Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

মধ্যম পন্থাই উত্তম

আফতাব চৌধুরী | প্রকাশের সময় : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

পথ বা পন্থা মূলত তিনটি- ডানপন্থা, বামপন্থা, মধ্যমপন্থা কিংবা চরমপন্থা, নরমপন্থা ও মধ্যমপন্থা। না, কেবল রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, দৈনন্দিন জীবনে চলা-বলা, আহার-বিহার, আচার-আচরণ সব ক্ষেত্রেই। আমরা যখন ঘর থেকে বের হই, তখন হয় ডানদিকে, নয় বামদিকে কিংবা মধ্যদিকে চলি। মধ্যদিকে চলা মানে সোজা সামনের দিকে চলাই সম্ভবত প্রকৃষ্ট চলা। কারণ, সামনে এগিয়ে চলাই আমাদের অভিপ্রেত। পরিসংখ্যানবিদ্যার ভাষায় এই মধ্যমকে বলা হয় মিডিয়ান। মিডিয়ান এমন সংখ্যা, যার অবস্থান মাঝামাঝি- যে সবচেয়ে বড় নয়, আবার সবচেয়ে ছোটও নয়। এই যে মাঝামাঝি অবস্থান, তা সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে ছোট প্রান্তিক অবস্থান থেকে শ্রেয়, নিরাপদও। এই তিনটি পন্থা বা অবস্থার নিরিখে বিচারিত হলে আহার-বিহার, সামাজিক সম্পর্কসহ প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বনই সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্বিঘœ বলে প্রতিভাত হবে। খুব বেশিও নয়, খুব কমও নয়-মাঝামাঝি। দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় জটিলতা কিংবা বিভ্রান্তির অসাম্য আবর্তে জড়িয়ে পড়া থেকে অনেকটা মুক্ত থাকার উপায় এই মধ্যমপন্থা অবলম্বন। অর্থাৎ, মধ্যমপন্থাই উত্তম পন্থা।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সং¯্রবযুক্ত কিছু বিষয়ের আলোকেই ‘মধ্যমপন্থা উত্তম পন্থা’ কথনটির যথার্থ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। জীবনধারণের জন্য প্রাণির প্রাথমিক আবশ্যকতা হলো আহার বা খাদ্যগ্রহণ। খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখাই প্রাণিজীবনের মৌলিক ধর্ম। তাই আমরা নানা প্রকার খাদ্য গ্রহণ করে থাকি। এক্ষেত্রে যেমন অনশন, তেমনি অত্যশন প্রাণরক্ষার পরিপন্থী। পরিমিত আহারই উত্তম, অর্থাৎ মধ্যমপন্থা।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কাছে খাদ্যের আগে পানির প্রয়োজন। পানি পান বিষয়ে যে কথাটি বহুশ্রæত ও অনুসৃত তা হলো, প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা। ডাক্তাররা বলেন, বেশি করে পানি পান করুন। দিনে কমপক্ষে এত লিটার পানি পান করুন। এই ‘কমপক্ষে’ শব্দের ব্যবহার থেকে যে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায় তা হলো, পানি পানের ক্ষেত্রে কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই। এর সরল অর্থ দাঁড়ায়, যত বেশি পানি পান করবেন ততই ভালো। আর অনেকে করছেনও তাই। কারণ, পানি পান করাটা যেমন মোটেও কষ্টসাধ্য কাজ নয়, তেমনি অধিক পানি পান ব্যয়সাধ্যও নয়।
কিন্তু এই অত্যধিক পানি পান কি সত্যি সত্যিই লাভজনক! এর কি কোনও অপকারী দিক নেই? চিকিৎসাবিজ্ঞনীরাই তো বলছেন, পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত, তবে অত্যধিক পানি পানের ক্ষতিকারক দিকও আছে। অত্যধিক পানি পান করলে ঘাম-প্র¯্রাবের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। এই ঘাম-প্রস্রাবের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর সঙ্গে অনেক প্রয়োজনীয় বস্তুও আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাই কম পানি পান যেমন উচিত নয়, তেমনি অত্যধিক পানি পানও অনচিত। এবার আসা যাক উত্তম খাদ্যের বিষয়। হ্যাঁ, ফল। ‘ফল খান, পেটপুরে ফল খান’- ডাক্তার সাহেবদের এমন পরামর্শ রোগী-অরোগী নির্বিশেষে সবার জন্য। ওই পরামর্শ মেনে আমজনতা প্রচুর পরিমাণে ফলাহার করেন। কিন্তু ফলের মহার্ঘতার কারণে যারা পেটপুরে ফল খেতে পারছেন না, তাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। এখন চিকিৎসকরাই বলছেন, অত্যধিক ফল স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও সুফলদায়ী নয়। বরং অধিক মাত্রায় ফলাহার করলে শরীরে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি জার্মানির একটি গবেষণা সংস্থা এ তথ্য প্রকাশ করেছে। ওই সংস্থা বলছে, একজন সুস্থ মানুষ ২৫ গ্রামের বেশি ফ্রুকটোজ (ফলজ শর্করা) শরীরে নিতে পারবেন না। ফ্রুকটোজের মাত্রা ২৫ গ্রামের অধিক হলে শরীরে গ্যাস, কলেরাসহ নানা উপদ্রব দেখা দিতে পারে। এমনকী পেটে টিউমার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন ৫০০ গ্রাম ফল খেতে পারেন এবং একটি শিশুর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ হলো ২৫০ গ্রাম। উল্লেখিত মাত্রার চেয়ে বেশি ফল খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত ফলাহারের সঙ্গে যেসব সমস্যার সংশ্লেষ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো হর্মোনজনিত সমস্যা। হরমোনের সমস্যার কারণে রক্তে চিনির নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়।
এখন একটু আলোচনা হোক লবণের গুণ নিয়ে। লবণের অপরিসীম গুণের কথা কে না জানে! এ-ও জানা আছে কারও লবণ খেলে তার গুণকীর্তন করতে হয়- অন্যথায় নিমকহারাম সাজতে হয়। আমরা প্রতিদিন নানারকমের ব্যঞ্জন তৈরি করি রসনাতৃপ্তি ও উদরপূর্তির জন্য। শাক-সব্জি, মাছ মাংস, মশলাপাতি যতই উৎকৃষ্টমানের হোক না কেন, লবণবিহনে সব ব্যঞ্জনই বিস্বাদ। অথচ এই লবণ বেশি খাওয়া একেবারেই ঠিক নয়। অত্যধিক লবণ স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। তা হলে কি লবণ একেবারেই কম খাওয়া উচিত? না, তা-ও নয়। তবে? হ্যাঁ, এক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থী হতে হবে। অর্থাৎ, লবণ খুব বেশিও নয়, আবার খুব কমও নয়। বেশি লবণে যেমন ক্ষতি, তেমনি কম লবণও ক্ষতি। অতিরিক্ত কম লবণ স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক সমীক্ষায় প্রকাশ লবণ কম খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত বলে প্রচলিত ধারণা পুরোপুরি শুদ্ধ নয়। এমর্মে বলা হয়েছে, প্রতিদিন একজন মানুষের অন্যূন ১৫০০ মিলিগ্রাম লবণ খাওয়া উচিত। ওই সংস্থার গবেষকদের ভাষ্য, একজন ব্যক্তি দিনে ১৫০০ মিলিগ্রামের চেয়ে কম লবণ খেলে বিভিন্ন রকমের শারীরিক সমস্যায় ভোগার আশঙ্কা থাকে। এসব স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও কিডনির রোগ অন্যতম।
নতুন গবেষণা অনুযায়ী, দৈনিক গড়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তির তুলনায় গড়ে পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমানো ব্যক্তির মুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অধিক। কম ঘুমের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্কের বিষয়টি গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন। যারা অপর্যাপ্ত ঘুমান, তারা দিনমানে অল্প পরিশ্রমেই অধিক ক্লান্তিবোধ করেন। ফলস্বরূপ তাদের ক্ষুধা বেশি হয় এবং সেই ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে অধিক ক্যালোরি গৃহীত হলেও সে অনুপাতে তা ব্যয়িত হয় না। এভাবে গচ্ছিত ক্যালরির কারণে তারা মুটিয়ে যান। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে ঘুমানো মানুষের তুলনায় ঘণ্টা দেড়েক কম ঘুমানো মানুষ গড়ে অতিরিক্ত ৫৫০ ক্যালোরি গ্রহণ করেন। একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় এ ঘটনা অব্যাহত থাকলে কম ঘুমের কারণেও স্থূল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় বলে গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে।
এবারের বিষয়টিও স্বাস্থ্যসম্মত। আমরা জানি, দাঁত মানুষের এক অমূল্য সম্পদ। দাঁত কেবল মুখশ্রী বৃদ্ধিরই সহায়ক নয়, খাদ্যকে সহজপাচ্য করে তোলা এবং খাদ্যের স্বাদ ও আমেজ উপভোগ করার জন্য সুস্থ-সবল দাঁতের বিদ্যমানতা অত্যাবশ্যক। দাঁতের যতœ নেওয়ার কথা ডাক্তাররা বলে থাকেন। ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা কেউ বোঝে না’- এমন আক্ষেপবাণীও খুব শোনা যায়। তবে অনেকে আবার দাঁতের মর্যাদা ও খেয়াল প্রয়াজনের চেয়েও একটু বেশিই রাখেন। তারা দাঁত সুস্থ রাখতে ঘন ঘন ব্রাশ করেন। চিনি জাতীয় কিছু খেলে সঙ্গে সঙ্গে দাঁতের উপর আঙ্গুল বা ব্রাশের খাঁড়া নেমে আসে। দাঁত নিয়ে অতি সাবধানী এই ব্যক্তিদের সাবধান করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের দন্ত বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দাঁত সুস্থ রাখতে প্রতিদিন দু’বার ব্রাশ করাই যথেষ্ট। তা-ও হতে হবে খাওয়ার অন্তত আধঘণ্টা পর। অর্থাৎ, বারবার দাঁত ব্রাশ করা এবং খাওয়ার পরেই দাঁত ব্রাশ করা কোনওটাই উচিত নয়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, খাওয়ার পরেই দাঁত ব্রাশ করলে দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি হয়। দাঁতের উপরিভাগের আচ্ছাদান বা এনামেল দাঁতকে মজবুত রাখে এবং ক্ষয় হওয়া থেকে রক্ষা করে। খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেল এবং তার নিচের স্তর ডেন্টিনের ক্ষতিসাধিত হয়। খাওয়ার অন্তত আধঘণ্টা পরে ব্রাশ করলে এই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। অতএব যা বোঝা গেল, তা হলো, দাঁত দিনে দু’বার ব্রাশ করা দরকার, তবে অনেকবার ব্রাশ করা ক্ষতিকর। একই সঙ্গে খাওয়ার পরে দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন, তবে খাওয়ার ঠিক পরেই নয়।
দেখা গেল, আমাদের আহার-বিহার, স্বাস্থ্যরক্ষা তথা জীবনযাপনের বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে ‘অত্যধিক’ বা ‘অত্যল্প’ কোনওটাই প্রকৃতার্থে মঙ্গলজনক নয়। বরং এই দুটোর মাঝামাঝি অবস্থানই অধিক লাভজনক ও নিরাপদ। কোনও বিষয়ে যখনই দ্ব›দ্ব সৃষ্টি হয়, তখন মধ্যমপন্থা অবলম্বন করাই শ্রেয়। এমন নীতি যে কেবল উপরিউক্ত ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়, জীবনযাত্রার অন্যসব ক্ষেত্রেও এর গ্রহণযোগ্যতা সংশয়াতীত- তা অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রই হোক না কেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের ধন দৌলতের আবশ্যকতা অবশ্যই রয়েছে। ধনসম্পদ ছাড়া জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়, সুখী জীবন নির্বাহ সম্ভব নয়। অথচ এই অর্থই অনেক সময় অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন কোনও ব্যক্তির আওতাধীন অর্থের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যধিক হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে অনাবশ্যক ভোগবিলাসের স্পৃহা প্রকট হয়ে উঠতে পারে। অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির বাহুল্য প্রায়শই ব্যক্তিকে অনৈতিক কর্মকাÐে প্ররোচিত করে। অন্যের উপর প্রভাব বিস্তার তথা অন্যকে নিজের বশে আনার উদগ্র বাসনায় ব্যক্তি অবিচারী হয়ে উঠে। এমনটা কোনও ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে যেমন ঘটতে পারে, তেমনি একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্যবাহক, অতীতে বিত্তবান প্রভাবশালী রাজারা যেমন ছোট ছোট দুর্বল রাজ্যকে জয় করে নিজের সা¤্রাজ্য বৃদ্ধির রক্তাক্ত খেলায় মেতে উঠতেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও অতি উন্নত দেশগুলোর মধ্যে উদ্ধত সা¤্রাজ্যবাদী মানসিকতার প্রাবল্য দৃষ্ট হয়। তাই অর্থের নিদারুণ অনটন যেমন স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধাস্বরূপ, তেমনি অর্থের অনাবশ্যক প্রাচুর্যও জীবনযাত্রায় অস্বাভাবিকতার জন্ম দেয়।
সামাজিক ক্ষেত্রেও মধ্যমপন্থা বজায় রেখে চলার মধ্যে সুবিধা অধিক। পাড়া-প্রতিবেশী, সহকর্মী তথা সমাজের বিভিন্ন বর্গের মানুষের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক না রাখাটা যেমন অসুবিধাজনক ও অসৌজন্যমূলক, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও অনেক ক্ষেত্রে সুবিধার চেয়ে অসুবিধারই সৃষ্টি করে। সম্পর্ক ততটুকু ঘনিষ্ঠ হওয়াটাই উটিত, যতটুকু বজায় রাখা সম্ভব। কারও সঙ্গে একেবারে কথা না বলা বা পরিচিতজনের বাড়িতে একেবারে না খাওয়া কিংবা না যাওয়া যেমন উচিত সিদ্ধান্ত নয়, তেমনি কারও বাড়িতে দিনে একাধিকবার যাওয়াটাও বিচক্ষণতার পরিচয় বাহক নয়। কারণ, এই অতিঘনিষ্ঠতায় অনিবার্য কারণবশতও যদি ছেদ পড়ে, তা হলে তারও অনেক বিরূপ ব্যাখ্যা করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, সম্পর্কে মাত্রাতীত ঘনিষ্ঠতার মধ্যে সম্পর্কবিনষ্টির কারণ লুক্কায়িত থাকতে পারে।
রাজনীতির উল্লেখ করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছিল, তাই পরিসমাপ্তিতে রাজনীতির প্রসঙ্গেই ফেরা যাক। রাজনীতিতে মধ্যমপন্থা দারুণ কাজের জিনিস। বামপন্থা ও ডানপন্থা উভয়ই অনেকটা কট্টরপন্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। মধ্যমপন্থা এমনই পন্থা, যা না-কোমল, না-কঠোর। বামপন্থা বা ডানপন্থা বড়ই গুরুপাক, সবার পেটে সয় না। কিন্তু মধ্যমপন্থার স্বাদ যে কেউ নিতে পারেন। নিজেকে ডানপন্থী বা বামপন্থী বলতে অনেকেই সংকোচবোধ করেন, অথচ নিজেকে মধ্যমপস্থী নিঃসংকোচ বলা যায়। ডান ও বামপন্থীরা একে-অন্যের জাতশত্রæ। কিন্তু মধ্যমপন্থীরা ডান ও বাম উভয়েরই মিত্র। উভয়ের সঙ্গেই তারা অনায়াসে এক চলনসই সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারেন।
বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, বিশেষ করে জোট সরকার গঠনের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থী দলগুলোর অবস্থান সবচেয়ে সুবিধাজনক। ডান-বাম উভয়ের সঙ্গেই তারা ঘর করতে পারে। ডানকে ছেড়ে বামে যেতে যেমন অসুবিধা নেই, তেমনি বামকে ছেড়ে ডানে আসতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। ডান-বাম থেকে মধ্যমপন্থীদের অবস্থান সমদূরত্বে। তাই যে কোনও দিকে যাওয়া সহজ। এরা ক্ষমতা আস্বাদনের সুযোগ বেশি পায়। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি যত জঠিল ও ঘোলাটে হয়, ততই এদের দর কষাকষির সুযোগ বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে কট্টর ডান আর কট্টর বাম মিলে কি জোটবন্ধন সম্ভব?
মধ্যমপন্থাই যে সর্বাধিক সুবিধাজনক এবং উত্তম পন্থা, তাই প্রতিপাদনে উপদাহরণের সংখ্যা বৃদ্ধি নিরর্থক, নিষ্প্রয়োজন। জীবনযাত্রার জটিল পথে চলার সময় বিভ্রম-বিভ্রান্তি, দ্ব›দ্ব-দ্ব›েদ্বর সম্মুখীন হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় উপনীত হলে তার সমাধানকল্পে অযথা বিচলিত না হয়ে মধ্যমপন্থার অনুসারী হওয়াটাই উত্তম সিদ্ধান্ত। মধ্যমপন্থা অবলম্বনে ঝুঁকি কম। কারণ, এতে অধিক লাভের সম্ভাবনা যদি নাও থাকে, তথাপি তেমন ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে না।
নিজের স্বার্থসিদ্ধি বা ন্যায্য প্রাপ্য আদায়ের জন্য চরমপন্থী হওয়ার মধ্যে ঝুঁকি বিস্তর। আবার, একেবারে নরমপন্থী হলেও ন্যায্য স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। অতএব মধ্যমপন্থী হওয়াটাই শ্রেয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন