Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

সিলেটে নিয়ন্ত্রণহীন কিশোর অপরাধ

ফয়সাল আমীন | প্রকাশের সময় : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

সিলেটে কিশোর অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন। বছরজুড়ে আলোচনায় কিশোর অপরাধীদের নৃশংসতার নানা ঘটনাগুলো। স্কুল-কলেজ ও এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা দ্ব›দ্ব মেটাতে কয়েকজন কিশোর মিলে গড়ে তুলছেন গ্যাং। বিকেল ও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে নগরীর বিভিন্ন স্পটে কিশোর-তরুণরা মিলে নিয়মিত আড্ডার পাশাপাশি মেয়েদের উত্যাক্ত করছে।

প্রতিদিন কোনো না কোনো এলাকায় জুনিয়র-সিনিয়র বা নারীঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটছে। যার শেষ পরিণতি অস্ত্রবাজি থেকে রক্তারক্তির মতো ঘটনা। আর এসব অপরাধে এখন অস্থির হয়ে পড়ছেন নগরীর বাসিন্দারা। সর্বশেষ তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণ দিতে হলোসিলেট দক্ষিণ সুরমার আলমপুরের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী তানভির হোসেন তুহিনকে (১৯)।

২৪ জুলাই দুপুরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ঢোকার সময় নির্ধারিত স্থানে জুতা রেখে কম্পিউটার ল্যাবে প্রবেশ করেন তুহিন। ল্যাব থেকে বের হয়ে নির্ধারিত স্থানে জুতা না পেয়ে খোঁজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে জুতা জোড়া অন্য এক প্রশিক্ষণার্থীর পায়ে দেখতে নিজের দাবি করলে এ নিয়ে বাকবিতন্ডা হয়। বিষয়টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ মীমাংসা করে দিলেও কেন্দ্রের বাইরে আসা মাত্র কয়েকজন তুহিনের ওপর হামলা চালায়। হামলায় গুরুতর আহত হন তুহিন।

সহপাঠীরা গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে বিকেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর নগরীতে কিশোর অপরাধীদের সন্ধান ও নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে র‌্যাব-৯। ইতোমধ্যে র‌্যাবের পক্ষ থেকে অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোর পাশাপাশি কিশোর অপরাধীর তালিকা করছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট নগরীতে অপরাধের সাথে জড়িতদের বেশিভাগই অল্পবয়সী। তাদেরকে ঘিরে পাড়া-মহল্লায় দিনে দিনে বেড়েই চলছে অপরাধের ভয়াবহতা। এই কিশোর-তরুণরা আগে ছোটখাটো অপরাধ করলেও এখন হরহামেশা খুনের মতো বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কখনো তুচ্ছ ঘটনায় সহপাঠী-বন্ধুদেরও খুন করতে দ্বিধা করছে না। স্কুলের গন্ডি-পেরুনোর আগেই অনেকে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে, যোগ দিচ্ছে এলাকার ছোট-ছোট অপরাধী চক্রের সাথে।

এসব কিশোররা অপরাধের ধরন পাল্টে নিজেদের এলাকার বাহিরে বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হয়ে আধিপত্য বিস্তারসহ ভাড়ায় কিলিং মিশনে যোগ দিচ্ছে। স¤প্রতি সিলেট নগরীতে কিশোর অপরাধের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে। আর এসব অপরাধীদের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে নগরবাসী। জানা যায়, সিলেট নগরীতে অন্তত অর্ধশতাধিক স্পট রয়েছে কিশোর ও তরুণদের আড্ডা দেয়।

ছোট ভাই-বড় ভাই মিলে আড্ডা দিতে দিতে এক সময় তারা হয়ে উঠছে ভয়স্কর অপরাধী। নগরীর শাহী ঈদগাহ, কাজীটুলা, নয়াসড়ক, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, বালুচর, কল্যাণপুর, শাপলাবাগ, মেজরটিলা, লামাপাড়া, মাদানীবাগ, জল্লারপার, লামাবাজার, মির্জাজাঙ্গাল, রিকাবীবাজার, তালতলা, তেলিহাওর, শেখঘাট, মাছুদিঘিরপার, জামতলা, সুরমা মার্কেট, বন্দরবাজার, মিরবক্সটুলা, আম্বরখানা, দর্শনদেউড়ি, রাজারগলি, হাউজিং এস্টেট, পীরমহল্লা, ফাজিলচিশতসহ নগরীর প্রায় সবকটি এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে ওই সব এলাকার পাশাপশি নগরীর উপশহর বি বøকস্থ সরকাার তিব্বিয়া কলেজের প্রশাসনিক ভবনে আড্ডায় বসে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

১৫/২০ সদস্যের এই কিশোর গ্রুপের চিৎকারে আশপাশের বাসাগুলোর মানুষ পড়েছে বেকায়দায়। প্রায়ই ওই এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে। গত বছরে শেষ দিকে কলেজ সংলগ্ন সড়কে সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে দ্ব›েদ্বর জেরে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে কিশোর হোসাইন আল জাহিদ। সে সীমান্তিক স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি আম্বরখানায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে কিশোর সাহেদ খুন হন।

সে ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র। এছাড়াও গত বছরের ৭ জানুয়ারি প্রতিপক্ষের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে কিশোর তানিম খান নামের ছাত্রলীগ কর্মী খুন হন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর অপরাধীদের মধ্যে এখন তিনটি শ্রেণি রয়েছে। এর মধ্যে বস্তিবাসী ও গ্রাম থেকে শহরে আসা নিম্ন আয়ের পরিবারের কিশোররা সমাজে টিকে থাকতে এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অপরাধে জড়াচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর অপরাধের দায় নিতে হবে পরিবার আর রাষ্ট্রকেই। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নৈতিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার পূর্বে নিজ সংশোধন হতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কিশোরের অভিভাবকদের অতীত বা বর্তমান হাল চিত্র তার সন্তানদের নিকটই বির্তকিত। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ বলেন, আস্থার স্থানগুলো বির্তকিত হয়ে উঠলে নীতি মূল্যবোধ বলে কিছু থাকে না। অপরাধীদের অভয়ারণ্য সর্বত্র। তাদের নিয়ন্ত্রণে সমাজ। এ সময় পিতা বা অভিভাবকদের ভয়ে নত থাকতো তার কিশোর সন্তান, এখন সেই কিশোরের কোন অপরাধের বিচার পিতা বা অভিভাবক পর্যন্ত নিয়ে গেলে বিগড়ে যায় পরিস্থিতি। নীতি নৈতিকতার শৃঙ্খলা যে অবশিষ্ট নেই এটাই তার প্রমাণ। কর্ম বৈষম্য রোধ তথা অপরাধে ঘৃণাবোধ ও ভদ্র-আইনমান্যকারী লোকদের সমাজে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সিলেট নগরীর সিনিয়র সিটিজেন প্রবীণ আইনজীবী ও জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট মাওলানা আব্দুর রকিব বলেন নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন জাতি সৃষ্টি ও অবক্ষয়হীন সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে জবাবদিহীতার অনুভ‚তি সৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধের স¤প্রসারণ, লালন ও অনুশীলন ছাড়া কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণসহ সামগ্রিক পরিবেশ আস্থাশীল করা দুরুহ।
র‌্যাব-৯-এর মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কিশোর অপরাধী এবং অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোর তালিকা আমরা সংগ্রহ করছি। সেই তালিকার কাজ শেষে হলেই র‌্যাব অভিযানে নামবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কিশোর অপরাধ
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ