Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

কাশ্মীরের ফোর-স্টার হোটেল যেভাবে পরিণত হলো রাজনৈতিক কারাগারে

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

জাবারওয়ান পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত এবং দৃষ্টিসীমায় মনোরম ডাল লেক থাকা বিলাসবহুল সেঞ্চাউর লেক ভিউ হোটেলটির কারাগার হওয়ার কথা ছিল না।
সাম্প্রতিক সময়ের আগে পর্যন্ত ফোর-স্টার হোটেলটি মুগ্ধতা সৃষ্টিকারী এক্সিকিউটিভ, ডিলাক্স ও প্রেসিডেন্টিয়াল স্যুট ভাড়া দিত। খরচ পড়ত রাতপ্রতি ৩৫৭ ডলার পর্যন্ত। কাশ্মীর উপত্যকার ১৩ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত হোটেলটি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীসহ তিন স্তরের নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকত সবসময়। কিন্তু গত সাত সপ্তাহ ধরে এটি সহায়ক কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ভারতপন্থী রাজনৈতিক নেতা ও অ্যাক্টিভিস্টদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
প্রায় ৩৫ বছর আগে নির্মিত হোটেলটির মালিক হোটেল করপোরেশন অব ইন্ডিয়া। এটি এয়ার ইন্ডিয়ার একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কাশ্মীরের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স পার্টির প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহর পরিকল্পনার আলোকে নির্মাণ করা হয় এটি।
শের-ই-কাশ্মীর নামে পরিচিত আবদুল্লাহ কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের সাথে যে সমঝোতা করেন তার আলোকেই অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫ক-এর সৃষ্টি হয়। এতে বিরোধপূর্ণ এলাকাটি আংশিক স্বায়ত্তশাসন পায়, ভারতীয় সংবিধানে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করে।
তবে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে বিরোধ চলছিল, তা আরো তীব্র হয়ে ওঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে। গত ৫ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করা হয়, অবশিষ্ট ভারত থেকে অঞ্চলটিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে কাশ্মীরী রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের সদস্য, আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট রয়েছেন। তাদের অনেককে কাশ্মীর উপত্যকার অস্থায়ী কারাগারগুলোতে রাখা হয়েছে। আবদুল্লাহর ছেলে ও নাতিও রয়েছেন এসব বন্দির মধ্যে।
এসব বন্দিকে যেসব স্থানে রাখা হচ্ছে, তার একটি হলো এই হোটেল। হোটেলের ২৫২টি কক্ষের মধ্য প্রায় ৫০টি পরিণত হয়েছে কারাগারে। পর্যটকের স্থানে এসেছেন বন্দি, শেফদের কাজ করছেন কারা পাচকেরা। আর পুলিশ অফিসারেরা কার্যত জেল সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। ভেতরে নেতারা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পান্ডুর, উদ্বিগ্ন চেহারায় বসে আছেন।
হোটেলটির ৩৫ বছরের ইতিহাসে আবদুল্লাহর নামে করা হোটেলটির ইভেন্টস উইং শের-ই কাশ্মীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার অনেক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন, রাজনৈতিক সভা করেছে, ভিআইপি অতিথিদের আপ্যায়ন করেছে।
রাজনৈতিক সম্মেলনগুলোর অনেকগুলোতে আঞ্চলিক রাজনীতিবিদেরা বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতেন। অথচ এখন ওই একই নেতারা নিজেদের অসহায় অবস্থায় দেখছেন, তাদের আটককে তারা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বিবেচনা করছেন।
স্থানীয় আদালতের আদেশের ফলে বন্দি নেতারা সপ্তাহে দুবার- বুধ ও রোববার- তাদের সাক্ষাতপ্রার্থীদের সাথে দেখা করতে পারছেন।
ন্যাশনাল কনফারেন্স পার্টির সিনিয়র নেতা আলী মোহাম্মদ সাগরও আছেন বন্দি হয়ে। তিনি একসময় ছিলেন আইনমন্ত্রী। তার এক স্বজন স¤প্রতি এক সহকর্মীকে নিয়ে তার সাথে সাক্ষাত করেছেন। ওই স্বজন বলেন, আমার মনে হয়েছিল আমি কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকছি। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই লোক বলেন, হোটেলের লবিতে প্রবেশের আগে তিনবার আমাদের দেহ তল্লাসি করা হয়। তিনি ২০১৯ সালে এক সম্মেলনে হোটেলটিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, এখন হোটেলটিকে মৃত মনে হয়।
ন্যাশনাল কনফারেন্সের সাবেক এ আইনপ্রণেতা আলতাফ আহমদ কালুর সাথে সাক্ষাত করতে মোস্তাক আহমদ রেশি (৩৫) এসেছেন শ্রীনগর থেকে। তিনি বলেন, কক্ষগুলো তেমন আরামদায়ক নয়। তারা কারাবন্দিদের যেসব খাবার দেয়া হয়, সে ধরনের খাবারই খাচ্ছেন। অনেক নেতার দাড়ি গজিয়েছে। কালু তাকে বলেছেন যে, খাবারের মেন্যু বদলে যাওয়ায় তার সুগারের মাত্রা কমে গেছে। কালুর হাত জখম হয়েছে রাতে ইঁদুরের কামড়ে।
পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (পিডিপি) নেতা ওয়াহিদুর রহমান পারাও এখানে বন্দি আছেন। তার দল সা¤প্রতিক অতীতে বিজেপির সাথে কাশ্মীরে সরকার গঠন করেছিল। তাকে ৫ আগস্ট বিকেলে শ্রীনগরে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। এক সপ্তাহ আগে এক স্বজন তার সাথে সাক্ষাত করেন। পারার মনে হয়েছে, তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।
ভারতপন্থী এসব নেতা কিন্তু সহানুভ‚তিও পাচ্ছেন না। কাশ্মীরে ১৯৮৭ সালের জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের পর থেকেই সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। তারপর থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে নিহত হয়েছে ৭০ হাজার লোক। তারপর থেকে কারাগারে যেতে হয়েছে অনেককে। আর ভারতপন্থী এসব রাজনীতিবিদ সরকারকে সহায়তা করেছেন।
শ্রীনগরের ৬০ বছর বয়স্ক এক লোক বলেন, এসব রাজনীতিবিদের বোঝা উচিত জেল বলতে কী বোঝায়। এই লোকের স্কুলপড়–য়া ছেলে ২০১০ সালের গণআন্দোলনের সময় নিহত হয়। তিনি বলেন, তারা আমাদের সন্তানদের জেলে পাঠায়। এখন তারাই জেলে।
ভারতের সাথে আবদুল্লাহর আলোচনার পর সাত দশক কেটে গেছে। এখন সময়ই বলবে হোটেলটির গৌরব শেষ হয়ে গেছে কিনা। তবে কাশ্মীরে যেসব রাজনীতিবিদ ভারতীয় শাসনকে জোরদার করতে সহায়তা করেছিলেন, তাদেরই বন্দি করার ফলে একটি বিষয় নিশ্চিত, তারা বদলে যাওয়া (ক্ষমতাহীন ও ক্রুদ্ধ) কাশ্মীরের সাক্ষাত পাবেন। সূত্র : সাউথ এশিয়ান মনিটর।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ