ সকল অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ দিয়ে নিবন্ধটি শেষ করব। বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে (১) শিশু ও নারীসহ মানব পাচার এবং মানব অংঙ্গ প্রত্যক্ষ বিক্রি, (২) সমুদ্র, স্থল ও আকাশ পথে মাইগ্রেট (অভিবাসন) পাচার ও (৩) অবৈধ পন্থায় অস্ত্র ও অস্ত্রের অংশ বা গোলাবারুদ প্রস্তুত ও পাচার হচ্ছে। উক্ত অপরাধগুলি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য জাতিসংঘ আন্তঃরাষ্ট্রীয় তিনটি প্রটোকল স্বাক্ষর করছে (সূত্র: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৫৫/২৫ নং রেজুলেশন)। কিন্তু উক্ত অপরাধগুলি নিয়ন্ত্রিত হয়নি, বরং বেড়েই চলেছে।
আইনের ছদ্মাবরণ, প্রাণনাশের হুমকি এবং প্রলোভনই মানব পাঁচারের অন্যতম উপাদান। শিশুদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি, শিশু ও নারীদের যৌনকর্মী হিসাবে ব্যবহার, শিশু শ্রম যা স্বাস্থ্যগত ও মানসিক ক্ষতির কারণ। বিশ্বে শিশু শ্রম বন্ধ করার জন্য ১৯৯৯ ইং সনে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের মাধ্যমে শিশু শ্রম বন্ধ করার জন্য সিদ্ধান্ত (সূত্র: জাতিসংঘ কনভেনশন নং ১৮২) নিলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা গৃহিত হয় নাই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন (আই.এল.ও) এর ২০০২ ইং সনের প্রতিবেদন মোতাবেক প্রতিবৎসর ১.২ মিলিয়ন শিশু পাঁচার হয়েছে। বর্তমান সমাজ সভ্য সমাজ হিসাবে দাবি করলেও উটের দৌড়ের জুয়া খেলার জন্য শিশুদের ব্যবহার করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে উটের পিঠে শিশুদের বেধে দিলে ভয়ে শিশুরা কান্না শুরু করলে উঠ দৌড়াতে শুরু করে এবং শিশুদের কান্না যত জোড়ে হবে উট ততবেশী জোড়ে দৌড় দেয়। এতে কোটি কোটি টাকা জুয়া খেলা হয়। যারা এ পন্থায় জুয়া খেলে তারাও নাকি মানুষ! এরাও নাকি সভ্য সমাজের দাবিদার এবং এরাও নাকি মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিক!
লেখক: কলামিস্ট ও আইনজীবী



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ