Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার , ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরী

শাসকের দুর্নীতি ও এর শাস্তি

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০১ এএম

ইসলামপূর্ব যুগে পারস্য সম্রাট নওশেরওয়া ছিলেন ন্যায়বিচার ও সুশাসনের জন্য খ্যাত। মহানবী সা.ও তার সুনাম করেছেন। দানশীলতার জন্য প্রশংসা করেছেন, তার পূর্বযুগের হাতেমতাঈকে।

আল্লাহর বিধানও এমন যে, শাসক অমুসলিম হোক, কিন্তু জালিম না হলে, ন্যায়বিচার ও সুশাসন করলে আল্লাহ তাকে সাফল্য, সুনাম ও নেয়ামত দান করেন। আর শাসক মুসলিম হওয়া সত্তে¡ও যদি নীতিহীন জালিম ও অপশাসক হয়, তাহলে তার ভাগ্যে জোটে পরকালীন শাস্তি, দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও সীমাহীন বদনাম।
ভেতরে ভেতরে মানুষ তার বদনাম করে। তার প্রতি অনাস্থা পোষণ করে। আল্লাহর তরফ থেকে তার প্রতি মানুষের অন্তরে ঘৃণা ও অবিশ্বাস জন্ম নেয়। সে সত্য কথা বললেও মানুষ বিশ্বাস করে না। আন্তরিকভাবে কিছু করলেও অভিনয় মনে করে। এমনকি তার চোখের পানিকেও মানুষ বিশ্বাস করে না। এটি একটি গজব। শাসকের নিয়ত খারাপ হলে দেশের সবকিছুর রহমত বরকত উঠে যায়।

ইতিহাসে আছে, সম্রাট নওশেরওয়া একদিন ছদ্মবেশে তার একসঙ্গীকে নিয়ে জনগণের অবস্থা পরিদর্শনে যান। দূরের পথ, তারা ছিলেন ক্লান্ত ও ঘর্মাক্ত। একটি মাল্টা বাগানে গিয়ে তারা খানিক্ষণ বসলেন। বাগানের মালি তাদের একগ্লাস করে মাল্টার রস দিল। নওশেরওয়া বললেন, খুব সুমিষ্ট ও রসালো মাল্টা। সম্ভব হলে আরেক গ্লাস দাও। মালি বেশ কয়েকটি মাল্টা কেটেও এক গ্লাস রস বের করতে পারলো না। কোনোরকম গ্লাসটি ভরে সম্রাটের হাতে দিয়ে বলল, নিন, খান।

সম্রাট মুখে দিয়ে বললেন, এ রস তো আগের মতো নয়। বেশ পানসে লাগছে। তখন মালি বলল, দেশের রাজার নিয়ত খারাপ হয়ে গেছে, তাই মাল্টার রসও কমে গেছে। মিষ্টতাও চলে গেছে। আগে এক গ্লাস মাল্টায় এক গ্লাস রস হয়েছিল। পরেরবার দু’তিনটি দিয়ে এক গ্লাস রস হয়েছে, তাও পানসে। মালি তখনও সম্রাটকে চিনতো না। সে শুধু তার ধর্মবিশ্বাস ও পূণ্যহৃদয় ধারণা থেকে কথাগুলো বলেছিল।

মহৎপ্রাণ সম্রাট নওশেরওয়া তখন সেখান থেকে চলে গেলেন। সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বললেন, সত্যিই আমি প্রথম মাল্টার রস খেয়ে নিয়ত করেছিলাম, এ বাগানগুলো অধিগ্রহণ করবো। রাজধানীতে আমার জন্য এখান থেকে মাল্টা যাবে। এমন ভালো জাতের মাল্টা খুব কমই পাওয়া যায়। এ ভাবনার পর কী আশ্চর্যরকমভাবে মাল্টার রস কমে গেল, মিষ্টি চলে গেল, তুমি তো নিজেই দেখলে। সত্যিই এই মালি সৃষ্টিকর্তার রহমত বরকত সম্পর্কে উচ্চ ধারণা রাখে। সে প্রকৃতির নিয়ম জানে। এ তার বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতাজনিত দর্শন। সম্রাট তখন এমন দখলবাজে ও জুলুম থেকে তওবা করলেন।

ইসলামের আগের লোক হওয়া সত্তে¡ও মহানবী সা. সম্রাট নওশেরওয়ার প্রশংসা এমনিতে করেননি। বিনা কারণে তিনি দাতা হাতেম তাঈয়ের প্রশংসা করেননি। জাহেলি যুগের এক কবির প্রশংসাও নবীজি করেছেন। তার কবিতা কোনো কোনো সময় আবৃত্তি করিয়ে শুনতেন। বলেছিলেন, এ লোকটি অমুসলিম ছিল। তবে, তার অন্তর ছিল মুসলমান। এ কবির একটি কবিতা ছিল এমন, যেখানে সে বলেছে, ‘যদিও আমার প্রবৃত্তিতে ইচ্ছা জাগে, তথাপি মানুষ হিসাবে আমার সভ্যতার দাবি আমি মেনে চলি। যখন আমার রূপসী প্রতিবেশী ঘর থেকে বের হয়, আমি তখন নিজের দৃষ্টিকে সংযত করে নিই’।

বর্তমান যুগে উন্নত দেশগুলোতে অমুসলিম বহু শাসক দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা, ধর্ম ও মানবতা যে কোনো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের দেশ ও জাতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর মুসলিম নামধারী কিছু শাসক এত নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী হয়ে আছে, যাদের কথা ভাবতেও লজ্জা হয়। মানুষের দেহ, মন-মানসিকতা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এসব শাসক আল্লাহর দান শাসনক্ষমতা লাভ করেও মারাত্মক লোভী, চোর, ডাকাত ও লুটেরা রয়ে গেছে।

প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা অব্যাহতভাবে মেরে দিয়েও তাদের খাই মেটে না। এদের অনন্ত লোভ একদিন মিটবে। সেদিন আর শাস্তি ও পাকড়াও থেকে তাদের বাঁচার উপায় থাকবে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, কবরের মাটি পেটে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত লোভীদের সম্পদের উগ্র চাহিদা মিটবে না। অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন, যারা সম্পদ জমা করে আর গর্বভরে গণনা করে, তারা জাহান্নামে যাবে। ধ্বংস তাদের জন্য যারা ভাবে যে, সম্পদ তাকে অমরত্ব দেবে।



 

Show all comments
  • মুক্তিকামী জনতা ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১:৫৮ এএম says : 0
    দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা লাভবান হলেও সামগ্রিকভাবে সমাজ ও অর্থনীতির উপর এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই সার্বিক বিচারে দুর্নীতি সব সময়ই নেতিবাচক ও পরিত্যাজ্য।
    Total Reply(0) Reply
  • মিরাজ আলী ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১:৫৯ এএম says : 0
    বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ জীবন যাত্রার প্রায় সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি এক মহা বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ জঘন্য ব্যাধির করাল গ্রাসে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। বর্তমান সমাজে দুর্নীতির অবস্থান এতই শক্তিশালী যে দেশের সাধারণ মানুষ দুর্নীতির কাছে অসহায় হয়ে একে তাদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে। গত ৪০ বছরে বাংলাদেশ পর পর তিনবার দুর্নীতির জন্য বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
    Total Reply(0) Reply
  • মনিরুল ইসলাম ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১:৫৯ এএম says : 0
    দুর্নীতি একটি সামাজিক অভিশাপ। কোনো জাতির ধ্বংসের পূর্বে তাদের মধ্যে দুর্নীতি মহামারীর মত বিস্তার লাভ করে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিকে শাস্তি দেওয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আল-কুরআনে বলেন: ﴿ٱلَّذِينَ طَغَوۡاْ فِي ٱلۡبِلَٰدِ ١١ فَأَكۡثَرُواْ فِيهَا ٱلۡفَسَادَ ١٢ فَصَبَّ عَلَيۡهِمۡ رَبُّكَ سَوۡطَ عَذَابٍ ١٣ إِنَّ رَبَّكَ لَبِٱلۡمِرۡصَادِ ١٤ ﴾ [الفجر: ١١، ١٤] “যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং তাতে বড় বেশি দুর্নীতি করেছে, তখন তাদের ওপর তোমার প্রভু শাস্তির কশাঘাত হানলেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন।” (আল-কুরআন, ৮৯: ১১-১৪)
    Total Reply(0) Reply
  • তাসলিমা বেগম ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ২:০০ এএম says : 0
    সাধারণত পাপী বান্দাদেরকেই সমাজে পাপের পরিণাম ভোগ করতে হয়, কিন্তু যখন কোনো পাপ আল্লাহর বান্দাগণ প্রকাশ্যে সর্বত্র চর্চা করতে থাকে তখন আল্লাহ তা‘আলা চাবুক মারার মত ভয়াবহ শাস্তি দিয়ে থাকেন।
    Total Reply(0) Reply
  • সাইফ আহমেদ ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ২:০০ এএম says : 0
    আইনের ফাঁকি দিয়ে কখনও কখনও আল্লাহর বান্দাগণ তার পেশীশক্তির প্রভাব খাটিয়ে নিজের মতলব হাসিল করে থাকে।
    Total Reply(0) Reply
  • মোঃ নাজমুল ইসলাম ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ২:০১ এএম says : 0
    বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, অবৈধ সিন্ডিকেট বা অসৎ ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবসায়িক দুষ্টচক্র সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হচ্ছে, খাদ্য, ওষুধ, নির্মাণ সামগ্রীসহ নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সকল ভোগ্যপণ্যে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অথবা সরকারী-বেসরকারী অফিসে কোনো সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে ঘুষের লেনদেন এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষায় নকল, ভোট কারচুপি, দলিল দস্তাবেজে জালিয়াতি, শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানো, অবৈধ দখলদারী, অযোগ্য লোককে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান, আর্থিক অনিয়ম ইত্যাদি সকল প্রকার দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। ইসলাম এসব কিছুকেই হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনে বহুবার অন্যের অধিকার নষ্ট করাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। সহজ ও সঠিক পথ অনুসরণ করার হুকুম দিয়েছেন।
    Total Reply(0) Reply
  • মেঘদূত পারভেজ ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ২:০১ এএম says : 0
    কাজেই আসুন! আমরা সমাজের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতি দূর করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করি এবং এ লক্ষ্যে কাজ করি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দিন, আমীন।
    Total Reply(0) Reply
  • Firoz Khan ৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১১:২৪ এএম says : 0
    thanks to the writer
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

৯ নভেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ