Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ০১ রজব ১৪৪১ হিজরী

বরিশাল সিটি করপোরেশনে সরকারি থোক বরাদ্দসহ উন্নয়ন মঞ্জুরি হ্রাস

প্রকাশের সময় : ১৬ জুন, ২০১৬, ১২:০০ এএম

বিশেষ সংবাদদাতা : রাজনৈতিক বিবেচনায় কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান নির্বাচিত মেয়রসহ নগর পরিষদকে বেকায়দায় ফেলার  নিরন্তর চেষ্টায় লিপ্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘যেকোনো সময় বরিশাল সিটি মেয়র বরখাস্ত হতে পারেন’,এমন আশায় তারা প্রহর গুনছেন বলেও মনে হয়েছে গত কয়েকদিন এসব মহলে আলাপ করে। সিটি মেয়রসহ অধিকাংশ কাউন্সিলর বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ায় স্থানীয় সরকারের মন্ত্রণালয় থেকে থোক বরাদ্দ বন্ধসহ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড় হ্রাস করা হয়েছে গত ৩টি অর্থবছর ধরে। ফলে নগরীর উন্নয়ন কর্মকা- যথেষ্ট স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি মাথাভারী প্রশাসনের কারণে এখানের নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়েছে পাঁচ মাসের। বিগত মেয়র ও নগর পরিষদের আমলে ৩ মাস বেতন-ভাতা বকেয়ার সাথে বর্তমান মেয়র আমলে তা আরো দু মাস যোগ হয়েছে। ২০১৩-এর ১৬ জুন বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিল। ইতোমধ্যে বরিশালের মেয়র কামাল বাদে অন্য সবাইকেই সরকার অপসারণ করেছে।
ফলে সাধারণ কর্মচারীদের এ ক্ষোভ ও হতাশাকে পুঁজি করে সিটি মেয়র  আহসান হাবীব কামালকে বিতাড়নের লক্ষে একটি মহল ইতোমধ্যে যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে গত সপ্তাহেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি বরিশাল নগর ভবনে নানা বিষয়ে তদন্ত করে গেছেন। সে কমিটির সামনে নগর ভবনের সুবিধাভাগী একটি মহল নানা অভিযোগও উত্থাপন করেছেন বলে জানা গেছে। মেয়রের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন যাবতই নগর ভবনের ভেতরে ও বাইরে একাধিক মহল তাকে অপসারণে তৎপর। সকলকে সন্তুষ্ট রাখতে গিয়ে মেয়র কামালও এখন অনেকটা বেকায়দায়। এ নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের বেশিরভাগই প্রত্যক্ষ ও পরক্ষোভাবে সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারি ব্যবসার সাথে জড়িত বলে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তবে নগর ভবনের আয় বৃদ্ধিসহ এখানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিতকরণে তাদের কোনো উদ্যোগ নেই। এর সাথে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিকটজনের অনেক অন্যায় আবদারসহ ‘অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে গিয়েও’ তিনি যথেষ্ট বিব্রতকর অবস্থায়।
২০০২ সালে বরিশাল পৌরসভার ২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাসহ ৪৮ বর্গ কিলোমিটার নিয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশন গঠিত হলেও এর জনবল মঞ্জুরি আটকে ছিল দীর্ঘদিন। ২০০৩ সালে প্রথম নির্বাচিত নগর পরিষদের সময় জনবল মঞ্জুর হয়নি। ২০০৮ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা শওকত হোসেন হিরন মেয়র নির্বাচিত হবার পরে ২০১১ সালের দিকে এ নগর ভবনের জন্য প্রায় সাড়ে ৭শ’ জনবলের মঞ্জুরি দেয় স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সে জনবলের সাথে সাবেক মেয়ক শওকত হোসেন হিরন প্রায় ১৩শ’ দৈনিক মঞ্জুরি ভিত্তিক পরিচ্ছন্ন কর্মী ও ঝাড়ুদার নিয়োগ করেন। যাদের পেছনে এখন প্রতি মাসে ৬৫ লাখ টাকা করে বেতন গুনতে হচ্ছে নগর ভবনকে। বর্তমান মেয়র আরো ২শ’ অনুরূপ শ্রমিক নিয়োগ করলেও নগরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা খুব ভালো নেই। নগর ভবনের নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হচ্ছে ৪৮ লাখ টাকা।
এছাড়াও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার ট্রাকসহ নগর ভবনের বিভিন্ন পর্যায়ের যানবাহনের পেছনে জ্বালানি ব্যয় মাসে ১০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিমাসে এ নগর ভবনের প্রশাসনিক ব্যয় প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে জানা গেছে। আর এ ব্যয় মেটাতে হয় নগরবাসীর ওপর আরোপিত বিভিন্ন কর ও ফি থেকে। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় পৌনে  ৩ কোটি টাকায়। কিন্তু প্রায় ৪২ হাজার হোল্ডিং থেকে বছরে ট্যাক্স আয় সাকুল্যে ১২ কোটি টাকার মতো। যার মধ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বর্তমানে বকেয়ার পরিমাণই প্রায় ৬ কোটি টাকা। পুরনো স্কেলে বছরে ১৮ কোটি টাকার বেতন-ভাতাসহ প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে নগর ভবনকে ১২ কোটি টাকার হোল্ডিং ট্যাক্সসহ ট্রেড লাইসেন্স ও হাট-বাজারে এবং নিজস্ব কিছু স্টলের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যার অন্তত ২০ ভাগই বছরের পর বছর বকেয়াও থাকছে। এর সাথে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদানে নিয়মিত গড়িমসিও অব্যাহত রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে জেলা প্রশাসকের দফতর, বিএম কলেজ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কাছেই হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি টাকা।
উপরন্তু ২০১৩ সালের শেষভাগে বর্তমান নগর পরিষদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে থোক বরাদ্দসহ সব ধরনের সরকারি বরাদ্দের রাশ টেনে ধরা হয়েছে। এক হিসেবে জানা গেছে, ২০০৮-এর আগস্টে তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা শওকত হোসেন হিরন সিটি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পরে ঐ অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন ও উন্নয়ন কর্মসূচি, বিশেষ থোক বরাদ্দ এবং নগর শুল্কের পরিবর্তে সরকারি অনুদান বাবদ বরিশাল সিটি করপোরেশনকে সর্বমোট প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকার  মতো সরকারি তহবিল থেকে ছাড় করা হয়। পরের ২০০৯-১০ অর্থ-বছরে ঐসব খাতে ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ ২ কোটি বৃদ্ধি করে ১০ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। এর পরের ২০১০-১১ অর্থবছরে এসব খাতে ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৬১ লাখ ৬১ হাজার টাকা। ২০১১-১২ অর্থ বছরে তা ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে ১৯ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। শওকত হোসেন হিরনের মেয়র হিসেবে কর্মকালের শেষ অর্থ বছর ২০১৩-১৪’তে পূর্ববর্তী ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ ২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ছাড় করা হয় বরিশাল সিটি করপোরেশনের জন্য। যার মধ্যে থোক বরাদ্দের পরিমাণই ছিল ১০ কোটি টাকা।
কিন্তু ২০১৩-এর ১৫ জুনের নির্বাচনে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থী হিরন পরাজিত হবার পরে বরিশাল মহানগরীর জন্য সরকারি অর্থের পরিমাণ হ্রাস পাবার অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বরিশাল সিটি করপোরেশনের জন্য সর্বসাকুল্যে সরকারি অর্থ ছাড় হয়েছিল মাত্র ৫ কোটি টাকার মতো। এমনকি পূর্ববর্তী অর্থ বছরের ১০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দের স্থলে ১৪-১৫ অর্থ বছরে ১টি টাকাও সরকার ছাড় করেনি। উপরন্তু প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার দায়-দেনা নিজ দায়িত্ব গ্রহণ করে বর্তমান নগর পরিষদ যথেষ্ট বিপাকে পড়ে। এ নগরীর রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে আগের দুর্নীতি ও দায়দেনা শোধ করতেই বিপর্যস্ত সিটি মেয়রের কাঁধে আরো নতুন করে দেনার বোঝা চেপেছে গত ৩ বছরে। এর সাথে উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ছাড় হ্রাসসহ নগর শুল্কের পরিবর্তে সরকারি অনুদানও প্রায় শূন্যের কোটায় বলে জানা গেছে।
এর সাথে দেড় হাজার দৈনিক মজুরিভিত্তিক পরিচ্ছন্ন কর্মী ও ঝাড়–দারের অন্তত ৬০ ভাগই কোনো কাজ না করে বেতন তুলে নিচ্ছে। এমনকি এসব কর্মীর বেতন তেমন কোনো বকেয়াও নেই। অভিযোগ রয়েছে, নগর ভবনের একটি চক্র বাইরের ক্ষমতাধর একটি শক্তির যোগসাজসে এসব কর্মচারীদের  লালন করছেন। আবার এ চক্রটিই মেয়রসহ নগর পরিষদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারও চালাচ্ছে।
অতি সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি হাইকোর্টের আদেশে ৫৮ জন কর্মচারীকে নিয়মিত পে-স্কেল প্রদানের বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। পাশাপাশি তারা ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মোতোলেব হোসেনকে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টিও তদন্ত করেছে। নগরীর ১৬টি স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন সংক্রান্ত  ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রকল্পটির ব্যাপারেও অনুসন্ধান করেছে কমিটি। তবে তাদের কাছে অভিযোগে ছিল ঐ খাতে সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এছাড়া রাজাবাহাদুর সড়ক উন্নয়নে ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও সেখানে  ৫ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ ছিল তদন্ত কমিটির কাছে।
এসব ব্যাপারে গতকাল বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, তদন্ত কমিটিকে সবকিছুই জানানো হয়েছে। তারা সব বিষয় অনুসন্ধান করেছে আমরাও সহযোগিতা করেছি। অভিযোগগুলোতে যথেষ্ট কিছু অতিরঞ্জন ও অতি কথন ছিল। কমিটি সবকিছুই তদন্ত করেছে। ৫৮ জন কর্মচারীকে উচ্চ আদালতের নির্দেশ পে-স্কেল প্রদান করা হয়েছে। আর মোতালেব হোসেনকে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সব নিয়ম পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও কোনো দুর্নীতি হয়নি বলে তিনি জানান।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন