Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০৪ কার্তিক ১৪২৬, ২০ সফর ১৪৪১ হিজরী

কেমন হবে মশা দমনের টেকসই ব্যবস্থা

ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া | প্রকাশের সময় : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

বর্তমানে মশা বা মশাবাহিত রোগ একটি বৈশি^ক সমস্যা। বাংলাদেশ সহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এখন মারাত্মক ডেঙ্গুপ্রবণ। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে মশা আমাদের জন্য সমস্যা হলেও এই বছরের প্রাদুর্ভাব সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক। এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগের মোকাবিলা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও প্রোটেকশন যেমন গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সফল ও টেকসই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। দেশে বর্তমানে মশার নিয়ন্ত্রণ বা দমন পুরোটাই সিটি কর্পোরেশন নির্ভর। আমরা সাধারণ মানুষ পুরোপুরি নির্ভর করছি সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমের উপর। মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বলতে আমরা সিটি কর্পোরেশনকেই বুঝি। তবে মশা দমনের বিষয়টা এই একক কর্তৃপক্ষ যেভাবে দেখছে বা সার্বিকভাবে যেভাবে দেখা হচ্ছে তাতে সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রন সম্ভবপর হবে বলে মনে হয় না। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় মশার নিয়ন্ত্রণ বা দমনকে সাধারণ ভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। এ নিয়ে নতুনকরে চিন্তা করা দরকার। মশার উৎপাত বা ডেঙ্গু/চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়লে অন্যত্র এক্সর্পাট না খুজে নিজেদের সাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন। মশা দমন খাতে আমরা অনেক টাকা খরচ করছি কিন্তু সুফল পাচ্ছি না। তাই, মশা দমনের বিষয়টাকে আলাদা নজর দিয়ে দক্ষ লোকবলের সমন্বয়ে যুগোপযোগী, গবেষণা ভিত্তিক ও প্রযুক্তি নির্ভর ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা করা দরকার। এ ব্যাপারে মশার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশে/বিদেশে যারা কাজ করেছে তাদের অভিজ্ঞতা নিতে হবে। যে করেই হোক আমাদের প্রয়োজন একটি সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা। 

মশা দমনে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা লক্ষ্যণীয়। তাদের জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও চোখে পড়ার মতো। তবে এ কথাও সত্য যে, আমাদের দমন কার্যক্রম প্রধানত কীটনাশক স্প্রেইং/ফগিং এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, মশার কার্যকর দমনের জন্যে বেশ কিছু বিষয় আগাম জানার জন্যে গবেষণা অতীব জরুরি যেমন: এলাকা ভিত্তিক মশার উপস্থিতি/আধিক্য, মশার রেজিসটেন্স লেভেল, কীটনাশকের কার্যকারিতা ইত্যাদি। আর সেই জায়গাটাতেই আমরা কম গুরুত্¡ দিচ্ছি। নির্ভর করছি অন্যন্য প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর’বি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইত্যাদি) উপর। আমাদের মশা নিধন কার্যক্রম মোটেও গবেষণা নির্ভর নয়। আবার দেশে মশা নিয়ে যতটুকু গবেষণা হচ্ছে তার বেশিরভাগই ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে এবং তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। কিন্তু মশা নিয়ে নিয়মিত/রুটিন মাফিক গবেষণা, সঠিক দমন পদ্ধতি (কীটনাশক বা জৈবনাশক) বাছাই ইত্যাদি ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ও টেকসই কোনোদিনই হবে না। তাই মশার সফল নিয়ন্ত্রণে কয়েকটা বিষয়ে জোর দেয়া জরুরী।
১. মশা নিয়ন্ত্রণ (অপারেশন) ইউনিট আধুনিকায়ন: আমাদের মশা নিয়ন্ত্রণ (অপারেশন) ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী তথা আধুনিক করতে হবে। মশার বায়োলজি ও কীটনাশক সর্ম্পকে যথাযথ জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ লোকের দ্বারা পরিচালিত করতে হবে। অপারেশন টিমকে/ টেকনিশায়নকে কীটনাশক প্রয়োগে যথাযথ ট্রেইনিং দিতে হবে। কীটনাশকের (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) সঠিক ব্যাবহার বিধি জানতে হবে। ফগার মেশিন ছাড়াও নতুন নতুন মেশিন (ইউএলবি স্প্রেয়ার) যোগ করতে হবে। কীটনাশক বাছাইয়ে আরো সতর্ক হতে হবে। একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার পরিহার করতে হবে। প্রয়োগ তালিকায় নতুন ও কার্যকরী এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড যোগ করতে হবে। কীটনাশক যাতে কোন ভেজাল না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কীটনাশকের ভুল প্রয়োগ/অতিপ্রয়োগ চলবে না। এতে মশারা প্রতিরোধী হয় বেশি। মনে রাখতে হবে, একই কীটনাশকের ব্যাবহার, মাত্রারিক্ত/ভুল ডোজে মশারা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে। এডিস সহ অন্যান্য মশা (কিউলেক্স, এনোফিলিস ইত্যাদি) সনাক্তকরন পাশাপাশি, টারগেট ও নন- টারগেটস প্রজাতির রক্ষারও ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. মশা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা: সফল ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা অনেকটা গবেষণা নির্ভর হয়। ভেক্টর ম্যাপিং অর্থাৎ মশার স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রজনন কেন্দ্র, পরিনত মশার উপস্থিতি/আধিক্য ইত্যাদি চিহ্নিত করতে হবে। কিছু বেসিক বিষয়ে গবেষণা যেমনঃ মশারা সত্যিই কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে কিনা? কোন প্রজাতির মশা কোথায় কি পরিমান কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে? কীটনাশকের রিকমেন্ডেড ডোজ পরীক্ষাকরণ ইত্যাদি সব সময় পরিচালনা করতে হবে। বিভিন্ন টারগেট এরিয়ায় মশা কি পরিমান কীটনাশক প্রতিরোধী হয়েছে এবং এ্ই প্রতিরোধের মাত্রা (রেজিসটেন্স রেশিও) কেমন তা গবেষণার মাধ্যমে জানতে হবে। কোন কীটনাশক (এডাল্টিসাইড/লার্ভিসাইড) কোন মশা/লার্ভাকে সফলভাবে দমন করতে পারে তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট করে (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) পরবর্তীতে প্রয়োগ করতে হবে।
মশা দমনে গুরুত্বপূর্ণ একটা গবেষণার বিষয় হচ্ছে- মশার সারভিলেন্স। এডিসসহ অন্যান্য মশার (এডাল্ট এবং লার্ভা) সারভিলেন্স কার্যক্রম নিয়মিত (সারা বছর) পরিচালনা করতে হবে এবং তা মনিটরিং করতে হবে। অভি ট্র্যাপ (ডিম সংগ্রহের জন্য) ব্যবহার করে বিভিন্œ প্রজাতির মশার উপস্থিতি জানা যেতে পারে। বিভিন্ন এরিয়ায় জমানো পানিতে লার্ভার উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হোস্ট-সিকিং মশা (মানুষ বা প্রাণীদের কামড়ায়) ও এগ-লেইং মশা (ডিম পারা মশা) ধরার জন্য বিভিন্ন ট্র্যাপ (মশা ধরার ফাঁদ) যেমন: লাইট ট্র্যাপ, বিজি ট্র্যাপ, গ্রাভিড ট্র্যাপ ব্যাবহার করা যেতে পারে। এতে করে কোন এরিয়ায় কী কী প্রজাতির মশা রয়েছে, এদের আধিক্য কেমন, এমনকি কোথাও জীবাণুবাহী মশা আছে কিনা (ভাইরাস সারভিলেন্স) তাও জানা যাবে। জীবাণুবাহী মশা সনাক্তে আরবোভাইরাল টেস্ট করতে হবে। নিয়মিত সারভিলেন্স করে কোথায় কোন প্রজাতির মশা আছে তা জেনে নিদিষ্ট কীটনাশক (ডোজ সহ) প্রয়োগে সুপারিশ করতে হবে। কীটনাশক (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) নির্বাচন করার পূর্বে তা প্রথমে ল্যাব টেস্ট (টক্সিসিটি বায়োঅ্যাসে) করতে হবে।
৩. মশা দমনে নতুন প্রযুক্তির ব্যাবহার: মশা নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে কীটনাশকের (এডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড) পাশাপশি জৈবপ্রযুক্তি নির্ভর ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ার (স্ত্রী মশার উর্বর ডিম উৎপাদন ব্যাহত করে) ব্যবহার কার্যকর হয়ে উঠছে। চীন, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ম্যালেশিয়াসহ অনেক দেশে এর সফল কার্যক্রম চলছে। তাছাড়া বর্তমানে মেল স্টেরাইল টেকনিক (মশাদের মেটিং হবে কিন্তু ডিম উৎপাদন হবে না) পদ্ধতি সফল ব্যাবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার মশক প্রিডেটরস যেমন: মশক মাছ (গাপ্পি, গ্যামবুসিয়া ইত্যাদি) ইত্যাদির বানিজ্যিক ব্যাবহার বিদেশে প্রচলিত আছে। আমাদের দেশেও এদের ব্যাবহার পরীক্ষামুলকভাবে (ল্যাব রিসার্চ করে) চালু করা যেতে পারে।
৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধির জোড়ালো পদক্ষেপ: এডিস একটি ঘরোয়া মশা এরা বসতবাড়িতে বা এর আশেপাশে বংশবিস্তার ও উড়তেই অভ্যস্ত। তাই ব্যক্তিগত প্রোটেকশন ও সচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেককে এডিস মশা সর্ম্পকে যথাযথ জ্ঞান রাখতে হবে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্তৃপক্ষের চেষ্টা জোড়ালো আছে বলা যায়। তাছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভিজিট করে মশার প্রজাতি, মশারর আক্রমন, জীবন-চক্র, জীবাণুরোগ সম্পর্কে অবিহিত করা যেতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ্যার্য়োনেস সপ্তাহ, ওপেন ডে ইত্যাদি পালন করা যেতে পারে।

লেখক: কীটতত্ত¡বিদ, সায়েনটিস্ট, এনাসটাসিয়া মসকিটো কন্ট্রোল, সেন্ট অগাস্টিন, ফ্লোরিডা, আমেরিকা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মশা

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন