Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার , ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

সিন্ধুকের ধন-সম্পদ কার জিম্মায়?

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ ও ক্যাসিনো খেলোয়াড়দের সিন্ধুকে কোটি কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। ভল্ট থেকে উদ্ধার হচ্ছে ডলার, ভরি ভরি স্বর্ণালঙ্কার। এছাড়া সঞ্চয়পত্র, কষ্টিপাথরের মূর্তিসহ মূল্যবান সম্পদও উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু উদ্ধারকৃত এসব অর্থ-সম্পদ কার জিম্মায় রাখা হচ্ছে? যে বা যাদের জিম্মায় রাখা হচ্ছে তাদের কাছে এসব যথাযথভাবে থাকবে তো? অন্তত আদালতে জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত টাকার অংক, স্বর্ণালঙ্কারের পরিমাণ ঠিক থাকবে তো? এ প্রশ্ন এখন মানুষের মুখে মুখে। যদিও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম গতকাল রোববার বলেছেন, অভিযানের পর মামলা করার সময় থানায় টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার জমা দেয়া হয়েছে। সেগুলো আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিযানলব্ধ অর্থ-স্বর্ণালঙ্কার সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ারও বিধান করা যেতে পারে। ২০০৭ সালে গঠিত ‘ট্রুথ কমিশন’র মাধ্যমে আদায়কৃত ‘দুর্নীতিলব্ধ অর্থ’ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা নেয়া হয়। অনুকম্পার মাধ্যমে দায়মুক্তি দেয়া হয় ২৬৫ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় ৩৩ কোটি ৮০ লাখ ২১ হাজার ৬৬৮ টাকা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মামলার তদন্ত, চার্জশিট দাখিল, বিচারের জন্য ওঠা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ততদিনে এসব আলামত অক্ষত থাকবে না। পুলিশের হাত থেকে আদালত পর্যন্ত যেতে অর্থ-সম্পদের অংক ও পরিমাণ কমে যেতে পারে। অনেক নয়-ছয় হতে পারে। অথচ উদ্ধারকৃত অর্থ-সম্পদ মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত। আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ, অক্ষত, অবিকৃত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুলিশ বাদী-মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। এখানে উদ্ধারকৃত হেরোইন বিচারকালে ‘পাউডার’ হয়ে যায়। নতুন আগ্নেয়াস্ত্র হয়ে যায় পুরনো, জং ধরা, পরিত্যক্ত অস্ত্র। এ কারণে সম্পদ পাহারা এবং আলামত সংরক্ষণে বিশ্বস্ততা হারিয়েছে পুলিশ।

দুদকের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক যতন কুমার রায় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে জানান, ঘটনাটি ২০১৪ সালের। বনশ্রীতে দুষ্কৃতকারীদের গাড়ি থেকে ২৩৫টি সোনার বার উদ্ধার করেছিল রামপুরা থানা পুলিশ। উদ্ধার সংশ্লিষ্ট পুলিশ টিমের সদস্যরা পুরো স্বর্ণ জমা দেয়নি। নিজেদের মধ্যেই ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয় টিমের সদস্যরা। বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে চাউর হলে দুষ্কৃতকারীদের ফেলে যাওয়া গাড়িতে দ্বিতীয়বার অভিযানের নাটক সাজানো হয়। পরে ডিবি পুলিশের উপস্থিতিতে সিটের ভেতর থেকে উদ্ধার দেখানো হয় আরো ৭০টি বার। মূলত সামাল দিতে না পারার ভয় থেকে ভাগ-বাটোয়ারা করা স্বর্ণের বারগুলো টিমের সদস্যরাই সিটের নিচে রেখে দেয়। ডিবির অভিযানে ২১৯টি বার খুঁজে পেলেও বাকি ১৬টি বারের কোনো হদিস মেলেনি। ২০১৪ সালের ১৩ মার্চের ওই ঘটনায় মামলা হয়। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। রামপুরা থানায় কর্মরত তৎকালীন এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম, কনস্টেবল আকাশ চৌধুরী, ওয়াহেদুল ইসলাম, সোর্স মাহফুজুল আলম রনি এবং মাইক্রোবাস চালক মো. সজিব সিকদারের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় কমিশন।

দুদক সূত্র জানায়, এমএলএম কোম্পানি ‘ডেসটিনি-২০০০ লি:’র এর সম্পত্তি ক্রোক করেছিল আদালত। ক্রোককৃত সম্পত্তির ওপর প্রশাসক নিয়োগ করা হয় পুলিশকে। এর মধ্যে রাজধানীতে অবস্থিত সম্পত্তিগুলো ‘দেখভাল’ করার দায়িত্ব পায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ঢাকার বাইরের সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব পায় জেলা পুলিশ সুপার। ডেসটিনি ৪ হাজার ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এর মধ্যে ৯৬ কোটি টাকা হস্তান্তর, রূপান্তর এবং স্থানান্তর (লন্ডারিং) করে। ক্রোককৃত সম্পত্তির আর্থিক মূল্য ছিল ৬৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডেসটিনির গাড়িই ছিল ৫০টি। ডেসটিনির ক্রোককৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জন্য একটি ‘আহ্বায়ক কমিটি’ করা হয়। ডেসটিনির শত শত কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দেখাশোনা করত এই কমিটি। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে ডেসটিনির সম্পত্তি ভোগ-দখল করছে পুলিশ। রাজধানীতে অবস্থিত বিভিন্ন ভবন, ২৮টি ফ্ল্যাটের ভাড়া তোলে পুলিশ। যথাযথ তদারকির অভাবে প্লট, জমিও বিভিন্নভাবে হাতছাড়া হতে থাকে।

আদালত সূত্র জানায়, মালখানা থেকে বিচারাধীন মামলার আলামত গায়েবের খবর প্রায়ই পাওয়া যায়। উদ্ধারকৃত গাড়ি, আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো দেশীয় অস্ত্র, ইয়াবা, হেরোইনের মতো বিভিন্ন মাদকদ্রব্য, স্বর্ণালঙ্কার গায়েবের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলাও হয়। এছাড়া মামলার ডকেট থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত, সিজারলিস্ট, অডিও-ভিডিও ফুটেজ, মোবাইল কললিস্ট বা সিডিআরও গায়েব হওয়ার নজির রয়েছে ভুরি ভুরি। মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দকৃত মোটরসাইকেল, গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যবহার্য মূল্যবান সামগ্রী পানির দামে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বহু মামলা রয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে দুদক নিজেই গত বছর একটি ‘অপরাধলব্ধ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠন করে। আদালতের নির্দেশেই দুর্নীতিবাজদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবে এই সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সেল। সেই জব্দ, ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের দেখভাল করবে। জরিমানার অর্থ আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এ বিষয়ে সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মাইদুল ইসলাম ‘ইনকিলাব’কে বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ জব্দ, ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়ে থাকেন। আদেশ অনুযায়ী এসব সম্পদ সংরক্ষণ ও তদারকি করবে কমিশন। বাজেয়াপ্ত করা সম্পদের রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করা হবে। জরিমানার অর্থও যথাযথভাবে আদায় করা হবে। এ বিষয়ে যে প্রজ্ঞাপন হয়েছে তাতেও দুর্নীতিলব্ধ সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা এককভাবে দুদককে দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ অভিযানে র‌্যাব-পুলিশ জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভুইয়া, শফিকুল আলম ফিরোজ, লোকমান হোসেনসহ ২০১ জনকে গ্রেফতার করে। ক্লাব-ক্যাসিনোতে হানা দিয়ে অস্ত্র, বিদেশি মদ, সিগারেট, বিয়ার, হেরোইন, কষ্টিপাথরের মূর্তি, ক্যাসিনো ও জুয়া খেলার সামগ্রী জব্দ করে। জব্দকৃত সম্পদের মধ্যে নগদ ৮ কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর ডকুমেন্ট এবং ৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ডলার, সঞ্চয়পত্রের কাগজপত্রসহ মূল্যবান সামগ্রীও মিলেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে চলমান সব অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।



 

Show all comments
  • সায়েম ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৩৭ এএম says : 0
    ইনকিলাবকে ধন্যবাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা রিপোর্ট করার জন্য। এক লুটেরার কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার হয়ে যাচ্ছে আরেক লুটেরার হাতে!!!
    Total Reply(0) Reply
  • তবিবুর রহমান ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৩৮ এএম says : 0
    বাঘের কাছে ছাগল পালতে দেওয়ার মতোই হবে!! দেশের রক্ষক যখন ভয়ঙ্কর ভক্ষক, তখন আর কি বা আশা করা যায়।
    Total Reply(0) Reply
  • কায়কোবাদ মিলন ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৩৯ এএম says : 0
    এসব লুটেপুটে খাওয়ার জন্য। টাকার শুধু হাতবদল হবে দেশের কোনো উপকার হবে না।
    Total Reply(0) Reply
  • রাইহান মোল্লা ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ১:৪০ এএম says : 0
    মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্বাবধানে রাখা হোউক, তাহলে কেউ লুটপাটের সুযোগ পাবে না।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুর্নীতি

২০ অক্টোবর, ২০১৯
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ