Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার , ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

ছাত্রলীগের গৌরবজনক অতীতের প্রেক্ষাপটে বর্তমান অধঃপতন

মোহাম্মদ আবদুল গফুর | প্রকাশের সময় : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০২ এএম

অবশেষে তিনি স্বীকার করেছেন যে, আওয়ামী লীগ ‘ধোয়া তুলসি পাতা নয়’। তিনি দলটির দুই নম্বর নেতা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কিন্তু তিনি এ নির্মম সত্যটা স্বীকার করলেও যতক্ষণ এক নম্বর নেতা তা স্বীকার করে না নেবেন, এ নির্মম সত্যও বাস্তবে স্বীকৃত হবে না। তিনি আওয়ামী লীগের বর্তমান সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার বড় পরিচয় তিনি আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। এই পরিচয়েই তিনি আওয়ামী লীগের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সভানেত্রীর পদে সমাসীন হতে পেরেছেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা বলাতে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। প্রশ্ন জাগতে পারে একারণে যে, বর্তমানে অনেকেরই বিশ্বাস, শেখ মুজিবই বুঝি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তা তো সত্য নয়ই, এমন কি যে সম্মেলনে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়, সে সম্মেলনে তিনি উপস্থিতও ছিলেন না।

একথাগুলো আমি বলছি একারণে যে, ঐ সম্মেলনে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের অঘোষিত মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক এর একজন সাংবাদিক হিসাবে। সে সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের অভ্যুদয়ের পর বাংলাদেশে চলে আসেন এবং টাঙ্গাইলে সন্তোষে আবাসস্থান ঠিক করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, উপমহাদেশে সা¤্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের পৌনে দু’শ বছর রাজত্বের শেষ বছর উনিশো সাতচল্লিশে দুটি দল রাজনীতির পুরোভাগে ছিল। এর একটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। আরেকটি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। হিন্দুদের প্রাধান্যবিশিষ্ট প্রথমটির দাবি ছিল, ভারতবর্ষকে একটি অখÐ রাষ্ট্র হিসাবে স্বাধীনতা দিতে হবে। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগের দাবি ছিল উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাসমূহ নিয়ে একটি (বা একাধিক) স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তদানীন্তন মুসলিম লীগের অন্যতম ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানও মুসলিম লীগের অনুসারী হিসাবে বিশ্বাস করতেন যে, অখÐ ভারতে মুসলমানদের অস্তিÍত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। একথার সত্যতা মেলে তাঁর লিখিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে, যেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করে গেছেন যে, অখÐ ভারতে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। এই আশংকায় তিনি মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, ভাষা আন্দোলন বুঝি ছিল উনিশশো বাহান্নো সালের একটি ঘটনা মাত্র। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এ ধারণা সত্য নয়। ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। সাতচল্লিশের পহেলা সেপ্টেম্বর জন্ম-নেয়া তমদ্দুন মজলিস নামের একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দুু’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে। এ পুস্তিকা প্রকাশেরও একটি পটভূমি ছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই নবজাত রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে অবাঙ্গালী উর্দুভাষীদের সংখ্যাধিক্যের সুযোগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার একটা অঘোষিত গোপন ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় নবজাত রাষ্ট্রের পোস্টকার্ড, এনভেলপ, মানি অর্ডার ফর্ম প্রভৃতিতে ইংরেজির পাশাপাশি শুধু উর্দুর ব্যবহার থেকে, যদিও তদানীন্তন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সমগ্র জনসংখ্যার চাইতেও বেশি এবং তারা সবাই ছিলেন বাংলা ভাষা ভাষী।

এ পটভূমিতেই শুরু হয় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন শুরু হয় উনিশশো সাতচল্লিশের পনেরোই সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক একখানি পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে একথা আগেই বলা হয়েছে। উনিশশো সাতচল্লিশের পনেরোই সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস নামের একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার মাধ্যমে শুরু হওয়া এ আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের তরুণ শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাসেম।

যে পুস্তিকা প্রকাশের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তাতে তিনটি রচনা স্থান পায়: এগুলোর লেখক ছিলেন- (এক) তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাসেম, (দুই) বিখ্যাত সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক ড. কাজী মোতাহার হোসেন (এবং) (তিন) খ্যাতনামা সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ। এর প্রথম লেখায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ভাষা আন্দোলনের মূল দাবিসমূহ তুলে ধরেন এভাবে (এক) পূর্ব পাকিস্তানের অফিস-আদালতের ভাষা হবে বাংলা, (দুই) পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা, (তিন) কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে দু’টি : বাংলা ও উর্দু।

সমগ্র ভাষা আন্দোলন এ দাবির ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়। উনিশশো সাতচল্লিশের পনেরোই সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এভাষা আন্দোলনকে শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে নিয়মিত ছাত্র-শিক্ষকদের সভা অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়া একই লক্ষ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ঘুরে ঘুরে শিক্ষক ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। উনিশশো সাতচল্লিশেই ভাষা আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক (পরবর্তী কালে ডক্টর) নূরুল হক ভূইয়াকে আহŸায়ক করে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।

পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের প্রথম সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ। এর প্রথম আহŸায়ক নির্বাচিত হন নঈমুদ্দিন আহমদ। পরবর্তীকালে এর ভারপ্রাপ্ত আহŸায়ক হন দবিরুল ইসলাম। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগে তদানীন্তন ফরিদপুর জেলার প্রতিনিধি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

সাধারণত দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র বা অন্যান্য অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় মূল প্রতিষ্ঠানের জন্মের পর। কিন্তু ছাত্র লীগের ব্যাপারে ঘটে এর ব্যতিক্রম। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের জন্ম হয় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। আর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন।

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভাষা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ভাষা আন্দোলনের সমর্থক হিসাবে যে দ্বিতীয় সংগঠন জন্মগ্রহণ করে সেটি ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ, যার জন্ম হয় ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি। জন্মের পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি তমদ্দুন মজলিসের সূচিত ভাষা আন্দোলনে সমর্থন দিতে থাকে। ফলে তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পর্ক এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে যে, পূর্ব পাকিস্তানের অনেক শহরেই এই দুটি সংগঠনের কার্যালয়ই একই ছাদের তলায় অবস্থিত ছিল। দৃষ্টান্ত স্বরূপ জামালপুর ও বাগেরহাটের নাম উল্লেখ করা যায়।

শুধু এখানেই শেষ নয়, অনেক ক্ষেত্রে উভয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সদস্য সূত্রে সম্পর্কিত ছিলেন একই ব্যক্তি, যেমন অধ্যাপক আবুল কাসেমের সঙ্গে তমদ্দুন মজলিসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, যিনি পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা হন। আমরা যারা তমদ্দুন মজলিস ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলাম তারা সব সময়ই এসব সম্পর্ক নিয়ে গৌরব অনুভব করতাম।

ছাত্র লীগের এককালের এসব নেতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হচ্ছে একারণে যে, এক কালের যে ছাত্র লীগের জন্য আমরা যতটা গৌরব অনুভব করতাম, আজকের ছাত্র লীগের এক শ্রেণির নেতাদের কর্মকাÐ দেখে ততটাই দুঃখ ও লজ্জা অনুভব করি। বিশেষ করে অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতীয়বাদী ছাত্র দলের নেতাকর্মীদের উপর ছাত্র লীগের নেতৃত্বে যেভাবে হামলা চালানো হয়েছে তাতে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এঘটনা এমন সময় ঘটেছে দেশে, যখন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব রয়েছে ছাত্র লীগের মূল নেতৃত্ব দানকারী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ। তবে এজন্য শুধু ছাত্র লীগকেও আমরা দায়ী মনে করি না। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ক্যাম্পাসে তাদের মূল প্রতিদ্ব›দ্বী হিসাবে যদি ছাত্রদলকে মনে করে থাকে, তার দায় থেকে তাদের আসল নেতা আওয়ামী লীগকে কিছুতেই রেহাই দেয়া যায় না। কারণ তারাই দেখিয়েছে কীভাবে ক্ষমতায় থাকার সুযোগে আওয়ামী লীগ এমন একটি নির্বাচনী মহড়ার মাধ্যমে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে, কঠিন বাস্তবতার কারণে যাকে জনগণ নাম দিয়েছে ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের অনুসারী ছাত্র সংগঠন যদি মূল রাজনৈতিক সংগঠনের নীতি অনুসরণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মূল দল আওয়ামী লীগের অন্ধ অনুসরণ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাম্পাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের তাদের মূল প্রতিদ্ব›দ্বী মনে করে তাদের উপর বর্বর হামলা চালাতে এগিয়ে যায়, তাতে শুধু তাদের (ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের) দোষ দেয়া যাবে কি? যাবে না। সুতরাং ছাত্রলীগের এককালের অতীত যত গৌরবজনকই হোক, তাদের সে গৌরবজনক অতীতের বিপরীতে বর্তমানের অবস্থানের জন্য শুধু ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্বকে দোষ দেয়া সমীচিন হবে কি? হবে না।



 

Show all comments
  • Nadim ahmed ১১ অক্টোবর, ২০১৯, ১১:২০ এএম says : 0
    This is 100% wrong. The truth is that Chatro League never had a brave history as an organization. But yes, some of its leaders and activists have brave contribution during independence war.
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ছাত্রলীগ

৬ নভেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন