Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

সমুদ্র পর্যটন

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

সমগ্র বিশ্বে ক্রমেই ব্ল-ইকোনমি জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে তাকিয়ে আছে সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত সম্পদের দিকে। আর এরই অংশ হিসেবে বিশাল সমুদ্রজয়ের পর সমুদ্র অর্থনীতি ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। যদিও মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র জয়ের পর প্রায় ৭ বছর পেরিয়ে গেছে। সমুদ্র অর্থনীতি (ব্ল-ইকোনমি) এখনো ‘সম্ভাবনার’ মধ্যেই সীমিত। সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনেরও বিকাশ ঘটছে না। অথচ ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ সমুদনির্ভর। অপরদিকে অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে থাকে। ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দিতে বাধ্য হয়েই তখন সমুদ্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে সবাইকে। বিশ্ব অর্থনীতিতে সমুদ্র নানাভাবেই অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাবে ব্ল-ইকোনমির বদৌলতে। যদিও এই মূল্যবান সম্পদ আহরণে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও আছে।

বিশাল বঙ্গোপসাগরকে পর্যটন আকর্ষণে ব্যবহারের উদ্যোগ নিলে বিদেশি পর্যটক বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য সামুদ্রিক পর্যটনে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি, ভিসা সহজীকরণ, প্রধান গন্তব্যগুলোতে ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ অবকাঠামো তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রফেসর শহীদুল ইসলাম বলেন, সমুদ্রে যেতে হবে। যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সমুদ্রে লাখ লাখ বর্গকিলোমিটার জায়গা পেয়েও কোনো লাভ নেই, যদি যাওয়া না হয়। তার চেয়ে গুলিস্তানে দুই কাঠা জায়গা পাওয়া ভালো। সেখানে অন্তত ব্যবসা করা যায়।

বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে ৭১০ কিলোমিটার লম্বা উপকূল রেখা ছুঁয়ে আছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে উপকূলীয় ভূখন্ডের আয়তন ৪৭ হাজার ২০১ বর্গকিলোমিটার। উপকূল ও সমুদ্র ছোট-বড় মিলিয়ে ৭৫টি দ্বীপ রয়েছে বাংলাদেশের।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ ইনস্টিটিউট প্রকাশিত একটি মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক সালিসিতে সীমানা নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সমুদ্র প্রদেশের মোট আয়তন এক লাখ ২১ হাজার ১১০ বর্গকিলোমিটার। এই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চলে রয়েছে অনেক ধরনের প্রানবৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকা; যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থানও হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর সমুদ্রের জলজ প্রাণবৈচিত্র্য, প্রবাল বসতি, সামুদ্রিক ঘাসকেন্দ্রিক জলজ বসতি, বালুময় সমুদ্রসৈকত, বালিয়াড়ি, জলাভূমি, প্লাবন অববাহিকা, মোহনা, উপদ্বীপ, লেগুন, নানা ধরনের দ্বীপ এবং ম্যানগ্রোভ। দেশের মোট ২৫টি প্রাণ-প্রতিবেশগত অঞ্চলের মধ্যে ১১টিই উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত, আরো চারটির অংশবিশেষ এ অঞ্চলে পড়েছে। এই অঞ্চলে ১০টি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, পাঁচটি জাতীয় উদ্যান এবং ১৭টি মৎস্য অভয়ারণ্য রয়েছে।

এগুলোকে পর্যটনের প্রসারে কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগের প্রফেসর ড. শেখ আফতাব উদ্দীন। তিনি বলেন, সাগরে পর্যটনের সম্ভাবনা অফুরন্ত। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় অককাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। ড. শেখ আফতাব উদ্দীন বলেন, আমাদের দেশের যারা থাইল্যান্ডের পাতায়া, মালয়েশিয়ার লাংকাইউ, মালদ্বীপ কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে যাচ্ছে তাদের জন্যও এই সুযোগ আরো উন্মোচন করা দরকার। সেন্ট মার্টিনকে মায়ামি বিচ বানিয়ে সরকার সেখান থেকে বছরে কয়েক শ’ কোটি টাকা আয় করতে পারে। এ জন্য সেন্ট মার্টিনকে ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

ক্রমাগত সম্পদ আহরণের ফলে বিশ্বে স্থলভাগের সম্পদের পরিমাণ কমে গেছে। তাই নতুন সম্পদের খোঁজে রয়েছে সারা বিশ্ব। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’র তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুধু রফতানি করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে তাকিয়ে আছে সমুদ্রবক্ষে সঞ্চিত সম্পদের দিকে। বেশির ভাগ স্বল্পোন্নত দেশ পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে সুসংহত করেছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে ২০টিতেই পর্যটন হচ্ছে রপ্তানি আয়ের প্রধান বা দ্বিতীয় প্রধান উৎস। অনেক উন্নয়নশীল দেশে, বিশেষত ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশগুলোতে মোট জাতীয় উৎপাদনের ২৫ শতাংশই পর্যটন থেকে আসছে। তাই টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিজি) বাস্তবায়নে পর্যটনের ভূমিকা বাড়াতে সামুদ্রিক পর্যটনে জোর দিতে হবে বলে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।

এদিকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকবাহী জাহাজ নিয়ে এসেছে ‘জার্নি প্লাস’। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘সিলভার সি ক্রুজ’ জাহাজে করে পর্যটকরা সুন্দরবন, মহেশখালী, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিদর্শন করেন। আন্তর্জাতিক এই ক্রুজ শিপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ২৪৬ জন পর্যটক এসেছিলেন। ২০২১ সালে আরো বড় পর্যটকবাহী নিয়ে আসার কথা জানান ট্যুর অপারেটরস অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক ও জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিক রহমান। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ওশান ক্রুজের সঙ্গে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করতে পারাটা আমাদের জন্য অনেক সম্মানের পাশাপাশি সম্ভাবনার। বিদেশী পর্যটকরা খুশি তারা ভবিষ্যতেও আসবে।

তৌফিক রহমান বলেন, ক্রুজ ট্যুরিজমে এই অঞ্চলে সবচেয়ে সক্রিয় শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও ভারত। ভারতের কোচিন, গোয়া, মুম্বাই, চেন্নাইতে প্রতিবছর ৪৫টি ক্রজ শিপ আসে। আমরা মাত্র একটি ক্রজ শিপ আনতে পেরেছি, আরো ৪৪টি জাহাজ আমাদের বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে ঘোরাফেরা করে, যার সুফল আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। তিনি বলেন, এ খাত বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রচারণার সমস্যাসহ বেশ কিছু সমস্যাও আছে তার সমাধান করতে হবে। তৌফিক রহমান বলেন, সরকারের কাছ থেকে ভিসা পলিসিতে এয়ারপোর্ট ও ল্যান্ড পোর্ট আছে। এটি সংশোধন করে তার মধ্যে সিপোর্ট যুক্ত করতে হবে। তাহলে আমাদের আলাদা করে সরকারের কাছে অনুমতি নিতে হবে না। পর্যটকরা আরো বেশি বেশি আসতে পারবেন। এ ছাড়া বন্দরের অবকাঠামো উন্নত ও স¤প্রসারণ করা প্রয়োজন।

উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পর্যটনকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আইনি পরিকাঠামো তৈরির পরামর্শ দিয়ে বেসরকারি সংস্থা বে অব বেঙ্গল ওশান স্টুয়ার্ডশিপের ফ্যাসিলিটেটর মোহাম্মদ আরজু বলেন, সামুদ্রিক পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এসব প্রাণী ও পরিবেশই প্রকৃত অর্থে প্রধান ট্যুরিজম আকর্ষণ। সাগরে পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পর্যটকদের উপযোগী ‘সংরক্ষিত অঞ্চল’ চিহ্নিত করতে হবে। অন্যান্য দেশের মতো সমুদ্রে ‘মেরিটাইম পার্ক’ স্থাপন করা যেতে পারে। সমুদ্রের তলদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। এ ছাড়া মেরিটাইম পার্ক স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির জন্য ‘ন্যাশনাল মেরিন পার্ক অথরিটি’ গঠন প্রয়োজন। এসব স্থান সম্পর্কে বিদেশি পর্যটকদের জানাতে হবে।

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহিবুল ইসলাম বলেন, আমরা নদীভিত্তিক পর্যটন নিয়ে কাজ করছি। এখনো সামুদ্রিক পর্যটন নিয়ে সেভাবে কাজ শুরু করতে পারিনি। ভবিষ্যতে সাগরে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।



 

Show all comments
  • তাইজুল ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২:২১ এএম says : 0
    এমন সুন্দর একটি নিউজ করায় ইনকিলাবকে ধন্যবাদ। দেষের ইতিবাচক সম্ভাবনাগুলো মিডিয়ায় বেশি বেশি তুলে ধরা উচিত।
    Total Reply(0) Reply
  • মেরিন-500 ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২:২১ এএম says : 0
    এই নতুন দুয়ারকে কাজে লাগাতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • দাউদ হায়দার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২:২২ এএম says : 0
    সারা বিশ্ব এখন পর্যটন অর্থনীতির দিকে নজর দিচ্ছে। আমাদেরও এটার দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
    Total Reply(0) Reply
  • সাইফুল কবির ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ২:২৩ এএম says : 0
    পর্যটন খাত বাংলাদেশের অন্যতম আয়ের উৎস।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন