Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নারায়ণগঞ্জে ফের ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকান্ড

প্রকাশের সময় : ১৮ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নারায়ণগঞ্জে ফের নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। শহরের বাবুরাইল খানকা মোড় এলাকায় একই পরিবারের পাঁচ জনকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ‘আশেক আলী ভিলা’ নামের এক বাড়ির নীচতলার ফ্ল্যাটে এই হত্যাকান্ড ঘটে। মাস খানেক আগে পরিবারটি ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। কে বা কারা তাদের এহেন বর্বরোচিতভাবে হত্যা করেছে, হত্যার কারণই বা কি হতে পারে, সে সম্পর্কে নিহতদের আত্মীয়-স্বজন ও পুলিশ কোনো ধারণা দিতে পারেনি। একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গোটা একটি পরিবারের এভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকাসহ শহরে ব্যাপক উদ্বেগ-বিচলন ও ভয়ভীতি দেখা দিয়েছে। কেউই যে নিরাপদ নয়, যে কেউ যে কোনো সময় হত্যাকান্ডের শিকার হতে পারে, এরকম আতঙ্কে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, বলার অপেক্ষা রাখে না, বহুদিন ধরেই দুর্বৃত্ত ও ঘাতকচক্রের অভয় বিচরণস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনা ছাড়াও প্রায়ই শহরে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। সাতখুনের ঘটনা কিংবা অন্যান্য খুনের ঘটনার বিলম্বিত তদন্ত, ঘাতকদের গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রতা হত্যাকান্ডের ঘটনা বাড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করে পর্যবেক্ষক মহল। দুর্বৃত্ত ও ঘাতকচক্র কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, একসঙ্গে পাঁচজনের হত্যাকান্ডের এই ঘটনা তার প্রমাণ বহন করে। হত্যাকান্ডটি যে পরিকল্পিত, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। পুলিশের কাজ হলো, ঘাতকদের খুঁজে বের করা এবং হত্যাকা-ের কারণ উদ্ঘাটন করা।
ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, সাত খুনের সেই লোমহর্ষক ও ভয়ংকর ঘটনার সাথে যারা জড়িত, তা জানা গেলেও তদন্তকাজে বিলম্বসহ বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেক সময় পার হয়েছে। তদন্ত নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। এই বিলম্ব ও প্রশ্ন ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুখবর নয়। অনেকেই একমত যে, দেশে বিলম্বিত বিচার ও বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতির কারণেই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তদন্তে প্রভাবশালীদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে এবং বিচারপ্রক্রিয়া ঝুলে যায়। বলা হয়, বিলম্বিত বিচার, বিচার না পাওয়ার শামিল। আমাদের দেশে এখন এটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় আইনের শাসন নিশ্চিত হতে পারে না। আইনের শাসন থেকে দেশ যে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই। বিলম্বিত বিচার ও বিচারহীনতার কারণে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে এই সুযোগে দুর্বৃত্ত-ঘাতক ও অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে কিংবা অধরা থেকে যাচ্ছে। এতে তারা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে প্রকারান্তরে উৎসাহিত হচ্ছে এবং একের পর এক অপরাধ ঘটিয়ে যাচ্ছে। অপরাধ দমন কিংবা অপরাধীদের নিরোধ করতে হল, প্রতিটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পরই তদন্ত দ্রুতায়িত করতে হবে, অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারে সোপর্দ করতে হবে। অপরাধীরা সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে উপযুক্ত শাস্তি পেলে অপরাধ সহনশীল পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। অপরাধীদের দৌরাত্ম্যও হ্রাস পেতে পারে।
দেশকে যত দ্রুতসম্ভব বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে যদি আমরা আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। এ ব্যাপারে পুলিশকেই অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করতে হবে। আর পুলিশ যেহেতু সরকারের ক্ষমতার প্রতিনিধি হিসাবে গণ্য সুতরাং সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও স্বীকার করতে হচ্ছে, জনবান্ধব পুলিশ আমাদের একান্ত কাম্য হলেও পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনবান্ধব অবস্থানে নেই। পুলিশের মধ্যে অপরাধ-প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজি, রাহাজানি, ছিনতাই, ডাকাতি, জিম্মি করে বা ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, খুন, সন্ত্রাসসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যে অপরাধের সঙ্গে পুলিশের একশ্রেণীর সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতাও যে আছে, গত বছর প্রায় ১০ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তার সাক্ষ্য দেয়। পুলিশকে দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত করা না গেলে অপরাধ দমন, মামলার সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে অপরাধীদের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন। সরকারকে বিষয়টি উপলব্ধি করে উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিতে হবে। পুলিশের কাজে প্রভাব বিস্তার কিংবা পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ করার যে কোনো চেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করতে সন্ত্রাসী-দুষ্কৃতী-দুর্বৃত্ত ও অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার বিকল্প নেই। আমরা সঙ্গত কারণেই আশা করতে চাই, আলোচ্য পাঁচ হত্যাকান্ডের ঘটনার দ্রুত তদন্ত হবে এবং ঘাতকদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার আইনে বিচার নিশ্চিত করা হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।