Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

কলারোয়ায় খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার কোটি টাকার বাণিজ্য

প্রকাশের সময় : ১৬ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বস্তায় ৬০ টাকা ঘুষ ও বাড়তি ১ কেজি নিয়ে ধান ক্রয়
কলারোয়া (সাতক্ষীরা) উপজেলা সংবাদদাতা : বস্তাপ্রতি ৬০ টাকা ঘুষ এবং এক কেজি ধল নিয়ে কলারোয়া সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয় চলছে। এভাবে গুদাম কর্মকর্তা কৃষকের পকেটের ৫০ লাখ টাকা লোপাটসহ কোটি টাকার বাণিজ্যে লিপ্ত হয়েছে। জানা গেছে, কৃষি বিভাগের প্রদত্ত ধানচাষীর তালিকা অনুযায়ী গুদামে ধান কেনা হচ্ছে। কিন্তু পছন্দের বিশেষ কিছু লোককে এই তালিকাভুক্ত করে সরকারী গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এদিকে গুদামে ধান দেওয়ার আগে গুদাম কর্মকর্তার কাছে ৬০ টাকা জমা দিয়ে ‘খাদ্য অধিদপ্তর’ লেখা সরকারী বস্তা সরবরাহ নিতে হচ্ছে। গুদামে ধান দেওয়ার পরে বস্তা বাবদ জমা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও ঘুষ হিসাবে এই টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ৪০ কেজির বস্তায় এক কেজি ধান বেশি দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ (বস্তার ওজন ১ কেজি) বস্তাসহ ৪২ কেজি ধান দিতে হচ্ছে গুদামে। যেহেতু বাজারে মোটা ধান ১৬ টাকা এবং ২৮ জাতের চিকন ধান সর্বোচ্চ ১৮ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
আর মোটা বা চিকন নির্বিশেষে সরকার প্রতি কেজি ধান ২৩ টাকায় ক্রয় করছে। বাজার দরের চেয়ে সরকারী গুদামে দাম ৫ থেকে ৭ টাকা বেশী হওয়ায় কৃষক সরকারী গুদামে ধান বিক্রিতে আগ্রহী। কিন্তু সরকারী ভাবে ধান কেনা শুরুর আগে দেনার দায়ে সাধারণ কৃষকের ধান মহাজনের ঘরে বা ব্যবসায়ীর আড়তে চলে গেছে। এই সুযোগে সামান্য টাকার বিনিময়ে তালিকাভূক্ত এই সব কৃষকের কৃষি কার্ড নিয়ে তার নামে ব্যাংক একাউণ্ট খুলে ব্যবসায়ীরা গুদামে ধান বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে। সেবানন্দকাটি গ্রামের আজগরের চাষযোগ্য জমি রয়েছে .৫০ শতক। এই জমিতে সর্বচ্চো ৩০ মণের বেশী ধান উৎপাদন সম্ভব নয়। খোরাকী বাদে অর্ধ টন ধান বিক্রি করার প্রশ্ন ওঠে না। সামান্য টাকার বিনিময়ে কৃষি কার্ড নিয়ে এবং ব্যাংক একাউণ্ট খুলে এক ব্যবসায়ী আজগরের নামে সরকারী গুদামে তিন টন ধান বিক্রি করেছে।  কুশোডাঙ্গার কৃষক খলিল জানায়, তাদের এলাকার এক ব্যবসায়ী সামান্য টাকার বিনিময়ে ২০ কৃষকের কার্ড নিয়ে তাদের নামে একাউণ্ট খুলে গুদামে ৫০ টন ধান বিক্রি করেছে। হেলাতলার কৃষক রশিদ জানায়, সরকারী ক্রয় মূল্য বেশী হওয়ায় গুদাম কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দীক কেউকেটা ভাব প্রদর্শন করে বস্তাসহ (বস্তার ওজন এককেজি) ৪২ কেজি ধান দিতে বাধ্য করছে এবং বস্তার জন্য জমা টাকা ঘুষ বাবদ কেটে নিচ্ছে। কলারেয়ায় ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২৩৯৯ মেট্রিক টন। এই হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার বস্তা ধান ক্রয়ের কাজ চলছে। বস্তা প্রতি ৬০ টাকা হিসাবে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা ঘুষ আদায় হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষকের কার্ড নিয়ে ব্যবসায়ীরা গুদামে ধান বিক্রি করায় ঘুষ নিয়ে কোন হৈ চৈ হচ্ছে না। এদিকে ওজনে এক কেজি বেশী নেওয়ায় ৬০ হাজার কেজি অর্থাৎ ৬০ টন ধান অতিরিক্ত ধান সরকারী গুদাম কর্মকর্তা হাতে চলে আসবে। যার মূল্য ১৩ লক্ষাধিক টাকা। এবছর কলারোয়ায় ৯৯ ভাগ কৃষক ২৮ জাতের চিকন ধান চাষ করেছে। সরকারী গুদামে সব চিকন ধান ক্রয় করা হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে এই চিকন ধান মিলিং এর নামে গুদাম থেকে বের বাজারে বিক্রি করে এবং বাজারের মোটা চাল কিনে গুদামে ভরা শুরু হয়েছে। সরসকাটির মোল্লা রাইচ মিলের মালিক ফজলু মোল্যা এবং নারয়নপুর মোড়ের দাউদ রাইচ মিলের মালিক দাউদ আলী সরকারী গুদাম থেকে মিলিং এর জন্য নেওয়া চিকন ধান বাজারে বিক্রি করে বাজার থেকে মোটা চাল কিনে সরকারী গুদামে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে সাংবাদিক আনিছুর রহমান জানান। অর্থাৎ চিকন ধান বাজারে বিক্রি করে কম দামের মোটা চাল গুদামে তুলে আরো প্রায় ৬০ লক্ষাধিক টাকা পকেটস্থ করার কাজ শুরু করেছে গুদাম কর্মকর্তা।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আমিনূল ইসলাম লালটু অভিযোগ করেন, ধান ব্যবসার লক্ষ্য নিয়ে ধানচাষীর তালিকা প্রস্তুত করে গুদামে পাঠানো হয় এবং উপজেলা প্রশাসন ও গুদাম কর্মকর্তার সহায়তায় সরকারী ক্রয় অভিযানে মোটা টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। এ ব্যাপারে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দীক বলেন, লেবার, দারোয়ান ও পিয়ন বস্তা প্রতি ৬০ টাকা নেয়।
তবে এবাবদ ৩৬ লাখ টাকা আদায় হবে বলে অভিযোগ তোলা হলে তার জবাব এড়িয়ে যান। আর সারা দেশের মত কলারোয়ায় বস্তা প্রতি অতিরিক্ত ১ কেজি ধান নেওয়া হচ্ছে বলে গুদাম কর্মকর্তা জানান। এ ব্যাপারে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার উত্তম কুমার রায়ের সংগে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তদন্ত করে এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কলারোয়া-তালার এমপি অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ কৃষকদের কৃষি কার্ড নিয়ে ব্যবসায়ীদের গুদামে ধান বিক্রির বিষয় জানতে পেরেছেন বলে স্বীকার করেন এবং বলেন, অবিলম্বে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।        



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।