Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮ কার্তিক ১৪২৬, ২৪ সফর ১৪৪১ হিজরী

ক্লাবে ক্যাসিনো, ক্ষুব্ধ সাবেকরা

জাহেদ খোকন | প্রকাশের সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

রাজধানীর ক্লাব পাড়ায় ক্যাসিনো ও জুয়ার আড্ডার খবরে এখন সারা দেশ তোলপাড়। গেল প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ক্রীড়াঙ্গনসহ গোটা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুই ১১টি ক্লাব নিয়ে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া। এই ক্লাবগুলোর মধ্যে সরাসরি ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব ও আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। বাকি পাঁচটির মধ্যে ওয়ারী ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং, আজাদ বয়েজ, মেরিনার ইয়াংস ও সোনালী অতীত ক্লাবে ক্যাসিনো নেই। তবে এগুলোতে ক্লাব সদস্যরা অবসর মূহূর্ত কাটানোর জন্য তাস খেলে সময় কাটান। গেল সপ্তাহে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ানের (র‌্যাব) এক অভিযানের পর বেরিয়ে এসেছে এই তথ্য। দেশবাসী জেনেছেন ‘ক্যাসিনো’র মতো ভয়বহ এক ব্যাধির নাম।

ক্লাবগুলোর মূল কাজ যেখানে খেলাধুলা পরিচালনা করা সেখানে মতিঝিল ক্লাব পাড়ার ছয় ক্লাব বছরের পর বছর জুয়ার বোর্ড চালিয়ে ও ক্যাসিনো ব্যবসা করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। যে টাকার সিংহভাগই গেছে দেশের রাজনৈতিক নেতা, বিপথগামী কিছু আইন-শৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় যুব সমাজের পকেটে। খেলাধুলা উন্নয়নে খরচ হয়নি এক টাকাও। এই খবরে বিব্রত, ক্ষুব্ধ দেশের স্বনামধন্য সাবেক খেলোয়াড়রা। অতীতে দেশে খেলাধুলা বেশী থাকলেও ক্লাবগুলো জুয়া নির্ভর ছিলনা। এখন কেন তারা জুয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গতকাল দৈনিক ইনকিলাব মুখোমুখি হয়েছিল দেশের বেশ ক’জন সাবেক তারকা ফুটবলারের। তাদেরই একজন স্বাধীনবাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু। তিনি বলেন, ‘ক্লাব চালাতে অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। আগে ২০ হাজার টাকায় একটি ক্লাব চলতো। আর এখন লাগে ২ কোটি টাকা। ক্লাবগুলো ভিক্ষা করতে হচ্ছে দিনের পর দিন। তাই তারা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে ক্যাসিনোর মতো ব্যবসা শুরু করেছে। যদি সরকার প্রতিটি ক্লাবকে বছরের নির্দিষ্ট পরিমানে অনুদান দিতেন তাহলে তারা জুয়ার মতো অবৈধ ব্যবসা করে টাকা কামাতো না।’

জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার ও কোচ গোলাম সারোয়ার টিপু বলেন, ‘ক্লাবের ভেতরে ক্যাসিনো ব্যবসা দেশের ফুটবলের জন্য অশনি সংকেত। এই ঘটনা জানার পর রাজধানীর বাইরে থেকে ফুটবলার আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। মফস্বল শহর বা গ্রামের কোন অভিভাবক তাদের ছেলেকে ঢাকায় পাঠাবেন না ফুটবল খেলতে।’ তিনি যোগ করেন, ‘মতিঝিলের যেসব ক্লাবে ক্যাসিনো চলতো শেষ ১০ বছরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ওইসব ক্লাবের কোনো ভুমিকা নেই। গত প্রায় ১৭ বছর ধরে মোহামেডান ফুটবল লিগ শিরোহীন। দেশের ফুটবলে পেশাদারিত্ব আসার পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের ১১ আসর শেষ হয়েছে। শিরোপা জেতা তো দূরের কথা- সবাই জানেন এই লিগে মোহামেডানের অবস্থান কি? এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ভিক্টোরিয়া, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, দিলকুশা, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স বা আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ কতটা সফলতা পেয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ! আমি মনে করি এই জুয়ার বোর্ড বা ক্যাসিনো চালানোর খবরে শুধু ফুটবলেই নয়, দেশের খেলাধুলার বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। এসব বেআইনী কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।’

এক সময়ে ঢাকার মাঠ কাঁপানো জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার শামসুল আলম মঞ্জু বলেন, ‘আগে খেলাধুলা বেশী থাকলেও ক্লাব কর্মকর্তাদের মাঝে স্বার্থ হাসিলের চিন্তা কম ছিল। আমি মনে করি খেলাধুলা উন্নয়নে বা ক্লাব চালানোর খরচ জোগাতে নয়, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা ক্লাবে ক্যাসিনো বা জুয়ার বোর্ড বসান। এই জুয়ার আয়ের একটি টাকাও খেলাধুলা উন্নয়নে খরচ হয়না। কর্মকর্তারা নিজেদের পকেট ভারী করেন।’ ক্যাসিনো ইস্যু অবশ্যই ক্রীড়াঙ্গণে প্রভাব ফেলবে জানিয়ে আমেরিকা প্রবাসী মঞ্জু যোগ করেন, ‘ক্লাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া কেউ ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু করতে পারেনি। তাই আমি বলবো ওই সব কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।’

জাতীয় দলের আরেক সাবেক ফুটবলার হাসানুজ্জামান খান বাবলু বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে রাজনৈতিক নেতাদের কারণেই ক্লাবগুলো জুয়ার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আমরা যখন ফুটবল খেলতাম তখন দেখতাম ক্লাবের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিজেদের উদ্যোগে ফান্ড সংগ্রহ করতেন। বন্ধু-বান্ধবকে আগ্রহী করে তুলতেন ক্লাবে অনুদান দেয়ার জন্য। অনেক সংগঠক ক্লাব চালাতে গিয়ে নিজের বউয়ের গহনা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন-এমন দৃষ্টান্ত আছে অনেক।’ তিনি আরো বলেন, ‘৯০’ দশকের দিকে যখন রাজনৈতিক নেতারা ক্লাবে প্রবেশ করেন, তখন তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নানা পদক্ষেপ নেন। যার একটি হচ্ছে জুয়া বাণিজ্য। আমি মনে করি ক্যাসিনো ইস্যুতে দেশের খেলাধুলায় বিরুপ প্রভাব ফেলবে না।’

জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য শেখ মোহাম্মদ আসলাম বলেন, ‘আমরা যখন খেলতাম তখন বেশ স্বনামধন্য স্পন্সররা ক্লাবে জড়িত হতো। এখন তেমনটা না হওয়ার কারণ পরিবেশ। ক্লাবগুলো এখন আর সেই আগের পরিবেশ নেই। আমাদের সময় প্রতিটি ক্লাব সব খেলাতেই অংশ নিতো। এখন তারা বেছে বেছে খেলায় অংশ নেয়। ৯০’ দশকের দিকে ক্লাবগুলো রাজনৈতিক নেতাদের দখলে গেলে সবগুলো ক্লাবে জুয়ার ব্যবসা শুরু হয়। যে ব্যবসার টাকায় ওই সব নেতা ও কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করেছে। ওই টাকা খেলাধুলার কাজে কখনো খরচ হয়নি। ক্লাবে জুয়া বা ক্যাসিনোর জন্য দায়ি রাজনীতিবিদরা। তাদের এমন কাজের জন্য আজ যুব সমাজ ধ্বংসের পথে চলেছে। এসব কাজে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই দেরীতে হলেও ক্রীড়াঙ্গনের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে।’

 



 

Show all comments
  • Golam Mortuza Sikder ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৪৮ এএম says : 0
    ক্যাসিনো পারলার অভিযান চলছে ভালো তবে ইতিপূর্বে ধৃত দুর্নীতি লুটপাটের চূড়ান্ত ফয়সালা সরকার যেন করেন দেশবাসীর এটাই প্রত্যাশা।
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Nizam Uddin ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৫০ এএম says : 0
    মানুষ এখন আর বালিশ, পর্দা নিয়ে কথা বলে না। হাজার কোটি লুঠপাট ঢাকতে শত কোটি লুঠপাটকারী অধস্থনদের প্রকাশ্যে আনছে।
    Total Reply(0) Reply
  • Ziared Rahman ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৫১ এএম says : 0
    ডাক,ঢোল, পিটিয়ে অভিযান চালানোর কোন মানেই হয় না, কিছু দিন পর পর অভিযান চালাতে হবে এবং চলমান রাখতে হবে, যাতে দেশে অবৈধ কিছু গড়ে না উঠে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ক্যাসিনো

১৪ অক্টোবর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন